• Narrow screen resolution
  • Wide screen resolution
  • Auto width resolution
  • Increase font size
  • Decrease font size
  • Default font size
Member Area

নিসর্গ : বাংলার প্রকৃতি | Nishorga : Bangladesh Nature & Environment

Monday
Oct 06th
হোম arrow ভ্রমণ arrow যাদুকাটার যাদু
যাদুকাটার যাদু প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন মুনতাসির মামুন ইমরান   
Saturday, 26 November 2005
নামটার সাথে বোধ করি আমাদের কারোই তেমন পরিচয় নেই। দোষ দিয়েও লাভ নেই, কেননা বেড়ানোর তাগিদ আমাদের কিছুটা থাকলেও খুব যে বেশি আছে তা বলা নিতান্তই ভুল হবে। সামর্থ এবং সময় এর জন্য দায়ী। যারা এর দুটোরই অধিকারী তাদের মাঝে নিজ দেশের চেয়ে দেশের বাইরে বিশেষত ভারত দর্শনের আগ্রহ বেশি দেখা যায়। তাই আমাদের দেশের মনোহর স্থান গুলো শহূরে মানুষের কাছে চিরকালই থেকে যায় অপরিচিত। অপরিচিত জগতের ব্যপ্তি কিছুটা কমিয়ে আনতেই আমাদের বেড়িয়ে পড়া জাদুকাটার দিকে।

 
On the bank of Jadukataজাদুকাটা নদীর নাম। যদিও কেবল শুস্ক মৌসুমেই এর বৈপ্লবিক সৌন্দর্য চোখে পড়ে। বর্ষায় মোটামুটি আমাদের বঙ্গোপসাগরের চেয়ে খানিকটা (!) ছোট এর আকার। দেশের উত্তর-পূর্বের হাওর প্রধান সুনামগঞ্জে অবস্থিত। বন্ধুদের মুখে নানা কথা শুনলেও যাওয়ার সুযোগ হয়নি আগে। সুযোগ টা চলে আসে এই ২১শে ফেব্রুয়ারীর ছুটিতে। আমাদের সংগঠন বিটিইএফ (বাংলাদেশ টুরিজম এক্সপানশন ফোরাম) এর মিটিংএ ঠিক করে ফেলি যেতে হবে এবার জাদুকাটা এবং এর আশেপাশের অঞ্চলে। সে লক্ষ্যে প্রথমে যাব লাউয়াছড়া রিজার্ভ ফরেষ্টে, সেখান থেকে সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর। এই আমাদের পথ। হাতে সময় খুব বেশি তাও নয়। তাই টাইট সিডিউলে ঢাকা ছাড়ি ১৭ তারিখ রাত ১০টার ঢাকা-শ্রীমঙ্গলের ট্রেনে। সমমনা নানা বয়সী ১০ জন। ভোর চারটার দিকে শ্রীমঙ্গলে। খানিকের মাঝে ঝুম বৃষ্টি। সাধারণ বৃষ্টিটাকেও কেমন জানি নতুন মনে হচ্ছিল। ষ্টেশনের টিনের চালে বৃষ্টির ঝমঝম শব্দটাতেই কেমন মাদকতা। হায়! হাই রাইজ বিল্ডিং গুলো আমাদের নিরাপদ আবাসন দিলেও কতকিছু যে কেড়ে নেয় তা বুঝতে পারলাম। লাউয়াছড়া বেশি দূরে নয়। তবে এত সকালে কোথাও যাওয়ার উপায় নেই। দলে আমরা খুব ছোটও না। হোটেলে ওটার ইচ্ছাটা থাকলেও ষ্টেশনেই বাকি রাতটুকু আড্ডা আর ঝিমিয়েই কাটিয়ে দিলাম। ষ্টেশন থেকে খানিকটা সামনেই হোটেল। খাওয়া সেরে গেলাম বাসের খোঁজে। ছাড়তে আরও মেলা দেরী; অগত্যা একটা মাইক্রোবাস ভাড়া নেয়া হল। তেমন একটা বেশি খরচা হবে না বাসের চেয়ে। যার্নিটা ছোট। আঁকা বাঁকা পাহাড়ী পথে এগিয়ে যাওয়া। মজাই লাগছিল যখন বৃষ্টির ফোঁটা গুলো এসে পড়ছিল ঠিক মুখের উপর। বাসের ছাদটা থাকলেও জরাজীর্ণ গাড়ির ভিতরে টপটপ করে আসছিল পানি। মিনিট পঁচিশেক পরেই পৌঁছে গেলাম। কর্তব্যরত অফিসারের সাথে দেখা করে জেনে নিলাম কোথায় কি আছে। সামান্য বিরতি নিয়ে হাঁটা শুরু করলাম। টিপটিপ বৃষ্টি। তার মাঝে পথ চলা। লালচে মাটিতে পানি পড়ায় কিছুটা আঠাল। তেমন একটা সমস্যা হচ্ছিলনা। খানিকটা এগোনোর পরেও কোন পাখির ডাক শুনতে পাচ্ছিলাম না। এবার বুঝতে আর অসুবিধা হলো না কেন এমন। অভয়ারন্য হলেও পাখির কোলাহল অনুপস্থিত ইউনোকলের কার্যক্রমে। নতুন গ্যাস লাইনের খনন কাজ চলছে। ওয়েলডিং করার জন্য আনা হয়েছে ভ্রাম্যমান জেনারেটর। এখানে শব্দদূষণ মাত্রা ঢাকার চেয়ে বেশি না কম তার সুরাহা করা যায়নি ডিবি মিটার না থাকায় ! আরও খানিকটা এগিয়ে যাওয়ার পর একটি মাত্র কুঁড়ে ঘর দেখতে পেলাম। পাশে লেবু বাগান। ঝাঁঝাল গন্ধের সৌরভ বাতাসে। মনে হলো বাগান পাহারা দেয়ার জন্যই গৃহস্থের ছোট পরিবার।

যেমন ভাবে আমাদের বলে দেয়া হয়েছিল আমরা সেভাবেই এগিয়ে যাচ্ছিলাম। তবে এখন পাখির কলতান প্রকট। এদিকে লাইন বসানোর কাজ শেষ অনেক আগে। পথ বেশ ভাল। বেলা প্রায় মাঝ বরাবর। পথের শেষ কোথায় জানি না। হাঁটছি তো হাঁটছি। ক্লান্তি এলেও খারাপ লাগছিলনা। আমরা যাব খাসিয়া পল্লীতে। বনের প্রায় শেষ মাথায় তা হবার কথা। তবে পথ ভুল হওয়ায় আমরা যখন পৌঁছলাম তখন বেলা বেশ ঢলে পড়েছে। বিকাল না হলেও আর খুব একটা বাকি ছিলনা। টিউবওয়েলের পানি আকন্ঠ পান করলাম সবাই। গ্রামে ঢোকার আগে পানের বিশাল বাগান দেখতে পেলাম। অধিবাসীদের মূল উপার্জন এই পান। প্রায় প্রতিটি ঘরেই সব বয়সীরাই পান সত্কারেই ব্যস্ত। বেশ খানিকটা বিশ্রাম দিলাম শরীরকে। কমতো আর হাঁটা হয়নি। গ্রামে সব ঘরেই বিজলি বাতি দেখা গেল। কথাবার্তায় শিক্ষিতই মনে হয়। নেমে আসতেই পেলাম রেল লাইনের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া রাস্তাটাকে। আগের গাড়িতে করেই ফিরে এলাম শ্রীমঙ্গলে। পেট পুড়ে খেলাম সবাই। রওনা হলাম সুনামগঞ্জের দিকে। রাত আটটায় পৌঁছে গেলাম। হোটেলে উঠে পরের দিনের কার্যক্রমের বর্ণনা শুনতে পেলাম অর্কিটেক্ট গনি ভাইয়ের কাছ থেকে। পরদিন সকালে হাসন রাজার বাড়ি দেখে পাশেই বয়ে যাওয়া নদী পার হয়ে অপেক্ষা করতে থাকলাম। মজা হলো আমাদের প্রায় সবার কাছেই ছোট বড় ব্যাগ আছে। আর আমাদের যেতে হবে মোটর সাইকেলে করে। এমন যানবাহনের কথা শুনলেও এবার দেখতে পেলাম। রাস্তাও না কি জুতের না। ড্রাইভার সাহেব বসার পর আমি আর বাংলালিংকের ইহসান ভাই বসলাম। আর কেরিয়ারে আমার ব্যাকপ্যাক। সাইজটাও বেশ বড়। স্বাস্থ্যবান ইহসান ভাই বসার পর আমার বসার জায়গাটার পরিমান ছিল নিতান্তই কম। মজা লাগছিল ফোটোগ্রাফার ইন্দ্রোনিল কিশোর কে দেখে। দশাশাই সামি ভাইয়ের পিছনে ব্যাচারা মোটামুটি দাঁড়িয়েই ছিল সারাটা পথ। আঁকাবাঁকা পথে আমাদের বাইক গুলো শাঁ শাঁ করে চলছিল। মজা লাগছিল যখন এক বাইক আরেকটাকে অতিক্রম করছিল। রাস্তাটাকে খারাপ বলাটা ভুল হবে। কিন্তু কিছু কিছু জায়গা বিপদজনক না হলেও যাত্রি সমেত চলাচল সম্ভব ছিলনা। মাঝে মাঝে ঢালাই করা পাকা রাস্তা। ছিল বাসের সেতু। প্রথমে ভেবেছিলাম নামতে হবে। আরে না ! পাকা ড্রাইভার; এ পথের একমাত্র যানবাহনই মোটর বাইকগুলোর চালকেরা। মচমচ শব্দ তুলে পার হতে হয়েছিল এমন প্রায় পাঁচ ছয়টি সরু সেতু। হায়! সভ্যতার কোথায় আমরা! সুনামগঞ্জের রাজপথ মাত্র খানিটা দূর। কিন্তু কোন অসুস্থ রোগীকে খাটিয়া ছাড়া নিয়ে যাওয়ার অন্য কোন উপায় আছে বলে মনে হল না। ঘন্টা খানেক চলার পর হটাৎ করেই একটা বাঁক নেয়ার পর বিশাল বালি সমুদ্রের সামনে হাজির হলাম। মরুভূমির কথা শুনেছি, দেখিনি কখনও। উত্তরবঙ্গে যাওয়ার সময় যমুনা ব্রিজ থেকে বড় বড় চর দেখলেও এমন টা বোধ হয় দেখিনি কখনও। এক কথায় অসাধারণ। সাইকেলের দু ’ চাকায় সরু একটা রাস্তা হয়ে গেছে ঠিক মাঝ বরাবর। উত্তর পূর্ব দিক থেকে বাতাস আসছিল। উড়ে আসছিল বালি। তবে চোখ খুলে রাখাটা দায় হলেও বন্ধও বা করি কিভাবে ? বন্ধ করলেই মিস! ডান পাশে ভারত। বিধাতার অপার কৃপায় পাহাড়গুলোর মালিক তারা। ধুসর সবুজ ধোঁয়াশা আমেজে তাকিয়ে আছে যেন ঠিক আমাদের দিকেই। এবার নামতে হবে, নরম বালির উপর দিয়ে যাত্রী নিয়ে বাইক চালক অপারগ। সামান্য একটু হাঁটতেই মায়া জড়ানো এক নদী।

এটাই জাদুকাটা নদী। সবুজে পানি। ঝকঝকে পরিস্কার। বেশ হীম হীম একটা ভাব আছে। বিশাল বালিয়ারীর পাশে এমন একটা নদী থাকতে পারে ভেবেও দেখিনি। পা ভিজিয়ে বেশিক্ষণ বসেও থাকতে পারলাম না। খেয়া নৌকা। সবাই মিলে চেপে গেলাম। নদী পার হয়েই টিলার দেখা। উচ্চতায় খারাপ না- প্রায় শ ’ মিটারের কাছাকাছি। ঢালাই করা পায়ে হাঁটা পাকা পথ। উপরে উঠার পর ব্যাপ্তিটা বুঝতে পারলাম। বিশাল শূন্যতা। কংকরময় বালি আর নদীর অনিন্দ সুন্দর সমারোহ। টিলার উপরটাও বেশ বড়। ছোটখাট ঝোপ জঙ্গল ছাড়া আর কোন গাছ গাছলা নেই। আছে দু একটা কুঁড়ে। তাও বেশ দুরে দূরে। বেশ খানিকটা সময় কাটিয়ে দিলাম এখানেই। একটাই মাত্র বাঁশ ঝাড়ের আড়ালে, ছায়ায়। বাতাস গুলো বাঁশের কচি পাতায় শোঁ শোঁ শব্দ তুলে বয়ে যাচ্ছিল। এবার এগিয়ে যাবার পালা। টেকেরহাট হয়ে আমরা চলে এলাম উত্তর শ্রীপুর। বাজার সদাই করে নৌকা নিয়ে বেড়িয়ে পরলাম বিকালে। সারা রাত এবং পর দিনের দুপুর পর্যন্ত আমরা টানগুয়া হাওরে থাকব। মাঝি মাল্লা সহ বার জন। রাতে লোকলয়ে তাঁবু খাটালাম। ভাত ডাল রান্না হল। হল ক্যাম্প ফায়ার। কাঠের সল্পতার কারণে বেশি দূর অবশ্য এগুনো গেলনা। খুব ভোরে সবাই ব্যাকপ্যাক করে রওনা হলাম হাওরের দিকে। এ যেন এক মহা সমুদ্র। মিঠা পানির সব চেয়ে বড় জলাধার বোধ হয় এটাই। তাই ওয়ার্লড হেরিটেজ হিসেবে ঘোষিত হতে খুব বেশি দেরী করেনি। একটার সাথে লাগোয়া আরেকটা জলমহাল। রক্ষার জন্য একজন ম্যজিস্ট্রেটও আছে। আইন ভালই কড়া এখানে। মাছ ধরা পাখি মারা একদম নিষেধ। এমনকি খাবার নিয়েও হাওর এলাকায় প্রবেশে আছে বাধা। পশ্চিমাকাশে ঢলে পরা সূর্যের তেজে আমরা শ্রীপুর বাজারে ফিরে এলাম। আবার সেই বাইক রাইড। সোজা চলে এলাম টেকেরহাটের কাকচক্ষু জলের কিডনি শেপের লেকটাকে বাম পাশে রেখে পরন্ত বিকালে সুনামগঞ্জে। হাসন রাজার বাড়ির সামনে ছোট একটা জটলা করে পরবর্তী গন্তব্যের হদিশ দিলেন গনি ভাই। বাসের টিকেট আগেই করা ছিল। সোজা হোটেলে গিয়ে গোসল সেরে ১০টার বাসে ঢাকায়। চার রাত তিন দিনের সফর শেষ হল যখন তখন ঢাকায় প্রভাতফেরী গুলো বাড়ি ফিরছে শহীদ মিনার থেকে। আমরাও ফিরে এলাম শহরের চারকোনা জীবনে।

কিভাবে যাবেন:
ঢাকা থেকে শ্রীমঙ্গলের সরাসরি ট্রেন যোগাযোগ আছে। সুলভ ক্লাসে ১৫০ টাকা। এখান থেকে ৮-১০ জন বসার উপযোগী মাইক্রোবাসের ভাড়া দুই পথে লাউয়াছড়া বনে ৩৫০ টাকা। সুনামগঞ্জে যাওয়ার জন্য একই গাড়ি ভাড়া নিবে প্রায় ১৮০০ টাকার মত। টাকা একটু বেশি লাগলেও সময় বাঁচানোর জন্য এমনটা করা উচিত। থাকার জায়গা আছে নানা পদের। মোটামুটি দু জনের জন্য ১২০ - ১৫০ টাকা খরচা করলেই থাকার ভাল ব্যবস্থা। নদী পার হয়ে বাজার থেকে প্রতিমোটর বাইক নিবে ৩০০ টাকা বা তার কিছু বেশি। শ্রীপুরে নৌকা ভাড়া বেশি নয়। হাজার খানেক টাকার মধ্যে ২৪ ঘন্টার জন্য নৌকা পাওয়া সম্ভব। ফিরতি পথে সুনামগঞ্জ থেকে ঢাকার আছে সরাসরি যোগাযোগ। বাস ভাড়া ২৫০ টাকা।

ফটো: ইহসান উর রহমান।

মন্তব্যগুলো (0)Add Comment

মন্তব্য লিখুন

security code
Write the displayed characters


busy
সর্বশেষ আপডেট ( Sunday, 25 February 2007 )
 
< পূর্বে   পরে >