• Narrow screen resolution
  • Wide screen resolution
  • Auto width resolution
  • Increase font size
  • Decrease font size
  • Default font size
Member Area

নিসর্গ : বাংলার প্রকৃতি | Nishorga : Bangladesh Nature & Environment

Monday
Oct 06th
হোম arrow ভ্রমণ arrow ফিল্ডট্রিপ টু শ্রীপুর
ফিল্ডট্রিপ টু শ্রীপুর প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন এনায়েতুর রহীম   
Tuesday, 20 February 1996

১৮ ফেব্রুয়ারী ১৯৯৬, রবিবার, ৩০ রমজান। পরদিনই ঈদ-উল-ফিতর। শীতের দুই-মাস অনেক আগে শেষ হলেও বাড়তি কিছুদিন শীতের আমেজ বজায় ছিল। আজই বসন্ত যেন প্রকৃতিতে তার জায়গা করে নিয়েছে। ফুরফুরে বাতাসে কড়ই গাছটার পাতা-ঝরা দৃশ্য সে কথাই মনে করিয়ে দেয়। এ দিনটি আমার জীবনে স্মরনীয় এ কারণে যে-- এদিনই আমি সবচেয়ে দূরের ফিল্ডট্রিপে অংশ নেই।

নটর ডেম ন্যাচার ষ্টাডি ক্লাবের রেগুলার প্রোগ্রামের অংশ হিসেবে অনেক আগেই প্ল্যান করা থাকলেও কলেজ ক্যাম্পাসে শেখরভাইকে পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত আতিক ভাই ও সাখাওয়াৎ এই তিনজনে সকাল নয়টায় গুলিস্তান থেকে বাসে উঠি শ্রীপুরের উদ্দেশ্যে। বাস খুবই সুন্দর। মিনি বাস। চেয়ার কোচ এবং অডিও সার্ভিস। আশা করেছিলাম বাস হয়তো ডাইরেক্ট শ্রীপুর যাবে। কিন্তু আমাদের সে আশার গুড়ে বালি দিয়ে সারা রাস্তা থেমে থেমে শুরু হল যাত্রা। সাখাওয়াৎ কিছুটা অসুস্থ বোধ করছিল বলে মগবাজারে নেমে যায়। ফিল্ডট্রিপ হবে কি না এ নিয়ে যখন সন্দেহ সৃষ্টি হল তখন আমার প্রবল ইচ্ছাশক্তির কাছে তা বিলীন করে দিলেন আতিক ভাই। একটা কথা বলা দরকার যে আমি বা আতিক ভাই কেউই আগে শ্রীপুর যাইনি। তাই, কত দূর, কোথায় আমরা ওয়ার্ক করব তা নিয়ে সন্দেহ ও রহস্য দুইই দানা বাঁধতে শুরু করল। তারমধ্যে আবার ঈদের মওশুম। জনৈক যাত্রীর কাছে জিজ্ঞেস করতেই জানলাম যেতে দুই ঘন্টা তো লাগবেই তারও বেশী লাগতে পারে। অবশেষে সকাল এগারটার একটু পরে আমরা শ্রীপুর বাসষ্ট্যান্ডে পৌঁছুলাম।

বাসষ্টান্ডের পাশেই থানা পরিষদের অফিস। আমরা সেদিকেই যাব বলে ঠিক করলাম। ছোট শহরের যে অবস্থা থাকে শ্রীপুরের অবস্থাও অনেকটা সেরকমই। রিক্সা, দোকানপাট, লন্ড্রী ইত্যাদি রাস্তার দুইপাশে বেশ নজরে পড়ল। বনবিভাগের অফিস কোনদিকে একজনকে জিজ্ঞেস করতেই উনি যেন একটু অবাক হলেন। শেষে ফরেষ্ট অফিস বলায় চিনতে পারলেন। আমাদের ধারনা ঠিকই আছে, আমরা যেদিকে রওনা করেছি- সেদিকেই।

সামনে যেতেই ষ্টেশন পড়ল। রাস্তার উত্তর পাশে ষ্টেশন। রেললাইন চলে গেছে সোজা উত্তর থেকে দক্ষিণে। দক্ষিণে ঢাকা শহর। এই হিসাব কষে নিয়ে আমি আর আতিক ভাই বাইনোকুলার, নোটবই আর ফিল্ড গাইড বের করলাম এবং রেল লাইন বরাবর নতুন কাটা রাস্তা ধরে দক্ষিণে চলা শুরু করলাম। বলে রাখা দরকার, আমাদের চেয়ে বাইনোকুলার একটা বেশী অর্থাৎ তিনটি। তাই সারাক্ষণ একটা বোঝা আমি বয়েছি। এটা ‘ বোঝা ’ বলা ঠিক না কারণ এর চেয়ে বেশী জিনিস নিয়ে আমাদের ফিল্ডট্রিপ করতে হয়।

সত্যি, শালবনের সৌন্দর্যে আমি মুগ্ধ হলাম। প্রকৃতির রুক্ষতার মাঝে গাছগুলি যেন ঠায় দাঁড়িয়ে আছে, যেন মৌন ভাষায় আমাদের স্বাগত জানাচ্ছে। বেনে বৌ বা হলদে পাখি (ব্ল্যাক হেডেড ওরিওল) এর মুহুর্মুহু ডাক আর রেড ব্রেষ্টেড ফ্লাইক্যাচার এর ডাকে বনভূমি মুখরিত। দূর থেকে ভেষে আসছে হাঁড়িচাচার ডাক। মাঝে মাঝে ঘুঘু পাখির কন্ঠ একটা উদাস ভাব জাগিয়ে তুলছে। হঠাৎ উদাস হয়ে যাই। মনে পড়ে জীবনানন্দের কবিতা ‘ পৃথিবীর সব ঘুঘু ডাকিতেছে হিজলের ডালে... ’

কখনও কখনও বনভূমির মাঝ দিয়ে ছুটে চলছে সাইকেল আরোহী, কখনোবা দু একটা পাতাকুড়ুনি ছেলে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে। হঠাৎ একটা ছোট পাখি দেখে অবাক হলাম। সম্ভবতঃ রেড ব্রেষ্টেড ফ্লাইক্যাচার। বাইনোকুলার লাগিয়ে নিশ্চিত হলাম। কিন্তু ওই তো, বুকের কাছে লাল রঙ। এ সময় এ পাখির বুকের কাছে লাল থাকার কথা নয়! সাধারণতঃ বর্ষার সময় রেড ব্রেষ্ট দেখা যায়। এছাড়াও ওরিওল গুলোও এত বেশী হলুদ যেন লালচে একটা ভাব চলে এসেছে। আমরা ডাক বাংলোকে ডানে রেখে রাস্তার বামে নেমে পড়লাম। যতদূর দেখা যায় শুধু শালবন আর শালবন, অন্য কোন গাছ নেই। মাঝে মাঝে বনের মধ্যে ফাঁকা জায়গা চোখে পড়ল। সম্ভবতঃ ধান চাষ করা হয় এসব জমিতে। আমরা সে পথ ধরেই হাঁটতে থাকি।

হঠাৎ লাল রঙের একটা পাখি দেখে আতিক ভাই আমাকে ডাকলেন। আমি চিনতে পেলাম। ওটা Small Minivet. আগে দেখিনি তবে শুনেছি এটা শ্রীপুর অঞ্চলে পাওয়া যায়। প্রকৃতি এত রুক্ষ যে বলার মত নয়। স্নিগ্ধ ভাব একেবারেই নেই। তবে এত নিস্তব্ধ যে পাখিরা চুপ হয়ে গেলে নিঃশব্দের গান শোনা যায়। ক্ষণিকের জন্য বড় নিঃসঙ্গ মনে হয়। আনমনা হয়ে দাঁড়িয়ে যাই বার বার। মড় মড় শব্দ করে আতিক ভাই ঢুকে যান শালবনে। আমাকে তাড়া দেন। সম্বিৎ ফিরে পাই। আবার তাঁকে অনুসরণ করি।

সূর্য তখন মাথার উপর। জোহরের নামাজ পড়তে হবে তাই লোকালয়ের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। একটা পাখি আমাদের আগমনী বার্তা পেয়ে উড়ে পালাতে চেষ্টা করল। দূরে একটা গাছে গিয়ে উড়ে বসল। চিলের মত মনে হল। কিন্তু সন্দেহকেই প্রশ্রয় দিলাম। বাইনোকুলারে চোখ লাগিয়ে তার অবস্থান নিশ্চিত হয়ে সাবধানে এগোই। ধীরে ধীরে কাছে চলে আসি। বৈশিষ্ট্য গুলো স্পষ্ট হয়ে যায় চোখের সামনে। সাদা চোখ, দাঁড়কাকের চেয়ে সামান্য ছোট, ভূবন চিলের রং অনেকটা তবে হালকা, গলার নিচে দুটো সাদা বার (Bar) ঠোঁটের নিচ থেকে গলা পর্যন্ত নেমে গেছে। Salim Ali-র বই এর ছবির সাথে হুবহু মিলে গেল। White Eyed Buzzard. এপাখি আমাদের এদিকে থাকার কথা নয়--বলেছেন সালীম আলী তাঁর বই-এ। আমরা, বিশেষ করে আমি খুবই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম, এই পাখি দেখার পর খুবই ভাল লাগল। মনে হল আজকের ফিল্ডট্রিপ সার্থক। দুজনই রোজা রেখেছিলাম তাই একটা বাড়ির পাশে ছায়ায় বিশ্রাম নিলাম। একটা ব্যাপার লক্ষণীয় যে এ অঞ্চলে পানির খুবই সংকট। কোন বাড়িতেই টিউবঅয়েল নেই। এমনকি আশে পাশে কোন পুকুরও চোখে পড়েনি। স্থানীয় অধিবাসীদের আর্থসামাজিক অবস্থা বেশী ভাল নয় বলে মনে হল। দুএকজনকে জিজ্ঞেস করে জানলাম অনেকেই গৃহস্থালীর কাজ ছাড়া অন্য কিছু করে না।

কাছেই একটা মসজিদ পাওয়া গেল। মাটির মেঝে সুন্দর করে লেপা, তার উপর মাদুর পাতা। বাহিরে বড় মাটির পাত্রে সংরক্ষণ করা পানি। সেই ঠান্ডা পানি দিয়ে ওযু করলাম। জোহর নামাজ পড়ে পূর্বের পথ ছেড়ে গ্রামের ভেতর দিয়ে অর্থাৎ পশ্চিম দিক দিয়ে ষ্টেশনের দিকে হাঁটা ধরলাম। এর মধ্যেই নতুন কিছু প্রজাতি দেখা হল। চারটি প্রজাতি চিনতে পারিনি। সেগুলোর ভাল ছবি এঁকে নিয়েছি। একটা সোনালী পিঠ কাঠঠোকরা দেখা গেল। সবমিলিয়ে বিয়াল্লিশটা প্রজাতি। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল White Throat, Thickbilled Flowerpeacker, White Eyed Buzzard, Small Minivet, Wood Shrike.

ট্রেনে আসার ইচ্ছে থাকলেও লোকাল ট্রেনের অবস্থা দেখে (ঈদের আগে তাই প্রচন্ড ভীড়) ইচ্ছাটা বাদ দিলাম। এদিকে ইফতার সমাগত হলে কিছু খাবার কিনে একটা হোটেলে বসে ইফতার করলাম। মাগরেব পড়ে আমরা বাসষ্ট্যান্ডে রওনা দিলাম। আতিক ভাইয়ের থাকার ইচছা থাকলেও আমার সম্মতি না থাকায় পারলেন না।

এই ট্রিপ আমাদের কাছে কিছু আবিষ্কার করার মত মনে হয়েছে। কারণ, এখানে আমরা দুজনের কেউই আগে আসিনি। স্থানীয় লোকজন খুবই সুহৃদ ও কৌতূহলী। গাছপালা কমে যাচ্ছে, মানুষ কেটে ফেলছে বন-- এ ব্যাপারে তাদের মাঝেও আক্ষেপ লক্ষ্য করলাম। আর একটা বিষয়--রোজা না রাখলে বেশী করে পানি অবশ্যই নিতে হবে ভবিষ্যতে এখানে আসলে।

এখন বাইরে টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। যত সুন্দর ভাবে দিনটির শুরু, অপরাহ্নটা তত সুন্দর নয়। বৃষ্টি যদি হয়ই তবে সব ভেস্তে যাবে। কারণ কাল ঈদ।

মন্তব্যগুলো (1)Add Comment
...
লিখেছেন bidyut chakraborty, May 29, 2007
i need total gide of sunderbon tour

মন্তব্য লিখুন

security code
Write the displayed characters


busy
 
< পূর্বে   পরে >