• Narrow screen resolution
  • Wide screen resolution
  • Auto width resolution
  • Increase font size
  • Decrease font size
  • Default font size
Member Area

নিসর্গ : বাংলার প্রকৃতি | Nishorga : Bangladesh Nature & Environment

Monday
Oct 06th
হোম arrow ভ্রমণ arrow ফিল্ডট্রিপ টু বোটানিক গার্ডেন
ফিল্ডট্রিপ টু বোটানিক গার্ডেন প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন এনায়েতুর রহীম   
Monday, 06 November 1995

রাত একটা বেজে পঁচিশ মিনিট৷ দূরে নাইটগার্ডের বাঁশীর ক্ষণিক আওয়াজ ব্যতীত নিস্তব্ধ রাত৷ আকাশে চাঁদ আছে কি না বোঝা যায় না৷ রাতচর পাখিরা সবাই কোথায় লুকিয়েছে কে জানে৷ এ রাত শেষে ভোরের আলো যখন চোখ মেলবে ধীরে ধীরে, তার সাথে চোখ মেলবে শতকুড়ি, হাজারো পাখ-পাখালি; আর জুট কলোনীর ছোট শিউলী গাছতলা ভরে যাবে একরাশ শিউলীতে৷ প্রতিটি সকালের মত ঝুড়ি হাতে শিউলী কুড়াবে ছোট দুটি মেয়ে আর দুএকটা বেজী গর্ত ছেড়ে উঁকি মেরে চাইবে এদিক ওদিক৷

তারপর যথারীতি সকাল হলো৷ দূরের রেনট্রি গাছটা শত পাখির কলগুঞ্জনে হল মুখরিত৷ একজোড়া বুলবুলি ডানায় ডানা লাগিয়ে একঝাঁক চড়ুইয়ের পাশে সামনে বাড়ানো শাখায় এসে বসল৷ আর আমি- বারান্দার গ্রীল ধরে আড়মোড়া ভাংছি৷ সত্যিই আশ্বিনের শেষ দশদিনের একদিন আজ- এই সকালের বৈচিত্রই আলাদা৷ ৬ ই অক্টোবর, ১৯৯৫, শুক্রবার৷ ভোর সাড়ে পাঁচটা তখন ঘড়িতে৷ নটরডেম ন্যাচার ষ্টাডি ক্লাবের নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে আজ রয়েছে ফিল্ডট্রিপ৷ বোটানিক গার্ডেন মিরপুরে ফিল্ডট্রিপ করেছি একাধিকবার৷ সেই প্রথম সোনারগাঁয়ে সারাদিনের ফিল্ডট্রিপ থেকে শুরু করে অনেকদিন পর আজ বোটানিক গার্ডেনে ফিল্ডট্রিপ একটা অন্যরকম অনুভূতির সৃষ্টি করেছে মনে৷ ফিল্ড এর নিত্য উপাদান- ক্যামেরা, খাবার, নোটবুক নিয়ে আর ক্যামোফ্লেজী ড্রেস পড়ে ছটায় বেরিয়ে পড়লাম৷ সকাল সাড়ে আটটায় রনি ভাই, শরীফ ভাই এবং মতিন ভাই সহ একুশজন জুনিয়র মেম্বার গার্ডেনে প্রবেশ করি৷ দীর্ঘ ব্রিফিং শেষ করে চারটি উপদলে ভাগ হয়ে আমরা সোয়া নয়টার দিকে কাজ শুরু করলাম৷ শরীফ ভাই একগ্রুপের, রনীভাই এক গ্রুপকে, মতিন ভাই এক গ্রুপকে এবং আমি এক গ্রুপকে নেতৃত্ব দিলাম৷ টিকলস ফ্লাওয়ারপিকর বা ফুলঝুড়ি যা বাংলাদেশের সবচেয়ে ছোটপাখি তা আজ প্রথম দেখলাম৷ এছাড়াও চোখে পড়ে শংখ চিল, হাঁড়িচাচা, ফটিকজল (যাকে তৌফিক পাখিও বলা হয়) ও অন্যান্য কিছু পাখি৷ সাড়ে এগারটায় টাওয়ারে মিট করার কথা থাকলেও বৃষ্টি শুরু হওয়ায় আগেই পেঁছুতে হল৷ এর মধ্যে শেখরভাই আমাদের সাথে যোগ দিয়েছেন৷ উনি একটু দেরী করলেন, এই যা৷ টাওয়ারের পাশেই মোটামুটি বড় একটা জায়গা ইট দিয়ে হাঁটু পরিমান উঁচু করে ঘেরা এবং উপরে টিন দিয়ে ছাদ তৈরী করা- এমন জায়গা পাওয়া গেল৷ সম্ভবত: মসজিদের জন্য তৈরী করা হয়েছিল৷ তবে ধুলোবালির আস্তর আর লাল মাটির বহর দেখে মনে হল অনেক দিন এখানে কেউ নামাজ পড়েনা৷ সেখানে চার দল ভাগ হয়ে বসে কারা কী দেখেছে তার লিষ্ট প্রকাশ করলাম৷ মোট ২৩ টির মত প্রজাতি তখনকার হিসেবে দেখা গেল৷ অনেকেই খাওয়া পর্ব সেরে নিল৷ ইতোমধ্যে বৃষ্টি শেষ হয়ে গেছে তাই আমরা একত্রে পাইন বনের দিকে চললাম৷ সেখানে আবাসিক এলাকার একটি মসজিদে জুমার নামাজ পড়া হল৷ অনেকেই সেই ফাঁকে দুপুরের খাবার সেরে নিল৷ ফিল্ড রিপোর্ট জমা দিলাম৷ তারপর সবাই দ্বিতীয় দফা কাজ শুরু করলাম৷ এ পর্যায়ে নতুন কিছু পাখি দেখা গেল৷ পৌনে তিনটার দিকে রনী ভাই বোটানিক গার্ডেনের মেডিসিনাল প্লান্ট সেকশনের সাথে আমাদের পরিচয় করালেন৷ সেখানে যা দেখলাম তার মধ্যে তুলসী, আ্যসপারাগাস, বিলাইচিমটি, ঘৃতকুমারী, গোলমরিচ ইত্যাদি অন্যতম৷ সাড়ে তিনটার দিকে রনী ভাই চলে গেলেন৷ তখন শেখর ভাইএর নেতৃত্বে আমরা তের জন রইলাম৷ সাড়ে তিনটা সময়টা ভরদুপুর হলেও আকাশে মেঘ থাকায় রোদ ছিলনা, বরং একটা আবছা অন্ধকার সমস্ত অঞ্চলকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল৷ আমরা গার্ডেনের পশ্চিম গেট পেরিয়ে অচিনবৃক্ষের কাছে গেলাম৷ আমি একটু আগে পেঁছে দেখি তুরাগ নদী উপচে পানি এখন অচিন বৃক্ষের গোড়া ছুঁই ছুঁই করছে৷ অসংখ্য পাখির কলকাকলীতে সে অঞ্চল মুখরিত৷ আমার এত ভাল লাগছিল যে প্রকাশ করা কঠিন৷ কাঠ শালিক, ইন্ডিয়ান কোয়েল, বসন্তবৌরী, পাইড ময়না, মারাঠা উডপেকার সেখানেই চোখে পড়ল৷ লাল লাল বটের ফল ধরেছে সে কারণেই এত পাখির আনাগোনা৷ ধীরে ধীরে দলের সবাই গাছতলে আসায় পাখিগুলো একে একে চলে যেতে যেতে শূন্য হয়ে গেল৷ দক্ষিণ দিকে শকুন দেখার আশায় বাঁধের উপর দিয়ে অনেকদূর গেলাম৷ সাদা খঞ্জন দেখলাম, ছোট মাছরাঙা, ফিঙেও চোখে পড়ল৷ একটা বড়সর গুইসাপ রোধ পোহাচ্ছিল পড়ন্ত বিকেলের নরম আলোয়৷ আমাকে দেখে অলস ভঙ্গিতে গর্তে ঢুকে পড়ল৷ সূর্য ইতোমধ্যেই অনেক নীচে নেমে পড়েছে৷ আর তাই ভরা নদীতে সোনালী আলোর দ্যুতি চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছিল৷ ক্যামেরা নিয়ে অনেক্ষণ ধরে কয়েকটা ছবি তুললাম৷ সূর্য ডোবার মুহূর্তে কিছু ভাল ছবি পেয়েছি৷ বটগাছের উত্তরে পুকুরের ভেতরের অংশের হিজল গাছের উপর বাম পা রেখে বাম হাতে ছোট একটা ডাল ধরে কোন মতে অস্তগামী সূর্যের দুটো ছবি তুলেছি৷ গাছ থেকে নেমে এসে দেখি বাম হাত মাকড়সার জালে মাখামাখি৷ ততক্ষণে সূর্য দূরে বনরেখায় নেমে গেছে৷ চট করে আরো দুটো ছবি তুলে ফিল্ম শেষ করলাম৷ সূর্য ডুবে গেল৷ আমরা তের জন দ্রুত গার্ডেন ত্যাগ করলাম কারণ সূর্যাস্তের পর সেখানে থাকা নিষিদ্ধ৷

বাড়িতে ফিরে ঘুমাবার সময় সেই নিস্তব্ধ বনানীতে হঠাৎ দুএকটা পাখির ডাক, দোয়েলের শীষ, গো-শালিকের ঝগড়া আর শঙ্খ চিলের করুণ সুরের কথা মনে করছি৷ মনে পড়ছে অচিন বৃক্ষের কাছে সূর্য ডোবার সেই মনোহরী দৃশ্যের৷ মনে মনে ভাবি আহা আবার কবে যাবো সেখানে- যেখানে ছোট ছোট কাঠবেড়ালী নেচে বেড়ায় মনের আনন্দে, পাখিরা এক ডাল থেকে আর এক ডালে উড়ে বেড়ায়, দোয়েলের বিভ্রান্তিকর শীষ আর অলিভ ট্রি পিপিটের হঠাৎ মাটি থেকে গাছে উঠে চমকে দেয়া৷ সেই প্রকৃতির কাছে যে আমার যেতে ইচ্ছে করে বার বার৷

মন্তব্যগুলো (0)Add Comment

মন্তব্য লিখুন

security code
Write the displayed characters


busy
 
< পূর্বে   পরে >