''লাক্সর" নামটা একটু বেমানান আমাদের কাছে৷ কিন্তু যদি বলি মিশর কিংবা কায়রো তবে, হ্যাঁ৷ এক কথায় পিরামিডের দেশ৷ আর বছর খানেক আগে বিশ্বব্যাপি মুক্তি পাওয়া 'মামি' মুভিটার বদৌলতে আমাদের কাছে মিশর জীবন্ত মিস্ট্রির আরেক নাম৷ তবে এখানে মজার একটা বিষয় হলো মিশর মানেই পিরামিড নয়৷ আসলে মিশরে পিরামিড ছাড়াও দেখার আছে আরো অনেক কিছু৷ পিরামিড পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের একটা হওয়ার কারণেই মনে হয় অন্যান্য উল্লেখযোগ্য স্থানগুলো কিছুটা হলেও আড়ালে থেকে যায়৷
 Photo: Muntasir Mamun আসল কথায় আসা যাক৷ লাক্সর হলো মিশরের দক্ষিণে অবস্থিত নীল নদের তীরবর্তি শহর৷ শুধু শহর হিসেবে নয়, প্রাচীন ফারাওনিক সভ্যতার বেশ কিছু স্থাপনার অবস্থান এখানে৷ আর তাই ‘লোনলি প্লানেট ইজিপ্ট’ বইতে লেখক এবং সম্পাদক একটা কথাই শুধু বলেছেন ‘লাক্সর : এমন একটা জায়গা, যা কিনা পৃথিবীর আর কোথাও মেলে না’৷ আধুনিক শহরের পাশে (আসলে ভিতরে বলাই ভাল ) বিশ্ব সভ্যতার প্রাচীনতম নিদর্শনগুলো এমন ভাবে বিছিয়ে আছে যা বিশ্বাস করাটা কিছুটা শক্ত৷ বিশালাকার স্থাপনা এবং বেশকিছু সংখ্যক মনুমেন্ট মিশরের গ্রেটেস্ট এট্রাকশন পিরামিডের চেয়ে কম নয়৷ এই হলো লাক্সর-এর কিছুটা পরিচিতি৷ মূলত: ফারাওনিক মিশরের দর্শনীয় ১২ টা স্থাপনার মধ্যে আটটিই আছে এই নাইল ভ্যালি - ছোট্ট লাক্সর-এ৷ "কারনাক" টেম্পল থেকে শুরু করে নীলের পূর্ব পাশের দাইর-আল-বাহরি টেম্পল, হাবু টেম্পল, বিশাল মেমনন টেম্পল আর পশ্চিম তীরের ভ্যালি অব দি কিং; সবই এই লাক্সর-এ৷ আসলে আমার মত পর্যটকের কাছে এটা প্রাচুর্যের অবমাননা (!) কেননা এত ছোট জায়গায় এত কিছু দেখার আছে যা শেষ হবার নয়৷ তাই অনেকেই বিনা দ্বিধায় বলেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ওপেন এয়ার মিউজিয়াম এটিই৷
জীসুর জন্মের প্রায় চার হাজার বছর আগের পুরোনো এই কীর্তিমান শহরে তাই পর্যটক বা ভ্রমণ পীয়াসিদের আনাগোনা নতুন না৷ নতুন কেবল আমি, এই আদিম সভ্যতার সত্যের মাঝে৷ পাহাড়পুর, মহাস্থান আর হালের সুফি স্যারের খোঁড়াখুঁড়িতে বেড়িয়ে পরা ওয়ারি বটেশ্বর-ই আমার কাছে যথেষ্ট ছিল৷ তাই প্রথমটায় ধকল ছিল বেশ৷ সারা দুনিয়ার নানা বর্ণের মানুষের আনাগোনা এখানে একই স্বাধের আশায়- পৌরানিক মিশর৷ সাদা-কালো চামড়ার টুরিস্টরা বড়সড় মার্সেডিজ বাসের টিন্টেড গ্লাসের ভিতর দিয়ে শহর দেখেন৷ থাকেন তারকা হোটেলে৷ তাই লাক্সর চলে মূলত বিদেশি পয়সায়৷ তাবে সারা বছর না হলেও মে থেকে সেপ্টেম্বর মাসে গরম উপেক্ষা করে পর্যটকদের আধিক্য থাকে বেশি৷
সূচনা করলাম ভ্যালি অফ দি কিং দিয়ে ৷ প্লেস অফ ট্রুথ নামে পরিচিত এই মরুময় বালুকার মাঝে হঠাৎ করে গজে ওঠা ক্লিফগুলোই নাকি ভ্যালি অফ দি কিং ! আশ্চর্য ভ্যালিটা কোথায়? পরে দেখা গেল আল কোর্ন নামের পাহাড়ের নিচেই কবর গুলো৷ আসলে এটা একটা বিশালাকার কবরস্থান৷ পূন:জন্মে বিশ্বাসী ফাওরাদের রাজকীয় কবরগুলির বেশিরভাগ এখানে৷
এযাবত মাত্র ৬২ টি টম্ব আবিস্কৃত হলেও আরও যে আছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না৷ যদিও তার সবগুলো ফারাওদের না৷ এস্কাভেটেড ৬২টি টম্বের মধ্যে সবগুলো পাবলিকের জন্য খুলে দেয়া হয়নি৷ টম্বগুলোকে নাম্বার দিয়ে সিরিজ করা হয়েছে এবং প্রথমটাই হলো দ্যা গ্রেট রামেসিস-৭-এর৷ বিখ্যাত এই টম্বটা খোলা আছে সেই গ্রীক এবং রোমান সময় থেকে৷ আর হালের (তাও ১৯২২ সাল) আবিস্কৃত টোতেনখামুনের টম্বটি আছে ৬২ নাম্বার-এ৷ টোতেনখামুন কেন বিখ্যাত তা নিয়ে আছে যথেষ্টই সংশয়৷ কেননা ইতিহাসে তার প্রভাব তেমন একটা নয় যে কারণে তিনি এত বিখ্যাত হবেন৷ আর আজ কিছু হলেই শোনা যায় কিং তুত-এর কথা! এক কথায় ফারাওনিক ইজিপ্টের আধুনিক স্টার তিনি৷
টম্বগুলোর ভিতরে ঢোকা যায়৷ মূল ভ্যালিতে ঢোকার সময় মাশুল গুনতে হয় প্রায় ৪০ মিশরীয় পাউন্ডের মত৷ এই এক টিকিটে তিনটি টম্বের ভিতরে প্রবেশ করা যায়৷ উঁচু পাহাড়ের পাদদেশে প্রবেশদ্বার৷ সোজা হয়ে ঢোকা যায় তবে খানিক ঢালু হয়ে গেছে নিচের দিকে৷ যেখানে গিয়ে শেষ হয় তা মূলত ছোটখাট একটা হল ঘর৷ এখানেই এককালে শায়িত হতো রাজা কিংবা সমগোত্রীয়রা৷ আমার দেখা তিনখানা টম্বের বর্ণনা প্রায় এক রকম৷ দেয়াল জুড়ে হায়ারোগ্লিফ, প্রাচীন দেয়ালে নতুন করে আঁকা দেয়াল চিত্র আর পর্যটকদের কোলন, পারফিউম কিংবা বডির গন্ধে কিঞ্চিৎ ভারি বাতাসেই আমার টম্বের অভিজ্ঞতা আটকে গেল৷ কেননা যা দেখেছি তার হিসাব মিলানই যে আমার কাছে কঠিন৷ কত আগে এত কিছু ! কিভাবে ?
বিশ্বাস আর অবাক হওয়ার অনুভূতির আত্নাহুতি হয়েছে আগেই৷ আসলে হাবু টেম্পলটা তেমন একটা জনপ্রিয় না৷ তাই ট্যাক্সি ড্রাইভার যখন ওদিকটায় যাচ্ছিল তখন মনে হলো ঠকছিই বোধ হয়৷ তবে না৷ পিচ ঢালা রাস্তা দিয়ে আমাদের গাড়ি চলে এল মাদিনাত হাবু টেম্পল এ৷ রককাট আর্কিটেকচারের আদিম গন্ধের স্থাপনাগুলোর এক ছায়ায় নামলাম৷ টিকেট গেট দিয়ে ঢুকেই সামনে পড়তে হয় বিশাল একটা ব্রিক ওয়ালের৷ অনেক উঁচু দেয়াল৷ কত উচু হবে? তাও আনুমানিক দশ তলা? তাতো হবেই৷ গায়ে সেই আঁকিবুকি৷ দারুণ লাগে৷ শুধু একটা দেয়ালই বা কেন এত উঁচু হবে? এটা কি রাজার খেয়াল? জানি না৷ এত পুরোনো দেয়াল! নতুন না তো? ভেজালের দেশের মানুষ আমি, তাই খুবই কাছে গিয়ে পরীক্ষা করে দেখলাম৷ কি বুঝলাম জানি না, তবে এরপর যত বার যত কিছু দেখলাম, শুধু দেখেই গেলাম, মনের মাঝের পরীক্ষাগারটা পুড়ে গেছে প্রথম আগুনে৷ আমার আর দোষ কি, আমার মনের সীমাবদ্ধতার জন্য আমি তো আর দায়ী না, দায়ী আমার মন৷
হাবু টেম্পল আসলে একটা ফিউনারল টেম্পল, মৃতদেহের শেষকৃত্যানুষ্টান সম্পন্ন করা হতো এখানে৷ রামেসিস -৩ এর সময় তৈরী এই মন্দিরের গা ঘেঁসে দেখা যায় টেম্পল অফ আমুন। আমুন ছিলেন স্থানীয় দেবতা৷ বিশাল সেই ব্রিক ওয়ালটা পার হয়ে ঢুকলে প্রথম কোর্টটা পাওয়া যায়৷ হাজার বছরের পুরোনো পাথরের মেঝে আর চারদিকে দেয়াল-সমান উঁচু মূর্তি সদৃশ্য খুঁটিগুলোর প্রায় সবগুলোই আজও দাড়িয়ে আছে৷ কেন দাড়িয়ে আছে তা বোঝা যায়, পাথরগুলো অনেক শক্ত আর বেড়টা অনেক বেশি (!) কিন্তু তৈরী কেন হয়েছিল তা জানি না৷ চারপাশটা দেখে সামনের দিকে এগোলে আরেকটা কোর্ট৷ খুঁটির সংখ্যা আগের চেয়ে বেশি৷ খুঁটির গা জুড়ে প্রাচীন মিশরিয় ড্রয়িং৷ এগুলোই নাকি হায়রোগ্লিফ৷ রাজ রাজাদের কাহিনী৷ রামেসিস-৩ সাথে দেবতা আমুনের যুদ্ধবন্দি বিনিময়ের দেয়াল চিত্র৷ আচ্ছা এই যে বড় বড় পিলার, তো ছাদ কই? ছাদের তো ছিটেফোটাও নাই৷ তবে কি ভেঙ্গে পরেছে? তা মনে হয় না৷ তবে? প্রশ্নটা শেষ না করেই বেরিয়ে এলাম মাদিনাত হাবু থেকে৷
ছোটাখাট আরও কিছু এবং দোকানপাট দেখে ফিরে এলাম পূর্ব প্রান্তে৷ খিধেয় চোঁ চোঁ করা পেট নিয়ে সরাসরি চলে এলাম ম্যাকডোনাল্ড এ৷ লাক্সর টেম্পল দেখতে দেখতে "বিগ টেস্টি" খাওয়ার মজাই আলাদা৷ তবে খেতে ভাল লাগলেও এমনটা করা মনে হয় খুব সমিচিন নয়৷ এমন পুরাকীর্তির এত কাছে দোকানপাট, ব্যপারটা ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না৷ সামান্য সময় বিশ্রাম নিয়ে চলে এলাম কারনাক এর মন্দিরে৷ পূর্ব তীরের এই মন্দির খুবই জনপ্রিয়৷ তবে মাঝ দুপুরে গরমের তাপ এতই বেশি যে আমরা বাধ্য হয়ে আরও খানিকটা সময় প্রবেশ মুখের সামনের গাছে ছায়ায় অপেক্ষা করতে লাগলাম৷ হাবু টেম্পলের জনপ্রিয়তা না পাওয়ার কারণটা বুঝতে পারলাম৷ কারনাক আর হাবু টেস্পলের বেশ সাদৃশ্য আছে৷ তবে কারনাক অনেক বেশি বড়৷ উঁচু উঁচু পিলারগুলো ছাড়াও এখানে যেটা চোখে পড়ে তা হলো বিশালাকার মূর্তি৷ গরমে অতিষ্ট হয়ে অনেককেই দেখলাম ছায়ায় সময় কাটাতে৷ কতক জায়গায় পিলারের অবস্থান অনেক ঘন৷ তবে হাবু টেম্পরের মত এত বড় আকারের কোর্টের দেখা মেলেনা এখানে৷ রামেসিসের মূর্তিটা দারুণভাবে কাছে টানে শুরুতেই৷ রামেসিস-২ দাঁড়িয়ে আছে তার মেয়ের সাথে৷
বের হয়ে চলে এলাম লাক্সর টেম্পলে৷ এ অঞ্চলে বিখ্যাতদের মধ্যে বিখ্যাত এটি৷ তবে কেন বোঝা গেলনা৷ যতদূর জানতে পারলাম ২০০ এর কাছাকাছি সম আকৃতির পিলার আছে এখানে৷ আর গত এপ্রিলের নিউজউইকে লাক্সর টেম্পলকে বলা হয়েছে হুমকির সম্মুখিন পুরাকীর্তি হিসেবে৷ মজার ব্যাপার হলো টেম্পলে ঢোকার পর দেখা যাবে পুরোনো স্থাপনার মাঝ দিয়েই তৈরী হয়েছে মিশরীয় কায়দায় মসজিদ৷ ইউরোপিয় চিমনি আকৃতির মিনারটা চোখে পড়ে অনেক দূর থেকেই৷ বেশ বেমানান৷ গাইডেড টুরিস্টরা তাদের গাইডকে জিজ্ঞেস করছিল, এটাও ফারাওনিক কিনা! তবে তার কোন সম্ভাবনাই নাই৷ এই টেম্পল তৈরী হয়েছিল নতুন ফারাও রাজা আমেনহোটেপ-৩ এর দ্বারা (খৃস্টপূর্ব ১৩৯০ থেকে ১৩৫২)৷ তিন দেবতা আমুন-মুট-খোন এর নৈবেদ্যর জন্য এই টেম্পল তেরী করা হয়েছিল বলে জানা যায়৷ সৃষ্টির দেবতা আমুন ছিলেন খুবই গুরুত্বপূর্ণ ততকালীন মানুষের কাছে৷ সেসময় আমুন-রা (সৃষ্টির দেবতা আমুন এবং সূর্য দেবতা রা) এর পুজা হতো দেশের অন্যান্য জায়গাতেও৷ তবে বছরে একবার টেম্পল কারনাক থেকে আমুন, তার স্ত্রী যুদ্ধের দেবী মুট এবং তাদের পুত্র চন্দ্র দেবতা খোন এর ছবি ভেসে আসত নীল নদের পার হয়ে এই লাক্সর টেম্পলে৷ এতে করে ফারাও রাজা দেবতা আমুনের দর্শন লাভের মাধ্যমে তার ক্ষমতার বৃদ্ধি ঘটাত৷ ধর্মীয় বিশ্বাসটা ঠিক এমনই ছিল বলে মনে করা হয়৷
তবে লাক্সরে কোন টেম্পলে আজ আর পূজা হয়ে ওঠে না৷ নিছক কৌতূহলী হয়েও যদি একবার যাওয়া হয়ে ওঠে লাক্সরে তবে প্রথমটায় হোঁচট খেতে হবে শুধু পাহাড়ের জঙ্গল দেখে কিন্তু যখন জানা যাবে কোন মন্দির কেন এবং কোথায় কি হতো, তখন একটু খটকা লাগবে, আমি দাঁড়িয়ে আছি ২০০৬ সালে আর এসব কিছু হয়েছে জীসুর জন্মেরও ১৫০০ বছর আগে? কিভাবে ?
|