| ঢাকা-কুয়ালালামপুর লংকাভি |
|
|
| লিখেছেন ফরিদী নুমান | |
| Tuesday, 19 February 2008 | |
|
মাত্র পাঁচ দিনে ৩ লাখ ৭৫০ হাজার বর্গকিলোমিটারের বিশাল একটি দেশ কি ঘুরে দেখা সম্ভব? সে দেশটি আবার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিকাশমান অর্থনীতির দেশ। সাম্প্রতিক বিশ্ব রাজনীতিতে দৃঢ় কথা বলার জন্য বার বার আলোচিত হয়েছে দেশটি। বিশ্বের পর্যটনপ্রেমিকদের প্রধান গন্তব্য। হ্যাঁ, মালয়েশিয়ার কথাই বলছি। পরিকল্পনাটা বেশ ক’মাস আগেই জানিয়েছিলেন খলিলী ভাই। আমি, খলিলী ভাই আর মাসুম বিল্লাহ ভাই। তিনজনের টিম। ২০০৭ সালের ২ মার্চ দিবাগত রাত দেড়টায় মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে কুয়ালালামপুরের উদ্দেশে আমাদের যাত্রা শুরু হলো। নির্দিষ্ট সময়ের কিছু পর ঠিক ২টা ৯ মিনিটে বিমান আকাশে ডানা মেলল। ![]() মালয়েশিয়ায় লেখক মালয়েশিয়ার ইতিহাস খুব দীর্ঘ নয়। সপ্তদশ শতকের প্রথম দিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ডাচরা বাণিজ্য এলাকা গড়ে তোলে। ১৭৮৬ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ফ্রান্সিস লাইট এই উপদ্বীপে আসেন। ১৭৯১ সালে কেদাহর সুলতানের কাছ থেকে বার্ষিক কর পরিশোধের চুক্তিতে ব্রিটিশরা পেনাংয়ে বাণিজ্য ও নৌ-ঘাঁটি স্থাপন করে। ১৮১৯ সালে ব্রিটিশরা সিঙ্গাপুর এবং ১৮২৪ সালে মেলাকা ডাচদের কাছ থেকে দখল করে নেয়। এ সময় পেনাং, মেলাকা এবং সিঙ্গাপুরে দ্বৈত শাসন চালু হয়। ১৮৯৬ সালে পেরাক, সেলাঙ্গর, পাহাং এবং নাগবি সেমবিল নিয়ে ফেডারেল মালয় স্টেট গঠিত হয়। ১৯০৯ সালে এর সাথে যুক্ত হয় কেদাহ, কেলান্তান, পার্লিস ও তেরাঙ্গানো। টিন ও রাবার খনির কারণে মালয় রাতারাতি আলোচিত হয়ে ওঠে। এ সময়ে দক্ষিণ ভারতীয় ও চাইনিজ জনগোষ্ঠী দলে দলে এখানে আসতে থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও হল্যান্ড জাপানের সাথে বাণিজ্যিক অবরোধ আরোপ ও তেল সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। ফলে কাছাকাছির মালয় জাপানি হুমকির মুখে পড়ে। ১৯৪১ সালের ৮ ডিসেম্বর মালয়ের কোটা ভারু ও কেলান্তান দ্বীপে এবং সিঙ্গাপুরে ব্যাপক বোমাবর্ষণ করে জাপানিরা। প্রায় কোনোরকম প্রতিরোধ ছাড়াই জাপানিরা সিঙ্গাপুর ও মালয়কে দখল করে নেয়। এ সময় তারা অনেক চায়নিজকে নির্যাতন ও হত্যা করে এবং ভারতীয়দের বার্মার ডেথ রেলওয়ে নির্মাণের কাজে লাগায়। পরবর্তী সাড়ে তিন বছর এখানে জাপানিদের শাসন চলে। ১৯৪৫ সালে জাপানের হিরোশিমা-নাগাসাকিতে আণবিক বোমা বিস্ফোরণের সাথে সাথে জাপানিরা মালয় ছেড়ে চলে গেলে এখানে ব্রিটিশ তত্ত্বাবধানের শাসন পুনঃ প্রতিষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই কমিউনিস্টপন্থী চাইনিজ গেরিলাদের কারণে মালয়ে জরুরি আইন ঘোষণা করতে হয়। বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশরা এই কমিউনিস্ট গেরিলাদের অস্ত্র দিয়েছিল জাপানিদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য। বিশ্বযুদ্ধের পর এই গেরিলারা দেশটিতে জোর করে কমিউনিস্ট শাসন প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছিল। জরুরি আইন চলে ১২ বছর, ১৯৬০ সালে এর অবসান হয়। মালয় ১৯৫৭ সালে ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। এ বছর ৩১ আগস্ট কুয়ালালামপুরের দাডারান মারদেকায় (ফ্রিডম স্কয়ার) টিংকু আবদুর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ১৯৭৪ সালে সেলাঙ্গরের সুলতানের অনুমোদনক্রমে মালয়েশিয়া স্বাধীন ফেডারেল টেরিটরি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ![]() মালয়েশিয়ায় লেখক মালয়েশিয়ার মোট জনগোষ্ঠীর ৬০ ভাগ মালয়ি। তারা মালয় ভাষায় কথা বলে। এক-চতুর্থাংশ চাইনিজ। ব্যবসা তাদের নিয়ন্ত্রণে। ১০ ভাগ ভারতীয়। এদের বেশিরভাগই দক্ষিণ ভারতের হিন্দু তামিল। দেশটিতে মিশ্র সাংস্কৃতিক আচরণ রয়েছে। চাইনিজরা ঘটা করে তাদের নববর্ষ, হিন্দুরা জাঁকজমকের সাথে দীপাবলি উৎসব আর সংখ্যাগুরু মুসলমানরা তাদের সব ধর্মীয় অনুষ্ঠান করে চমৎকার সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে। মালয়েশিয়ার আবহাওয়া নাতিশীতোষ্ণ। সারা বছরই গরম, সারা বছরই বৃষ্টি। প্রকৃতি সব সময়ের জন্য একই রকম, সবুজ। মালয়েশিয়ার সময় আমাদের সময়ের চেয়ে ২ ঘণ্টা কম। স্থানীয় সময় সকাল ৭টায় ফ্লাইটটি কুয়ালালামপুর ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট বা কেএলআই-তে ল্যান্ড করল। এয়ারপোর্টের বাইরে এসে টিএম কোম্পানি সেলকমের দুটি সিম কিনলাম। বাংলাদেশে টিএম কোম্পানি মোবাইল সেবা দেয় একটেল হিসেবে। এয়ারপোর্ট থেকে একটা লিমুজিন ভাড়া করে আমাদের জন্য নির্ধারিত দুতা সড়কের হোটেল দুতাভিস্তায় উঠলাম। হোটেলের ৩৬৩ নম্বর স্যুটটি আমাদের। বেশ বড়সড় সাজানো-গোছানো এই স্যুটে দু’টি বেডরুমে মোট তিনটি সিট আছে। আছে ডাইনিং রুম, কিচেন রুম, আলমারি, ফ্রিজ, ড্রইং রুম, এসি, টেলিভিশনসহ একটি বাসার জন্য যে রকম প্রয়োজন সে রকম। এক কথায় পুরো একটি বাসা। ভাড়া প্রতিদিন ৩০০ রিংগিত, বাংলাদেশী টাকায় ৫ হাজার ৪০০ টাকা। রাত ৯টায় স্বপন ভাই এলেন। তিনি মালয়েশিয়ায় প্রায় দেড় যুগ ধরে ব্যবসা করছেন। একটা প্রাইভেটকার নিয়ে এসেছেন, গাড়ির চালক হোসেন ভাই এখানকার প্রধান বিচারপতির গাড়ির ড্রাইভার। আমরা বেরোলাম রাতের আলো ঝলমলে কুয়ালালামপুর শহরকে দেখতে। গ্রামের মানুষ ঢাকা শহরে এলে যেমন মুগ্ধ হয়, ঠিক তেমনি আমার মুগ্ধতা বারবার রঙ-বেরঙের ঝলকানিতে আটকে যাচ্ছিল। এটা আরো অনেক বেড়ে গেল যখন হোসেন ভাই গাড়িটিকে হাজির করলেন টুইন টাওয়ারের নিচে। কেমন একটু শিহরণও বোধ করলাম। রাতের টুইন টাওয়ার দেখে হার্টফেল করার দশা আমার। বারবার আফসোস হচ্ছিল। দু-দুটি ক্যামেরা থাকার পর একটি ক্যামেরাও সাথে আনিনি ভুলে। একটি ফাস্ট ফুডের দোকানে ঢুকে আমরা কিছু খেলাম। এরপর টুইন টাওয়ারের ভেতরে মুভি কর্নারে হিন্দি ছবি ঊশষধাুধ দেখে রাত দেড়টার পর রুমে ফিরলাম। পরদিন ৪ মার্চ। সকাল ৮টায় ঘুম থেকে উঠে ঝটপট তৈরি হয়ে নিলাম। আমাদের আজকের অন্যতম গন্তব্য গেনটিং হাইল্যান্ড। কুয়ালালামপুর সিটির ৫১ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে এই গেনটিং হাইল্যান্ড। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২ হাজার মিটার ওপরে গড়ে উঠেছে এই পর্যটন শহর। স্বপন ভাই সকাল ৯টার পর এলেন, আমরা বেরিয়ে পড়লাম। প্রায় পৌনে ১ঘণ্টা চলার পর দূর থেকে পাহাড়ের চূড়ায় উড়ে চলা মেঘের মাঝে ছোট্ট শহরকে দেখিয়ে স্বপন ভাই বললেনÑ এটিই গেনটিং হাইল্যান্ড। আরো প্রায় ১০ মিনিট পাহাড়ের আঁকাবাঁকা রাস্তা পেরিয়ে গাড়িটি পার্ক করলেন হোসেন ভাই। স্কাইওয়ের একটি ফাস্ট ফুডের দোকানে বসে আমরা নাশতা করলাম। মেনু ‘নাইস আইয়াম’। এই খাবারটি মালয়েশিয়ানদের খুবই প্রিয়। অনেকটা আমদের ‘চিকেন রাইস’-এর মতো। স্বপন ভাই জানালেন এই গেনটিং হাইল্যান্ডটি মালয়েশিয়া সরকারের তত্ত্বাবধানে চীনা বিনিয়োগে নির্মিত হয়েছে। আমরা ক্যাবল কারে চড়ার জন্য লাইনে দাঁড়ালাম। ১৮ মিনিটের এই যাত্রাপথে পাহাড়ের ওপর দিয়ে, বড় বড় গাছপালার ওপর দিয়ে আমরা পৌঁছলাম মূল হাইল্যান্ডে। গেনটিং হাইল্যান্ডটি মানুষ আর মেঘের ভাগাভাগির শহর। উঁচু উঁচু ভবনের মাঝ দিয়েই উড়ে যাচ্ছে মেঘ। এই রোদ্দুর খানিক পরেই তা আর নেই, কেমন কুয়াশা কুয়াশা ভাব। কিছুক্ষণ গরম লাগলেও খানিক পরে কেমন হিম হিম ভাব। তাপমাত্রা ১৬ থেকে ২৩ ডিগ্রির মধ্যে থাকে। এ রকম একটি পরিবেশের মধ্যেই বেশ ক’টি পাঁচতারা হোটেল, অ্যাপার্টমেন্ট, অফিস, বাড়ি নিয়ে এই ছোট্ট পর্যটন শহর। এ ছাড়াও এখানে শিশু-কিশোরদের জন্য মজার স্বপ্নপুরী, থিমপার্ক তো আছেই, আরো আছে ট্রেন বাস। এই বাস ট্রেনের বগির মতো। চলে খুব ধীরে ধীরে। পুরো শহরটিরে ঘুরে দেখার জন্য এটি খুবই জুৎসই। হোটেল ফার্স্ট ওয়ার্ল্ডের সামনে চীনাদের ঐতিহ্যবাহী নাচ দেখে আমরা ভীষণ মুগ্ধ হলাম। মালয়েশিয়ার একমাত্র ক্যাসিনোটি আছে এখানে। এর পরে আমরা এলাম বাতু কেভসে। কুয়ালালামপুর সিটি থেকে ১৩ কিলোমিটার উত্তরে মালয়েশীয় হিন্দুদের পবিত্র স্থান বাতু কেভস। ১০০ মিটার ওপরে বিশাল পাহাড়ের মধ্যে পাশাপাশি তিনটি বড় এবং তুলনামূলক ছোট একটি গুহার সমন্বয়ে বাতু কেভস। মোট ৪০০ মিটার দীর্ঘ এ গুহাগুলো ১৮৯২ সালে আবিষ্কৃত হয়। বাতু কেভসের সামনে গুহায় প্রবেশ করার জন্য সিঁড়ি আছে। সহজভাবে বোঝার জন্য বলা যেতে প্রায় ২২ তলা উঁচু ভবন পরিমাণ উঁচু এই সিঁড়ি। আমি উঠছিলাম আর ভিডিও করছিলাম। ফলে খলিলী ভাই আর বিল্লাহ ভাই থেকে পেছনে পড়ে গেলাম। ওনাদের কাছাকাছি হওয়ার জন্য দ্রুত উঠতে গিয়ে হাঁফিয়ে উঠলাম। ওপরে কয়েকটা দোকান আছে। সেখানে ডাব দেখে খেতে ইচ্ছে হলো। যা দাম! তিন রিংগিত, বাংলাদেশী টাকায় ৫৪ টাকা। বাতু কেভস আসলে পাহাড়ের বিশাল প্রাকৃতিক গুহা। বিশাল বিশাল হলরুমের কয়েকটি জোড়া দিলে এর একটির সমান হবে। গুহার মাঝে মাঝে ফাঁকা থাকাতে সহজেই আলো প্রবেশ করতে পারে এখানে। ভেতরে বাইরে হিন্দু দেব-দেবীর প্রচুর মূর্তি আছে, মন্দিরও আছে কয়েকটি। বানর আছে বেশ ক’প্রজাতির। এদেরকে সবাই বেশ আদর করে, খাবার দেয়, ভক্তি করে। বিকেলে আমরা কুয়ালালামপুরের কোটারায়াতে এলাম। তুনতান সিউসিন সড়কের পাশে বাংলদেশীদের পরিচালিত বেশ ক’টি দোকান আছে এখানে। প্রতি রোববার বন্ধের দিনে এখানে প্রচুর বাংলাদেশী ভিড় করে। ভাগ্যের সন্ধানে পাড়ি দেয়া বাংলাদেশী ব্যবসায়ী, শ্রমিক কিংবা ছাত্রছাত্রীদের মিলনমেলার স্থান এই কোটারায়া। এটি আসলে কুয়ালালামপুরের এক টুকরো বাংলাদেশ। আমরা যখন কোটারায়াতে পৌঁছি, তখন পুলিশ রেইড করে অবৈধ কেউ আছে কি না চেক করছে। বিদেশী বিশেষ করে বাংলাদেশী শ্রমিকরা প্রায়ই পুলিশি হয়রানির শিকার হয়। পুলিশের রেইড থাকার কারণে আজ রোববার হলেও বাংলাদেশীদের আসর খুব একটা জমেনি। এখানকার ‘বাংলা ট্রেডিংয়ের দোতলায় কথা হয় নিপু ভাই, রাশেদ বাদলসহ বেশ ক’জন বাংলাদেশী ব্যবসায়ীর সাথে। তারা জানাল, মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশী জনশক্তি রফতানিতে বিভিন্ন সমস্যা, দূতাবাসের অসহযোগিতা, সর্বোপরি পুলিশের বিমাতাসুলভ আচরণ এখানে কর্মরত শ্রমিকদের সারাক্ষণই দারুণ উদ্বেগে রাখে। বাংলাদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দিবসগুলো কোনোরকম ঢিলেঢালাভাবে পালন করে আমাদের দূতাবাস। একবার ভারতীয় কিছু শ্রমিকের সাথে মালয়েশীয় পুলিশ অযথা দুর্ব্যবহার করলে ভারত সরকার এ দেশে শ্রমিক রফতানি এবং বিমান চলাচল বন্ধ করে দেয়ার হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে ভারতীয় শ্রমিকদের আর পুলিশি হয়রানির শিকার হতে হয় না। পক্ষন্তরে এখানে কর্মরত বৈধ বাংলাদেশী শ্রমিকরাও পুলিশি হয়রানিতে অবৈধদের মতো নির্যাতনের শিকার হয়। কোটারায়া থেকে বেরিয়ে ভারতীয়দের পরিচালিত একটি হোটেলে খাবার খেলাম। মালয়েশিয়ায় এই প্রথম তৃপ্তির সাথে খাবার খেলাম। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে হোটেলে ফিরে খুব ক্লান্তি বোধ করছিলাম। বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই ঘুমিয়ে পড়লাম, উঠলাম রাত সোয়া ১০টায়। মালয়েশিয়ায় আমাদের সময় খুবই কম। কুয়ালালামপুরের বাইরে কোথাও যাওয়া হলো না। খলিলী ভাই লংকাভি যাওয়ার জন্য বিভিন্ন স্থানে খোঁজখবর নিলেন। কেউই এক-দু’দিনে লংকাভি গিয়ে ফিরে আসার সম্ভাবনাকেও সাপোর্ট করছে না। সবার কথা লংকাভি কমপক্ষে এক সপ্তাহের জন্য যেতে হয়। আমাদের হাতে অত সময় নেই। বিমানে শর্টকাট রাস্তা হয় কি না দেখতে লাগলাম। না, বিমানে কমপক্ষে এক সপ্তাহ আগে টিকিট বুকিং দিতে হয়। শেষমেশ খলিলী ভাই তার এক আত্মীয়ের পরামর্শে লংকাভির রুট নির্ধারণ করলেন। সিদ্ধান্ত হলো আগামীকালই রাতের গাড়িতে রওনা হব আমরা। নাশতা খেয়ে বের হলাম। রাস্তার ওপারে বাস স্ট্যান্ডের পাশেই মাইনুল গাড়িসহ দাঁড়িয়ে ছিল। গাড়িতে উঠে প্রথমেই ফিরতি টিকিট কনফার্ম করতে মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের একটি অফিসে গেলাম। অনেক সময় লাগল টিকিট কনফার্ম করতে। প্রায় ১২টা বাজল। মাইনুল একটা মার্কেটের সামনে রাস্তার পাশে গাড়িটি রেখে হাওয়া হয়ে গেল। মোবাইলটিও রেখে গেল গাড়িতে। পুলিশ এল। মাইনুল এল প্রায় ৫০ মিনিট পর। তার জরিমানা হলো রাস্তার ওপর গাড়ি রাখার অপরাধে। পুডোরায়ায় এসে রাতে লংকাভি যেতে বাসের টিকিট কাটলাম। কনসোর্টিয়াম বাস এক্সপ্রেসের প্রতি টিকিটের মূল্য ৩৩ রিংগিত। পুত্রাজায়ায় ঢুকতে প্রথমেই চোখে পড়বে আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টার। ওআইসি’র মহাসম্মেলনসহ বড় বড় আন্তর্জাতিক সম্মেলন এখানে অনুষ্ঠিত হয়েছে। কৃত্রিম লেক তৈরি করে তার মাঝে এর অবস্থান। দূর থেকে মনে হবে কোনো কাউবয় বসে আছে হ্যাট মাথায়। এর সামনেই অপূর্ব দৃষ্টিনন্দন পুত্রা ব্রিজ। এ রকম আরো তিনটি আকর্ষণীয় ব্রিজ আছে এখানে। কনভেনশন সেন্টারের সোজা উত্তরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। মাঝখানের রাস্তার দুই পাশে মিনারা পিজেএইচ টাওয়ার, প্যালেস অব জাস্টিস, গভর্নমেন্ট কমপ্লেক্স, মিনিস্ট্রি অব ফাইন্যান্স, স্পোর্ট মিনিস্ট্রি, পারবান্দানান পুত্রাজায়া কমপ্লেক্স, মারতিমি সেন্টার ইত্যাদি। রাস্তার পাশের লাইটপোস্টের ডিজাইন পাল্টেছে প্রতি কিলোমিটার পর পর। ফুটপাতগুলোও যেন শিল্পীর ক্যানভাস। বিভিন্ন ডিজাইনের ইট দিয়ে তৈরি ফুটপাথে বাহারি সব ফুলের গাছ সাজানো আছে স্টাইলিস্ট টবের মাঝে। প্রধানমন্ত্রীর দফতরের সামনে পুত্রা স্কয়ার। এর পশ্চিম কোণে সর্বাধুনিক স্থাপত্যশৈলীর আরেক আকর্ষণ পুত্রা মসজিদ। বাগদাদের শেখ ওমর মসজিদের অনুকরণে এ মসজিদটি নির্মিত হয়েছে। ভেতরে-বাইরে অপূর্ব অসাধারণ আধুনিক কারুকার্য নিদর্শন বিশ্বময় পর্যটকদের চোখকে তৃপ্ত করে। বিশ্বের অধিকাংশ মুসলিম দেশের রাষ্ট্রপ্রধান এই মসজিদে নামাজ আদায় করেছেন। মসজিদের দুয়ার যেকোনো ধর্ম-বর্ণের নারী-পুরুষের জন্য খোলা। তবে মহিলাদের জন্য গেটের কাছে রাখা আছে কালো বোরকা, সেটা পরে তাদের ভেতরে যেতে হয়। পুত্রা মসজিদের পাশে খানিক সময় কাটিয়ে এলাম পুত্রা ব্রিজের নিচে। কৃত্রিম লেকের ওপর দিয়ে ঠাণ্ডা বাতাস আমাদের চোখে নেশা লাগিয়ে গেল। খলিলী ভাই আর বিল্লাহ ভাই তো ঘাসের ওপর শুয়ে খানিক ঘুমিয়ে নিলেন। এরপর পুত্রাজায়া কনভেনশন সেন্টারের সামনে এলাম। বাহির থেকে যতটুকু সম্ভব দেখে নিলাম। মাইনুল জানাল ইচ্ছে করলে ভেতরে ঢোকা যায়। পরিকল্পনা ছিল আজ সারাদিন ঘুরে ঘুরে রাতে একবার বাসে উঠব। কিন্তু আকাশে মেঘ করেছে, তা ছাড়া ক্লান্তিও লাগছে, রোদে ঘুরে শরীর ঘেমে জামাটা আঠা আঠা লাগছেÑ তাই হোটেলে ফিরে এলাম সবাই। মাইনুল বিদায় নিলো। আরেফিন ভাইরা রুমে নেই। হোটেল লবিতে বসে আরেফিন ভাইদের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। ঢাকায় ফোনে আমার ছেলে সৌরভের সাথে কথা বললাম। গতকাল ইন্দোনেশিয়ায় ভূমিকম্প হয়েছে, মালয়েশিয়ার একাংশেও হয়েছে। খবর শুনে রাতে আমার ছেলেটি ঠিকমতো ঘুমায়নি, জানাল আমার স্ত্রী। বৃষ্টি থামার পর আরেফিন ভাইয়ের কাজিনরা এলো। আমরা হোটেলের রুমে ঢুকে গোসল করে ফ্রেশ হয়ে খানিক বিশ্রাম নিলাম। রাত ১০টার পর পুডোরায়া বাস স্ট্যান্ডের জন্য ট্যাক্সিতে উঠলাম। মাত্র ১০ মিনিটেই পৌঁছে গেলাম পুডোরায়াতে। এত তাড়াতাড়ি পৌঁছে যাব ভাবিনি। হাতে বিস্তর সময়। গাড়ি ছাড়বে রাত সাড়ে ১১টায়। বাসস্ট্যান্ডে আমাদের দেশের মতো প্যাসেঞ্জার ডাকাডাকি করে ভাগানোর সিস্টেম দেখলাম। আমাদের দেশে এই কাজটি শুধু পুরুষ দালালরাই করে, এখানে ওয়াকিটকি হাতে মহিলাদেরও সেই কাজ করতে দেখলাম। আমাদেরকে বেশ ক’বার ‘টিকিট ওকে’ বলে ওদের এড়িয়ে চলতে হলো। বাস স্ট্যান্ডের অবকাঠামোর বর্ণনাটা দিতেই হয়। এত বড় বাসস্ট্যান্ডের কেবল নিচতলাতেই গাড়ি থাকে, উপরের দিকটা আমাদের দেশের মতো খোলা নয়। কয়েকতলা মার্কেট বা বিভিন্ন অফিস আছে সেখানে। এত রাতেও সেখানে মেয়েরা বিভিন্ন দোকানে সেলস্ম্যানের কাজ করছে, এটা আমাদের দেশে কল্পনা করাও কঠিন। সামাজিক নিরাপত্তার কারণেই ছেলেমেয়েরা সমানভাবে কাজ করতে পারে। একটা দোকান থেকে আমরা রুটি, কলা, চকলেট দুধ কিনে বাস স্ট্যান্ডের একটি বেঞ্চিতে বসে রাতের খাবারের পালা শেষ করলাম। সময় তবুও শেষ হয় না। রাস্তায় ঘোরাঘুরি করে একটি হোটেল থেকে চা খেয়ে সাড়ে ১১টার দিকে গাড়িতে উঠলাম। নির্দিষ্ট সময়ের খানিক পরে বাস ছাড়ল। সারারাত বাসে কাটালাম। ৬ মার্চ ভোর সাড়ে ৬টার দিকে কুয়ালাপার্লিসে এসে বাস থামল। অন্য যাত্রীদের দেখাদেখি আমরাও ফেরি ঘাটের দিকে হাঁটা দিলাম। জনপ্রতি ১৫ রিংগিত ভাড়া দিয়ে তিনটি টিকিট নিয়ে আমরা ফেরিতে চড়লাম। কুয়াশাচ্ছন্ন আন্দামান সাগরের মালাক্কা প্রণালী দিয়ে আমাদের ফেরি ছুটে চলল লংকাভির উদ্দেশে। ফেরিটি খুবই ছোট। বাইরের দৃশ্য দেখার উপায় নেই। ফেরির ছাদে ওঠা নিষেধ। কাঁচের জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকালাম। পরিবেশের দিক থেকে বাংলাদেশে কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে বড় কোনো নদীর সাথে মালাক্কা প্রণালীর তুলনা করা যায়। ভেতরে আমরা তিনজন বাংলাদেশী ছাড়া বাদবাকি বিভিন্ন দেশের। ঘণ্টাখানেক পর দূর থেকে গাঢ়ো ধূসর সবুজাভ একটি দ্বীপ দেখলাম। এটাই লংকাভি। ক্রমে দ্বীপটি দৃষ্টি সীমানার মধ্যে স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হচ্ছে। কাছাকাছি এসে আঁকাবাঁকা পানিপথের মধ্য দিয়ে অবশেষে কুয়াহ জেটিতে নোঙর করল ছোট্ট ফেরিটি। ডা. মাহাথিরের প্রিয় জন্মভূমি এই দ্বীপ। তার জীবনের প্রথম কর্মস্থলও ছিল শিক্ষ-দীক্ষাহীন এই জেলে দ্বীপে। ১৯৮৪ সালে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরপরই ১৯৮৫ সালে তিনি লংকাভিকে পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। বাদ সাধে মন্ত্রিপরিষদ। কিন্তু কোনো বাধাকেই তিনি মানেননি। দীর্ঘ ২২ বছরের ক্ষমতায় থাকাকালে একান্ত নিজের মতো করে সাজিয়েছেন লংকাভিকে। লংকাভি এখন মালয়েশিয়ার এক নম্বর পর্যটন স্পট। মালয়েশীয় সরকার দ্বীপটিকে ডিউটি ফ্রি দ্বীপ ঘোষণা করেছে। জেটিতে নেমে প্রথমেই ডলার এক্সচেঞ্জ করলাম আমরা। এরপর ট্যাক্সির খোঁজে বেরোলাম। সারাদিনের জন্য ট্যাক্সিওয়ালারা অনেক রিংগিত দাবি করল। শেষমেশ সারাদিনের জন্য ট্যাক্সি নেয়ার সিদ্ধান্ত বাদ দিলেন খলিলী ভাই। প্রথমেই লংকাভির আন্ডার ওয়াটার ওয়ার্ল্ড দেখতে গেলাম। এই ওয়াটার ওয়ার্ল্ড খোলা হয় সকাল ১০টায়। আমরা প্রায় আধঘণ্টা আগেই পৌঁছে গেছি। সামনের একটি হোটেলে ঢুকে নাশতার পরও বসে থাকতে হলো কিছুক্ষণ। অবশেষে ১০টার সময় এর টিকিট কাউন্টার খুলল। জনপ্রতি ৩৮ রিংগিতের টিকিট খুব বেশিই মনে হলো। আমরাই প্রথম দর্শক। সমুদ্র তলদেশের বাহারি প্রাণী, মাছ, প্রবালের বিপুল সমাবেশ আছে এখানে। ১৫ মিটার পানির টানেলের বাইরে সমুদ্র প্রাণীরা ঘুরে বেড়ায় মাথার ওপর দিয়ে। বরফ দেশের পেঙ্গুইনদের ছোটাছুটি মনে রাখার মতো। হরেকরকম পাখির সমাবেশ ছাড়াও অদ্ভুত কিছু দু®প্রাপ্য প্রাণী আছে এখানে। আন্ডার ওয়াটার ওয়ার্ল্ড থেকে বেরিয়ে পাশের একটা বিশাল শপিং মলে এসে ঢুকলাম। এখানকার দোকানের পণ্যগুলো ডিউটি ফ্রি, তাই কিছুটা কম দামে পাওয়া যাবে এটা চিন্তা করে বেশ কিছু চকলেট কিনলাম শেষ পর্যন্ত। কেনাকাটা করার চেয়ে দেখে দেখে সময় বেশি কাটল। কেবলকারে চড়ার জন্য টিকিট কেটে লাইন ধরে প্রবেশ করতে হয় অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে। আমরাও তাই করলাম। একটি ক্যাবলকারে শুধু আমরা তিনজন। স্টেশন থেকে পাহাড়ের প্রথম চূড়াটির দূরত্ব প্রায় দেড় কিলোমিটার, মাঝখানে মাত্র একটি টাওয়ার আছে। বাতাসে কেবলগুলো একবার উপরে উঠছে আবার নিচে নামছে। কারে বসে নিচের বিশাল রেইন ফরেস্টকে মনে হচ্ছে ছোট ছোট আগাছার জঙ্গল। মাত্র একটি ক্যাবলের ওপর ভরসা করে অত ওপর থেকে নিচের দিকে তাকালে একজন বীরও শিহরিত হবেন। খলিলী ভাই আর বিল্লাহ ভাই দু’জনই চুপচাপ বসে ডানে-বাঁয়ে তাকাচ্ছেন। আমার শখ ছবি তোলা। চুপচাপ বসে থাকলে সাবজেক্ট মিস হয়ে যাবে। তাই ভিডিও আর স্টিল দুই ক্যামেরাই সচল রাখলাম। ইতোমধ্যে প্রথম পাহাড়ের চূড়ার স্টেশনে পৌঁছে গেছে ক্যাবলকারটি। আমরা নেমে পড়লাম। স্টেশনেই দেখতে পেলাম একটি ব্যতিক্রমী ব্যাপার। তরল মোমের পাত্রে হাত ডুবিয়ে হাতের ভাস্কর্য বানিয়ে দিচ্ছে দুই যুবক। ব্যাপারটি পর্যটকদের বিশেষ করে হানিমুনে আসা নতুন দম্পতিদের কাছে খুবই আকর্ষণীয়। দম্পতিদের দু’জনের হাত এক করে এখানে মোমের ডাইস বানিয়ে সেই ডাইসে নতুন মোম ঢেলে যুগল হাতের ভাস্কর্য করে দেয়া হয় খুব অল্প সময়ের মধ্যেই। আমরা স্টেশনের ইস্পাতের সিঁড়ি দিয়ে এগোতে লাগলাম। খানিক পরেই পাহাড়ের গা ধরে একেবারে মেঠোপথের মতো নেমে গেছে রাস্তা। সেই পথ ধরে কিছু দূর গেলে ইস্পাতের একটি সেতু। না সেতুর নিচে কোনো পানি নেই। কমপক্ষে ৬০০ মিটার ওপরে এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে যেতে তৈরি এই সেতুকে এক কথায় অসাধারণ বলতে হবে। মাঝ বরাবর মাত্র একটি টাওয়ার সদৃশ খুঁটি বসিয়ে তার ওপরেই ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে সেতুটিকে। খুঁটি বরাবর প্রায় ৪৫ ডিগ্রি বাঁক নিয়েছে এটি। ওপারে আরেক পাহাড়ের ওপর গিয়ে থেমেছে সেতুটি। সেখান থেকে আবার পাথরের এলোপাতাড়ি সিঁড়ি নেমে গেছে একেবারে পাহাড়ের পাদদেশে। এই সিঁড়ি পথে ঘন রেইন ফরেস্টের মাঝ দিয়ে একেবারে নির্জনতায় হারিয়ে যাওয়া যায় খুব সহজেই। শারীরিক অক্ষমতা না থাকলে কোনো ধরনের রিস্ক নেই এই হারিয়ে যাওয়ায়। আমরা বেশ কিছুদূর গিয়ে ওপরে উঠে এলাম। ফিরে এলাম স্টেশনে। আবার কেবলকারের পরবর্তী স্টপেজে যেতে হবে। ৭১০ মিটার ওপরে গুনাং ম্যাট, চিনচ্যাং পাহাড়ের এই চূড়াটাই আমাদের শেষ গন্তব্য। সর্বশেষ এই চূড়ায় বসে সময় কাটানোর চমৎকার ব্যবস্থা আছে। কেউ যদি পাহাড়ি এই পথে হেঁটে হেঁটে হাঁফিয়ে ওঠেন তবে এখানে এসে ম্যাসেজ করিয়ে নিতে পারেন। গুনাং ম্যাট চিনচ্যাংয়ের চূড়ায় বসে দেখা যাবে আন্দামান সাগর আর ভারত মহাসাগরকে। এখানকার নির্ভেজাল বাতাসে বসে আমরা খানিক বিশ্রাম নিয়ে ফের পা বাড়ালাম। যথারীতি কেবলকারে চড়ে ফিরে এলাম ওরিয়েন্টাল ভিলেজে। ভিলেজের ছোট্ট লেকের পাড়ে বসে আমরা দুপুরের খাবারের কথা ভাবলাম। খাবার কিনতে আমি পাশের একটি ফুড কোটে গেলাম। এসে দেখি খলিলী ভাই আর বিল্লাহ ভাই একজন বাংলাদেশী লোকের সাথে কথা বলছেন। নাম মোহাম্মদ আলী আকবর, বাড়ি বাংলাদেশের লক্ষ্মীপুরে। বাংলাদেশে নোয়াখাইল্যাদের নিয়ে একটা প্রবাদ আছে যে, চাঁদে গেলেও নাকি এদের পাওয়া যাবে। আলী আকবরকে দেখে আমার সে কথাটিই মনে পড়ল। স্বল্পশিক্ষিত আলী আকবর ১৮ বছর আগে ভাগ্যের সন্ধানে প্রথমে পাড়ি জমান সিঙ্গাপুরে, সেখান থেকে কুয়ালালামপুর, শেষে লংকাভিতে। বিয়ে করেছেন এখানেই। চার সন্তানের জনক আলী আকবর পেশায় গাড়ি চালক। আমাদের পেয়ে ভীষণ উচ্ছ্বাসে আবেগাপ্লুত হলেন। বিকেল হয়ে এল। আগেভাগে ফেরা উচিত। কুয়ালালামপুরের ভালো গাড়ির টিকিট নিতে হবে, আবার ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে রাতে এখানেই থাকতে হবে। আমরা তো কোনো হোটেল বুকিং দেইনি। এখানে আরো আকর্ষণীয় অনেক কিছুর মধ্যে ছিলÑ ঈগল স্কয়ার, কেদাহ মার্বেল ফ্যাক্টরি, লেক অব দি প্রেগন্যান্ট মাইদিন, সিঙ্গা দ্বীপ, কুমীর ফার্ম, মেরিন পার্ক, মাহাথির মিউজিয়াম ইত্যাদি। আমাদের হাতে সময় কম। এতকিছু দেখতে কয়েক দিন হাতে সময় নিয়েই আসতে হবে। ফিরে এলাম কুয়াহ জেটিতে, কুয়ালাপার্লিসের ফিরতি টিকিট নিয়ে ফেরিতে চড়লাম। সন্ধ্যার অনেক আগেই ফিরে এলাম কুয়ালাপার্লিসে। ভোর রাতের আলো-আঁধারির সময় আসার কারণে রাস্তাগুলোকে চিনতে এখন খানিকটা সমস্যা হলেও বাস স্ট্যান্ড চিনে চলে এলাম বাস স্ট্যান্ডে। রাতের গাড়ির টিকিট নিলাম। এখন হাতে বিস্তর সময়। হেঁটে হেঁটে ঘুরে দেখতে লাগলাম ছোট্ট কুয়ালাপার্লিস। রাস্তার পাশে বেশ খোলামেলা জায়গা নিয়ে গানের আসর বসেছে আজিকা মোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে। আমরা এখানে এসে হাজির হলাম। স্থানীয় শিল্পীদের গান শুনলাম। সাথে কোল্ড টি। আবারো হাঁটতে শুরু করলাম। পার্লিস বিচে তখন সূর্য ডুবু ডুবু। বিচে বেড়ানোর জন্য চমৎকার ব্রিজ তৈরি করে রাখা হয়েছে। সন্ধ্যা ৮টা পর্যন্ত আমরা এখানেই কাটালাম। এবার ধীরে ধীরে পা বাড়ালাম বাস স্ট্যান্ডের দিকে। কনসোর্টিয়াম বাস এক্সপ্রেসের এটি ডাবল ডেকার বাস। বিলাসবহুল। সিট এলিয়ে দিয়ে ঘুমানো যায় সহজে। ঠিক সাড়ে ৯টায়ই বাস ছাড়ল। বাসের দোতলার ঠিক পেছন সারিতে পড়েছে আমাদের আসন। বেশ হতাশ হলাম, সবার পেছনে আসন পেয়ে। কি আর করা, আসনে বসে হাত-পা ছড়িয়ে রিলাক্স মুডে ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। খানিক ঘুমিয়েছি কি ঘুমাইনি, শরীরের টি শার্টের কলার টেনে, কান মাথার টুপি দিয়ে মুখ ঢাকার চেষ্টা করলাম বারবার। প্রচণ্ড শীত। মনে হলো শূন্য ডিগ্রির কাছাকাছির তাপমাত্রা। হাইপাওয়ারে বাসের এসি ছেড়েছে চালক। সহ্য করতে না পেরে শেষমেশ নিচে গিয়ে চালককে এসি কমাতে বললাম। কমানোর পর সিটে এসে আবার ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। কিছুক্ষণ পর মনে হলো এসি আবার হাই করা হয়েছে। এক কাপড়ে এসেছি, বাড়তি কোনো কাপড়-চোপড় নেই, যা দিয়ে এই ঠাণ্ডার মোকাবেলা করব। এবার বিল্লাহ ভাই উঠে গেলেন ড্রাইভারের কাছে। এবার এসি বন্ধ করা হলো। কতক্ষণ! আরেক ঘুম দিতেই প্রচণ্ড শীতে জমে যেতে যেতে বুঝলাম এসি ফের চালু হয়েছে। এবার যতরকম সহ্যশক্তি আছে ব্যবহার করে কুয়ালালামপুরের অপেক্ষায় থাকলাম। ভোর ৫টায় পুডোরায় বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছেই নেমে পড়লাম। বাস থেকে নেমেই ট্যাক্সি খুঁজতে লাগলাম। ঢাকার ট্যাক্সি চালকদের মতো রাতের যাত্রীদের কাছে এখানকার ট্যাক্সি চালকরাও ইচ্ছেমতো ভাড়া হাঁকে। হোটেল দুতাভিসতা থেকে গতকাল ট্যাক্সির মিটারে ভাড়া হয়েছে পাঁচ রিংগিত, এখন ট্যাক্সিঅলারা ৩০ রিংগিত ভাড়া দাবি করছে। বাংলায় খিস্তি ঝাড়লে কেউ কিছু বুঝবে না, তাই খানিক বরিশাইল্যা, খানিক নোয়াখাইল্যা খিস্তি ঝাড়লাম। শেষে দরদাম করে ১২ রিংগিতে একটি ট্যাক্সি পেলাম। রুমে ঢুকেই কোনোরকম ফ্রেশ হয়ে শুয়ে পড়লাম। এক ঘুমে ৯টা বেজে গেল। মাসুম ভাই স্বপন ভাইকে ফোন করলেন। উনি তার ব্যবসার কাজে সিঙ্গাপুর বর্ডারে আছেন। মাইনুলকে পাঠিয়ে দিলেন। সোয়া ১০টার দিকে ব্যাগ-বোচকা নিয়ে মাইনুলের কারে উঠলাম। আমার ডিভি ভিসিআর কিনতে হবে, এটা ঢাকা থেকেই পরিকল্পনা করা। মাইনুল আমাদেরকে নিয়ে কয়েকটা বড় বড় ইলেকট্রনিকসের মার্কেট ঘুরল, পেলাম না। শেষে টুইন টাওয়ারে সনি স্টাইলের শোরুমে এলাম। সবশেষ হতাশার কথা এরাই শোনাল। এই ডিভি ভিসিআর মালয়েশিয়াতে পাওয়া যাবে না, পাওয়া যাবে সিঙ্গাপুরে। এরপর আশপাশের কয়েকটি মার্কেট ঘুরে বিভিন্ন কসমেটিক্স, সাবান ইত্যাদি কিনলাম। আমি এই পণ্যগুলোর ভালোমন্দ বুঝি না। তাই ব্র্যান্ড দেখে কিনলাম। একটি স্বর্ণের দোকান থেকে স্ত্রীর জন্য একটি চেইন কিনলাম। মালয়েশিয়ান ট্র্যাডিশনাল ইনস্ট্রুমেন্টাল মিউজিকের কয়েকটা সিডিও কিনলাম। এবার ফেরার পালা। মাইনুলের কার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় কুয়ালালামপুর এয়ারপোর্টে পৌঁছে গেল। ওকে বিদায় দিয়ে ট্রলিতে ব্যাগ-বোচকা নিয়ে আমরা ডিপারচার গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। বোর্ডিংপাস নিয়ে নিলাম। বিমানে খাবার যে পানি দেয় তা আমার জন্য পর্যাপ্ত হয় না। তাই পানি কেনার জন্য দোকান খুঁজতে লাগলাম। একটি ফাস্ট ফুড শপ থেকে পাঁচ রিংগিতে ৯০০ মিলি পানির একটি বোতল কিনে রীতিমতো আলোচিত হলাম। পাঁচ রিংগিত মানে ৯২ টাকা। পকেটের অবশিষ্ট রিংগতিগুলো মানি এক্সচেঞ্জ থেকে ডলারে বদল করে নিলাম। এবার ডিপারচার লবিতে ঢুকলাম, ঘণ্টাখানেক বসে থাকতে হলো। এই লবির অপেক্ষমাণ যাত্রীর সবাই বাংলাদেশী। একজন বাংলাদেশী শ্রমিককে পেলাম যাকে আজই ফোর্স-ডিপোর্ট করা হয়েছে। বিমানে ওঠার সঙ্কেত এলে একে একে সবাই বিমানে উঠতে শুরু করলাম। রাত ৯টা ৪০মিনিটে বিমান রানওয়েতে চলতে শুরু করল। বিমানের জানালা থেকে রাতের আলো ঝলমলে কুয়ালালামপুর সিটিকে রূপকথার পরীর দেশ মনে হচ্ছিল, আমরা বিমানরূপী পরীর ডানায় ভর করে ফিরে যাচ্ছি ঢাকা। মন্তব্যগুলো (6)
![]() লিখেছেন joynal, July 30, 2008
dhhur bhai ki bhuya jinish likkha rakhsen???dhhur amr shomoy tai noshto korlen miya...ekhon bashay giye ghuman.
লিখেছেন Nafee Muhammad Anam, May 08, 2008
Good Writing!
লিখেছেন SHAHIN, March 18, 2008
Very nice this story. thanks for writer.
লিখেছেন Jabid Kamal, March 16, 2008
Very authentic description, but did you go for island hopping? That's real fun. There is a good club as well around pantai cenang (i.e. under water world) name is GROUND ZERO. Did you know that one can hire a car real cheap (as low as RM 50)? Difiqa is great for out door dining in the evening (it is also close to underwater world)
The bus journey from KL to K. Perlis is very tiring and they have that strange habit of running the AC with full power! I tred it twice and it sucks. You may want to try airasia next time (RM60-70, if purchased a month before) মন্তব্য লিখুন
|
|
| সর্বশেষ আপডেট ( Sunday, 24 February 2008 ) |
| পরে > |
|---|