গত কয়দিন বেশ ঠান্ডা ছিল। প্রকৃতিতে শীতের আগমনি প্রস্ততি চলছে। রাতে ৩-৪ ডিগ্রির কাছাকাছি নেমে আসে। সকালে ঘাসের গায়ে শিশির শুকাতে ঢের সময় লাগে। শীত আসি আসি করছে কিন্তু পুরোপুরি আসছেনা। একটানা কয়দিন ঠান্ডার পর গতকাল থেকে আবার একটু গরম পড়েছে। শনিবারের সকালটা তাই খরচ করে এলাম বাড়ির পাশের ন্যাচার পার্কে।
মাত্র ১০ মিনিটের ড্রাইভ। অজিবওয়ে ন্যাচার পার্ক। কোন সংরক্ষিত পার্ক নয়, পুরোদস্তর বন, যাকে বলে ফরেস্ট। ঢুকতেই হাতের ডানপাশে নালার মত জলাশয় যা রাস্তা আর পার্কটাকে আলাদা করেছে। বোঝাই যায় শীতে এর পানি বরফে পরিণত হয়। বরফ মনে হয় ততটা শক্ত হয়ে জমেনা। বড় করে নোটিশ টানানো-- "স্কেটিং করার জন্য নিরাপদ নয়"। শীতে কেমন হয় তা দেখে যেতে হবে।
বউকে ইউনিভার্সিটিতে নামিয়ে দিয়ে আব্বা-আম্মা আর মেয়েকে নিয়ে এসেছি। সামনে বউয়ের মিডটার্ম, তার উপর একগাদা খাতা দেখা বাকি। আমাকে গছিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছিল, রাজি হইনি।
বনের ভেতরে ঢুকতেই পার্ক'স কানাডার ছোট্ট অফিস। দুজন সেখানে কাজ করছে। এদের একটা বিষয় আমার কাছে অবাক লাগে: প্রত্যেকটা ন্যাচারাল সাইটেই ছোট্ট একটা অফিস থাকবে, সাথে লাগোয়া মিউজিয়াম। সেখানে আছে সেই পার্কে যেসব গাছপালা, পাখি, জীব-জানোয়ার পাওয়া যায় তাদের ছবিসহ তালিকা; দুই একটা স্টাফ করা প্রাণি, কাঁচের ঘরে ড়্যাটল স্নেক অথবা কচ্ছপ। এখানেও তার ব্যতিক্রম নয়। বাড়তি হিসেবে আছে একটা বড়সর খরগোশ আর একটা এ্যাকুয়ারিয়াম। এ্যাকুয়ারিয়ামে 'কই' নামের মাছ। নামে 'কই' হলেও এটা বাজারের কৈ না, কাঁটাবন মার্কেটের শৌখিন মাছ-- 'কই'।
মেয়েকে ওখানে রেখে আমি বেরিয়ে পড়ি ক্যামেরা হাতে। শনিবার আজ। বাচ্চাদের নিয়ে সবাই এসেছে। সাথে এসেছে ওদের কুকুরগুলো। সাপ্তাহিক এই আগন্তকদের হৈ চৈ আর কোলাহলে পাখিরা যে আশেপাশে নেই তা বুঝলাম। তাই নালার ধারে যাই কচ্ছপের সন্ধানে। সেদিন বেশ কয়েকটা নকশী কাছিমের ছবি তুলেছিলাম। নকশী কাছিম হলো পেইন্টেড টার্টল (Painted turtle)। জানিনা বাংলা নামটা আগে কেউ দিয়েছে কীনা। ওটা নিয়ে পরে আরেকটা লেখা দিব।
পাওয়ার মধ্যে পাওয়া হলো চিপমাঙ্ক। গাছের গুঁড়ির ভেতরে যে ওটার আবাস তা আগে না দেখলে বুঝতেই পারতামনা। আমাকে দেখেই মুহূর্তের মধ্যে হারিয়ে গেল। অনেক্ষণ বসে থাকার পরে আবার দেখা মিলল। সেই সাথে কায়দা করে তুলে নিলাম ওটার ছবি।
এই জিনিস আমি ঢাকার বোটানিক গার্ডনেও দেখেছি। দৌড়ানোর সময় লেজ তুলে পালায়। অসম্ভভ ক্ষিপ্র ওদের চলাচল। এই দেখা দেয় তো এই হাওয়া। পিঠে তিনটা স্ট্রাইপ থাকে বলে এরা থ্রি-স্ট্রাইপড চিপমাঙ্ক।
উপরে পরিস্কার নীল আকাশ। গাছের পাতার ফাঁকে আকাশ যেন চেয়ে থাকে। ম্যাপল গাছের সবুজ পাতারা কদিন পরেই হলুদ কিংবা লাল হয়ে ঝরে পড়বে। তাই সব খানেই একটা পরিবর্তনের ছোঁয়া। এর মাঝেও থেমে নেই জীবনের গতি। তেমনি নাম না জানা এক গাছের নতুন পত্রমঞ্জরী ধরা দেয় আমার ক্যামেরায়। কী গাছ জানিনা। হয়তো ম্যাপলেরই কোন এক প্রজাতি। সে যাই হোক, তাতে আমার কী আসে যায়?

নাম না জানা এক পত্রমঞ্জরী-- লাল নীল সবুজের খেলা
একসময় টল গ্রাস ফরেস্টে এসে পড়ি। লম্বা লম্বা ঘাসের বন। এত ঘন যে হাঁটা-পথ (ট্রেইল) না থাকলে এগুনো অসম্ভব হতো। দুই ধারে মাথা পর্যন্ত উঁচু ঘাস আর মাঝে মাঝে নানা ধরনের এ্যাস্টার ফুলের দল। কোনটা বড়-পাতা এ্যাস্টার, কোনটা লম্বা-সাদা এ্যাস্টার। অধিকাংশেরই নাম জানিনা। ভাগ্যিস এসব দেশে সুন্দর সুন্দর ফিল্ডগাইড থাকে। না হলে কার কাছে শিখতাম হরেক রকমের জংলি ফুলের নাম!
বনের এ প্রান্তে অনেক ফুল। আর ফুল থাকলেই থাকবে ভ্রমর। উড়ে চলছ এক ফুল থেকে আরেক ফুলে-- ক্লান্তিহীন। আমি তুলে যাই ছবির পর ছবি।
দুপুরের একটু পরে ভাবলাম অনেক হয়েছে। আজ থাক। অতপর বাসায় ফেরা। কাল আবার মেয়েকে নিয়ে বেরোতে হবে অন্য কোন পার্কের উদ্দেশ্যে।
যত মন্তব্য
আপনার অপূর্ব সুন্দর বনবিহারের বর্ণনা পড়তে পড়তে বনের মাঝখানে চলে যেতে ইচ্ছে করছিল। আপনার কাছ থেকে আরো অনেক মোহনীয় লেখা পড়ার অধৈর্য্য অপেক্ষায় থাকলাম। অনেক ভালো থাকুন।
আনোয়ার পারভেজ শিশির
আনোয়ার পারভেজ শিশির
আপনাকেও ধন্যবাদ। কিন্তু আপনার লেখা কই? অনেকদিন আগে দুটো লেখা দিলেন, তারপর উধাও হয়ে গেলেন যে? আপনার কাছ থেকে আরো লেখার প্রত্যাশা করছি।
মন্তব্য করুন