Share |

কপুয়েরার দেশ ব্রাছিল!!

বিশ্বপরিক্রমায় ব্রাছিল যাবার সুযোগ হয়েছিল বছর দুয়েক আগে। আর তাই যাবার আগেই ব্রাছিল সম্পর্কে যে ধারনাটা ছিল তা মূলত সাম্বা কেন্দ্রিক আর ফুটবল। মৌসুমি ফুটবল লাভার হবার কারণে সাম্বাই মূল আর্কষণ ছিল ব্রাছিলের ব্যাপারে। বস্তুত দক্ষিণ আমেরিকার সর্ব বৃহৎ এই দেশটি বর্তমানে পৃথিবীর অষ্টম শক্তিশালী অর্থনৈতিক অবকাঠামো। আর মহাবন আমাজন কেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যের কারণে ১০ বছর আগের ব্রাছিল আর আজকের ব্রাছিলের মাঝে আকাশ পাতাল তফাৎ। এখন ১০০ মার্কিন ডলারে পাওয়া যায় মাত্র ১৫৫ থেকে ১৬০ রেয়াই।

গন্তব্য ছিল সাও পাওলো। দেশের অন্যতম বৃহত্তম শহর। মূলত রিও’র পরে এটাকেই আধুনিক শহর ধরা হয়। ব্রাছিল সম্পর্কে সবার মত আমারও কিঞ্চিত ধারণা ছিল বন-জঙ্গলে ভরা একটা দেশ হিসেবে। কিন্তু গোয়রুলুস এয়ারপোর্টের বাইরেও প্রায় ৫কিমি পার্কিং লটে দারুণ সব ইউরোপিয়ান বাড়ির বাহার দেখে প্রথম দর্শনেই ব্রাছিল সর্ম্পকে আমার ধারণাটা পাল্টে গেল। দক্ষিণ আমেরিকাতে কিভাবে ইউরোপের প্রভাব এল সেটাও এক বিরাট ইতিহাস। তবে পরিকল্পিতভাবে যে শহরগুলো বেড়েও উঠেছে সেই বেশ ভাল লাগার। প্রাইভেট গাড়ির জন্যই যে রাস্তাঘাট তৈরি হয়েছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। শহর থেকে বেশ খানিকটা দূরে হবার কারণেই মূল শহরের প্রবেশের আগে আর্কিটেকচারাল বিল্ডিংগুলোয় মুগ্ধ হতে হলো। প্রাচীন দর্শন হলেও বাহারি আলোর ঝর্ণা-ধারায় অদ্ভুত সুন্দর লাগছিল স্থাপনাগুলোকে।

বন্ধু লুয়ের সাথে শহর দেখতে গিয়ে বুঝতে পারলাম এটা গাড়ির উইণ্ডো দিয়ে না দেখে বরং হেঁটে দেখাটাই বেশি আনন্দের। আর তাই ভি-ডা- পলিনা হয়ে পার্কা-ডা-সে (পার্ক) এর দিকে হেঁটে যাবার সময় সংলগ্ন ক্যাথিদ্রালের পাশে ছোট জটলায় দৃষ্টি আটকে গিয়েছিল। কাছে গিয়ে খানিকটা হোঁচটই খেয়েছিলাম। এমন মারামারি আগে কখনও দেখা হয়নি। তাও আবার এমন একটা ব্যাপার যে সবাই তাক হয়ে দাড়িয়ে আছে দেখার জন্য। হ্যাঁ এটাই কপুয়েরার। ব্রাছিলের অনন্য সাধারণ সংস্কৃতির স্বারক এই দ্রুতগতির নৃত্য। যদিও ব্রাছিল বলেই আমরা বুঝি সাম্বা কিন্তু কপুয়োরা ব্রাছিলের প্রত্তন্ত অঞ্চলে যে পরিচিত ঠিক তেমনি সারা দুনিয়াতেই এর ব্যপক প্রসার কিয়দাংশে সাম্বাকেই ছাড়িয়ে গেছে - এটা অনেকের কাছেই বিশ্বাসযোগ্য নয়।

মূলত মার্শাল আর্ট, গান এবং নাচের এক দারুণ মিশ্রণ এই কপুয়েরা। এটা ব্রাছিল এর নিজের সংস্কৃতি হলেও এর জন্য দায়ী আবার আফ্রিকানরা। মূলত বর্তমানে এঙ্গোলা থেকে আগত দাসদের মাঝে খুবই জনপ্রিয় ছিল এই নাচ। আর এ ঘটনা সেই ষোল শতকের গোড়ার দিকের। অনেকের মতে সারা দিনের হাড় ভাঙ্গা ক্লান্তিকে তিরোহিত করার জন্যই এমন তৃমাত্রিক ধারার নৃত্যর প্রচলন শুরু হয়েছিল দাস শ্রেণীর মানুষদের মধ্যে। এ নাচের জন্য বিশেষ কিছুরই প্রয়োজন পরে না। কিছু লোক দাঁড়িয়ে মোটামুটি আকারের একটি বৃত্ত গঠন করে যাকে বলে রোদা বা হোদা কপুয়েরা এবং তারাই গান গায় বিশেষ ভাবে হাততালির তালের মাধ্যমে। এরপর দু জন করে এগিয়ে আসে এই বৃত্তের মাঝে। একজন বিচারকও থাকে তাদের মাঝে। যার ইশারা পাবার পরই শুরু হয় নাচ। শুরুতে এটাকে নাচ বলার কোন কারণই মনে হবে না। দুরন্ত গতির মারপিটের মত হাত পা ছুঁড়ে যে নাচ হতে পারে তার কোন ধারনাই ছিল না। একজন আরেক জনের দিকে হিংস্র ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। আক্রান্ত ব্যক্তি প্রথমে নিজেকে কৌশলে এড়িয়ে আবার নিজেও তাড়িয়ে যাচ্ছে অন্যের দিকে। তবে খানিক পরেই এর মুদ্রাগুলো চোখে পড়ে এবং বোঝা যায় সুর আর তালে এক অনিন্দ সঙ্গম হলো কপুয়েরা। যদিও ফুলকন্টাক্ট মার্শাল আর্ট এই নাচ এবং অনেকবারই প্রতিপক্ষের অসাবধনতায় জীবন দিতে হয়েছে তার সঙ্গীকে। তদুপরি, জনপ্রিয় এই নাচের সীমা বেড়েই গেছে দিন দিন। আর সে কারণেই কোন এক সময় খোদ ব্রাছিলেই এটা নিষিদ্ধ ছিল।

তবে সময়ের সাথে এর জনপ্রিয়তার জন্যই সীমারেখায় থেমে যায়নি এই নৃত্যধারা। উত্তরের আমেরিকা থেকে দক্ষিণের নিউজিল্যান্ড অবধি পরিস্ফুটিত হয়েছে এই পথনৃত্য।


যত মন্তব্য

মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <div>
  • Lines and paragraphs break automatically.

ফরম্যাটিং অপশনস

By submitting this form, you accept the Mollom privacy policy.