| পাখি সংরক্ষণ থেকে গ্রাম উন্নয়ন |
|
|
| লিখেছেন ফরহাদ মাহমুদ ও আসাদুল্লাহ সরকার | |
| Saturday, 07 April 2007 | |
|
দিগন্তবিস্তৃত
সবুজ মাঠ। তার ওপর দিয়ে এগিয়ে
চলেছে আঁকাবাঁকা মেঠোপথ-যেন
শুয়ে আছে বিশাল এক অজগর সাপ।
আমাদের জিপগাড়িটা মাটির
রাস্তায় লাফাতে লাফাতে এগিয়ে
চলল। রাস্তার দুপাশে নতুন
লাগানো অনেক গাছ। এখনো খুব
একটা ডালপালা ছড়ায়নি। তবু
আমাদের দৃষ্টি আটকে গেল গাছের
চারাগুলোতে।
দিগন্তবিস্তৃত
সবুজ মাঠ। তার ওপর দিয়ে এগিয়ে
চলেছে আঁকাবাঁকা মেঠোপথ-যেন
শুয়ে আছে বিশাল এক অজগর সাপ।
আমাদের জিপগাড়িটা মাটির
রাস্তায় লাফাতে লাফাতে এগিয়ে
চলল। রাস্তার দুপাশে নতুন
লাগানো অনেক গাছ। এখনো খুব
একটা ডালপালা ছড়ায়নি। তবু
আমাদের দৃষ্টি আটকে গেল গাছের
চারাগুলোতে। অ্যাকাসিয়া,
ইউক্যালিপটাস-এমনকি
মেহগনিও নয়, যেমনটা
আজকাল সারা দেশেই চোখে পড়ে।
তার বদলে আছে একেবারেই দেশি
গাছ- হরীতকী,
বহেরা,
আমলকী,
কদম,
কুল,
নিম,
আমড়া,
চালতা,
জলপাই প্রভৃতি।
মানুষের জন্য তো বটেই,
পশুপাখির জন্যও
গাছগুলো খুবই প্রয়োজনীয়।
বেশ কিছু দূর যাওয়ার পর সামনে পড়ল একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। গাড়ি থামিয়ে মাঝবয়সী একজনের কাছে জানতে চাইলাম, ভাটিনা গ্রাম কোন দিকে? তিনি মাঠের এক কোণে আঙ্গুল তুলে দেখালেন। পরক্ষণেই বললেন, ওখানে তো গাড়ি যাবে না।
বিকেল গড়াতে শুরু করেছে। দেরি হলে আসার উদ্দেশ্যটাই মাটি হয়ে যাবে। সন্ধ্যার আঁধার নামতে শুরু করবে। পাখিরা ফিরে যাবে কুলায়। পাখি দেখার সাধ অপূর্ণই থেকে যাবে। আমরা দ্রুত দীঘল মাঠে নেমে পড়লাম। লোকটির অঙ্গুলিসংকেত অনুযায়ী মাঠের ওপর দিয়ে হাঁটতে শুরু করি। আরও মাইলখানেক যেতে হবে।
হাঁটছি জমির আল ধরে। গ্রামে পৌঁছার কিছু আগে মাঠের ওপর দুটি পুকুর দেখতে পেলাম। মনটা যেন একটু একটু করে খারাপ হতে লাগল। এত কষ্ট করে পাখি দেখতে এলাম, কোথায় পাখি! পুকুর দুটিতে দুটি কানি বক আর একটি মাছরাঙ্গা ছাড়া তেমন কিছুই চোখে পড়ল না। আরও কিছু দূর এগোতেই চোখ দুটি চক চক করে উঠল। সদ্য ধান উঠে যাওয়া একখণ্ড জমিতে গোটা দশেক হট্টিটি ঘুরে বেড়াচ্ছে। এর আগে দুটো বা চারটে হট্টিটিকে একসঙ্গে দেখলেও এতগুলো হট্টিটিকে একসঙ্গে কখনো দেখিনি। বুঝলাম, আসা সার্থক হবে। পায়ের গতি বাড়িয়ে দিলাম। শীতের সন্ধ্যা খুব দ্রুত এগোচ্ছে, ঘণ্টাখানেকও বাকি নেই। দ্রুত না গেলে পাখিদের দেখা যাবে না।
গ্রামে ঢুকে প্রথমেই গেলাম হাশেম মেম্বারের বাড়ি। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। এলাকায় পাখি ও প্রকৃতি সংরক্ষণের তিনিই প্রধান উদ্যোক্তা। তাঁকে বাড়িতে পেলাম না। তিনি সেই স্কুলটিতে বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে রয়েছেন। তার সঙ্গে কথা হয়েছে পরে একদিন। আগেও তাঁর কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অনেক কিছু শুনেছি। এদিকে আমাদের চারপাশে গ্রামের নানা বয়সের অনেকেই এসে জড়ো হয়েছেন। ঘুরে দেখার পাশাপাশি তাঁদের সঙ্গে চলছে আলাপ-আলোচনা। শুনলাম এলাকায় পাখি সংরক্ষণের শুরু, অগ্রগতি, লাভ-লোকসানসহ নানা কথা। পাখি ও প্রকৃতি সংরক্ষণের লক্ষ্যে যে উদ্যোগের শুরু তা কেমন করে এখন গ্রাম ও গ্রামের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছে, সেসব কথাও জানলাম তাঁদের কাছ থেকে। টমেটো চাষ এলাকায় বেশ প্রাধান্য পেয়েছে। চলছে হাঁস, মুরগি ও মাছের চাষ। গ্রাম উন্নয়নের অন্যান্য উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে সমবায়ের ভিত্তিতে।
গ্রামে ছোট-বড় মিলিয়ে ৩০টির মতো পুকুর রয়েছে। আঁধার নামার আগেই কয়েকটি পুকুর ঘুরে দেখলাম। পুকুরপাড়ের বাঁশঝাড়, গাছপালায় পাখি আর পাখি। পানকৌড়িই দেখলাম কয়েক শ। রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির বক, ডাহুক, সাদা বুক মাছরাঙ্গা, ছোট নীল মাছরাঙ্গা। গ্রামে ঘুরতে ঘুরতে দেখা গেল কয়েক প্রজাতির ঘুঘু, নীলকণ্ঠ, পেঁচা, সুইচোরা, কাঠঠোকরা, হলদে বউ, কুটুম পাখি, বুলবুলি, টুনটুনিসহ লোকালয়ের অনেক পাখিই। কয়েক প্রজাতির শালিক, ফিঙে ও টিয়া রয়েছে প্রচুর পরিমাণে। অবাক করা দৃশ্য একটি বাঁশঝাড়ে-সেটি পুরোপুরি দখল করে নিয়েছে ভাত-শালিকেরা। অনুমানে মনে হলো, মাঝারি আকৃতির এ বাঁশঝাড়টিতে আশ্রয় নিয়েছে কয়েক হাজার শালিক। শালিকের ভারে বাঁশগুলো যেন নুয়ে পড়ছে।
পাখি থেকে ‘আলোর ভুবন’: বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা আবুল হাশেম জানালেন ১০-১২ বছর আগের কথা। একদিন সকাল বেলায় গ্রামের মোকামপুকুরের পাশের রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন তিনি। হঠাত চোখে পড়ল শালিক, চড়ুই, ঘুটকরসহ বিভিন্ন রকম পাখি টমেটো ক্ষেতে মাটি খুঁড়ছে। প্রথমে মনে হলো, পাখিগুলো বোধহয় টমেটো গাছের গোড়ার মাটি সরিয়ে গাছগুলোর ক্ষতি করছে। বেশ কিছুক্ষণ ধরে মনোযোগ দিয়ে দেখলেন তিনি। না, তা তো নয়, বরং পাখিগুলো খুঁটে খুঁটে পোকা খেয়ে গাছের উপকারই করছে। আবুল হাশেম বলেন, ‘আমার চিন্তাজগতে যেন একটা ঝাঁকুনি লাগল। মনের চোখে ভেসে উঠল পাখির কলতানে মুখর শৈশবের সেই গ্রাম। মনে পড়ল, বিভিন্ন সময়ে টেলিভিশন চ্যানেল ন্যাশনাল জিওগ্রাফিতে দেখা পশুপাখিদের নিয়ে নানা কর্মকাণ্ডের কথা। পরদিন গ্রামের কয়েকজন মুরব্বি এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ব্লক সুপারভাইজারের সঙ্গে পাখিদের পোকা খাওয়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করলাম। তাঁরাও আমার সঙ্গে একমত হলেন। এর তিন-চার দিন পর গ্রামের মুরব্বি, তরুণ, যুবক, ছাত্র অনেককে নিয়ে বৈঠক করলাম। সবারই সাড়া পাওয়া গেল। ঠিক হলো, ‘আলোর ভুবন’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলা হবে। তার মাধ্যমে এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পুরো এলাকায় পাখিদের নিরাপদ আবাস গড়ে তোলা হবে।
আলোর ভুবনের সভাপতি একরামুল মাস্টার জানালেন, সংগঠনের উদ্যোগে প্রতিটি রাস্তার মোড়ে, পুকুর পাড়ে, স্কুল-মাদ্রাসায় সাইনবোর্ড ও নোটিশ টাঙানো হয়-এ গ্রামে পাখি মারা নিষেধ। জুমার নামাজসহ অন্যান্য সময় ইমাম সাহেবদের মাধ্যমেও এ আহ্বান জানানো হয়। তাঁরা পবিত্র কোরআন থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে সবাইকে পশুপাখির প্রতি দয়াশীল হতে বলেন। এর পর শুরু হয় পাখিদের আবাসযোগ্যতা উন্নয়নের কাজ। আলোর ভুবনের সদস্যরা পতিত জায়গায়, রাস্তার পাশে এমন সব গাছ লাগানো শুরু করলেন যাতে পাখিদের খাদ্যের অভাব না হয়।
৪ নম্বর শেখপুরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আরিফ আলী তালুকদার ডাবলু জানান, ভাটিনা গ্রামের মানুষের এই উদ্যোগের সমর্থনে ইউনিয়ন পরিষদ, বেসরকারি সাহায্য সংস্থা কেয়ার, কারিতাসসহ একাধিক সংস্থা ও বন বিভাগ অনুরূপ কার্যক্রম গ্রহণ করে। ভাটিনা ও আশপাশের এলাকায় লাগানো হতে থাকে ফলদ, বনজ ও ওষুধি গাছপালা।
অপর বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক সাইফুদ্দিন আক্তারও বলেন, এ উদ্যোগের কারণে এলাকার মানুষ ক্রমেই পরিবেশ-সচেতন হয়ে উঠতে থাকেন। এলাকার হাট-বাজারে চায়ের দোকানের আড্ডায়ও প্রকৃতি সংরক্ষণের বিষয়টি আলোচনা হতে থাকে। আর তারই ফল বলতে পারেন আজকের ভাটিনা।
অতঃপর দারিদ্রের বিরুদ্ধেঃ ১৯৯৬ সালে গঠিত হয় আলোর ভুবন সমিতি। এর সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ রেজাউল ইসলাম জানান, এলাকায় দরিদ্র লোকজনের সংখ্যা ছিল বেশি। তাই সমিতির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়, প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণের পাশাপাশি এলাকার দরিদ্র লোকজনের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন। গঠন করা হয় সাত সদস্যের প্রথম পরিচালনা কমিটি। গ্রামের ১৫০ জন নারীপুরুষকে সমিতির সদস্য করা হয়। সদস্যরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী দুই টাকা থেকে দশ টাকা পর্যন্ত সঞ্চয় করতে থাকেন। এভাবে যে তহবিল গড়ে ওঠে তা থেকে সদস্যদের ছোট ছোট ঋণ দেওয়া হতে থাকে। সে ঋণ নিয়ে অনেকেই হাঁস-মুরগি ও গরু-ছাগল পালন শুরু করেন। কেউ কেউ ক্ষুদ্র ব্যবসা কিংবা চাষাবাদও করতে থাকেন। ঋণের সুদের হার নির্ধারণ করা হয় শতকরা মাত্র ১০ টাকা।
সভাপতি একরামুল হক মাস্টার জানান, পাঁচ বছর আগে দিনাজপুর জেলা সমবায় অফিস থেকে সমিতির নিবন্ধন নেওয়া হয়েছে। গঠনতন্ত্রের নিয়মকানুন মেনে ফরম পূরণ করে সবাইকে আবার সদস্য হতে হয়েছে। নাম রাখা হয়েছে ‘আলোর ভুবন বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেড’। নিয়মিত সঞ্চয় কর্মসূচি রয়েছে। সমিতির পুঁজি বিনিয়োগ করে যৌথভাবে মাছ চাষ, পোলট্রি খামার, চাষাবাদসহ নানা কর্মসূচি পরিচালনা করা হচ্ছে। বর্তমানে সংগঠনের মোট পুঁজির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ টাকার ওপরে।
পাখিদের জন্য বৃক্ষরোপণঃ সারা দেশে আপনি যেখানেই যাবেন, রাস্তার পাশে কিংবা গ্রামগুলোতে এখন অ্যাকাসিয়া বা ইউক্যালিপটাসের ছড়াছড়ি দেখতে পাবেন। কাঠের গাছের মধ্যে রয়েছে শাল ও মেহগনির আধিপত্য। এসবের মধ্যে আমাদের চিরচেনা গ্রামবাংলাকে খুঁজে পাওয়া অনেক সময়ই দুষ্কর হয়ে ওঠে। এসব গাছে না হয় পাখিদের খাদ্য, না হয় বাসা বানানোর জায়গা। বিশেষ করে কোটরবাসী পাখিদের বাসা বানানো একবারেই অসম্ভব হয়ে পড়ে। আমাদের দেশে পাখির সংখ্যা দ্রুত কমে যাওয়ার এটি অন্যতম প্রধান কারণ। এসব দিক থেকে ব্যতিক্রমী ও প্রশংসার দাবিদার ভাটিনা গ্রামের বৃক্ষরোপণ উদ্যোগ। এ উদ্যোগের পেছনেও রয়েছে আলোর ভুবন সমিতির অগ্রণী ভূমিকা।
ভাটিনা গ্রামের উত্তরে ৩ নম্বর ফাজিলপুর ইউনিয়নের মহারাজপুর গ্রাম। দক্ষিণে ৪ নম্বর শেখপুরা ইউনিয়নের হোসেনপুর, নুলাইবাড়ি; পূর্বে মাধবপুর এবং পশ্চিমে চেহেলগাজী ইউনিয়নের বেলাই গ্রাম। এই গ্রামগুলোর মধ্য দিয়ে যত রাস্তা গেছে, তার সবগুলোতেই লাগানো হয়েছে দেশীয় গাছপালা। আম, জাম, কাঁঠালসহ নানা রকম ফলের গাছ, হরীতকী, আমলকী, বহেরা, গাব, অজুêন, ছাইতান, কদম, অশোকসহ যেসব গাছ গ্রামবাংলা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে, সেগুলোও লাগানো হয়েছে প্রচুর পরিমাণে। বট, পাকুড়সহ যেসব গাছের ফল মানুষের খাদ্য নয়, সেগুলোও লাগানো হয়েছে যথেষ্ট পরিমাণে যাতে পাখিরা খাদ্যসংকটে না ভোগে।
যে টমেটো গাছের গোড়ায় পোকা খোঁটাতে দেখে পাখির অভয়ারণ্য সৃষ্টির ধারণা আসে মুক্তিযোদ্ধা আবুল হাশেমের মাথায়, এ গ্রামে সেই টমেটো চাষেরও অগ্রপথিক তিনি। তিনি বলেন, ২৫ বছর আগে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের স্থানীয় ব্লক সুপারভাইজারের সহযোগিতায় তিনি উন্নত জাতের টমেটো চাষ শুরু করেন। তাঁর দেখাদেখি আশপাশের গ্রামের অনেকেই টমেটো চাষে হাত দেন। এখন এলাকার কৃষকদের অন্যতম আয়ের উতস এই টমেটো।
ফরহাদ মাহমুদ ও আসাদুল্লাহ সরকার, ভাটিনা (দিনাজপুর) থেকে ফিরে লিখেছেন দৈনিক প্রথম আলোয়। সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, ঢাকা ৭ এপ্রিল, ২০০৭মন্তব্যগুলো (0)
![]() মন্তব্য লিখুন
|
|
| সর্বশেষ আপডেট ( Saturday, 07 April 2007 ) |
| < পূর্বে |
|---|