• Narrow screen resolution
  • Wide screen resolution
  • Auto width resolution
  • Increase font size
  • Decrease font size
  • Default font size
Member Area

নিসর্গ : বাংলার প্রকৃতি | Nishorga : Bangladesh Nature & Environment

Tuesday
Oct 07th
হোম arrow প্রবন্ধ arrow হারিয়ে যাচ্ছে নদীর ইলিশ
হারিয়ে যাচ্ছে নদীর ইলিশ প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন শতদল সরকার   
Thursday, 31 May 2007

বাংলাদেশের শতাধিক নদী থেকে রুপালি ইলিশ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আরও অনেক নদী থেকে বিলুপ্তির পথে। পানিদূষণ, নির্বিচারে জাটকা নিধন ও চর পড়ে যাওয়ায় মূলত নদী থেকে ইলিশ বিলুপ্ত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, নদীতে ইলিশ যেভাবে কমতে শুরু করেছে, এতে এখনই ব্যবস্থা না নেওয়া হলে ভবিষ্যতে নদী থেকে ইলিশ বিলুপ্ত হয়ে যাবে। নদীতে ২০ বছর আগে যে পরিমাণ ইলিশ ধরা পড়ত এখন তার অর্ধেকও ধরা পড়ে না। তবে সাগরে ধরা পড়ার পরিমাণ বাড়ছে।

রূপালি ইলিশ। ছবি: www.tazabazar.com
রূপালি ইলিশ। ছবি: www.tazabazar.com
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ইলিশ বিশেষজ্ঞ ড· গোবিন্দ চন্দ্র হালদার প্রথম আলোকে বলেন, নদীর চেয়ে সাগরে বেশি ধরা পড়া, ইলিশের সাগরের দিকে সরে যাওয়াকে নির্দেশ করছে। ইতিমধ্যে ভারত ও মিয়ানমারে ইলিশের উৎপাদন বেড়ে গেছে। দেশের ইলিশ যদি আরও দক্ষিণে সরে গিয়ে সমুদ্রসীমানার বাইরে চলে যায় তাহলে বাংলাদেশে ইলিশ ধরা পড়ার পরিমাণ কমে যাবে।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ২০ বছর আগেও দেশের ২৩০টি নদীতে ইলিশের অবাধ বিচরণ ছিল। এর মধ্যে অর্ধশতাধিক নদী মৃতপ্রায়। এসব নদীতে আর ইলিশ মেলে না। এখনই ব্যবস্থা না নিলে ১৫-২০ বছর পর শতাধিক নদী থেকে ইলিশ হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড· মোহাম্মদ শফি দীর্ঘদিন ধরে ইলিশ নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি বলেন, ইলিশের আবাসস্থল ধ্বংস হয়ে গেলে ইলিশের সামনে তিনটি পথ খোলা থাকে। এক, ইলিশ স্থান ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যায়। দুই, পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করে অথবা তিন, ইলিশের বংশ সমূলে ধ্বংস হয়ে যায়। তিনি মনে করেন, মনে হচ্ছে নদীর ইলিশ এখন প্রথম দুটি করছে। নদী ছাড়ছে। কোনো কোনো নদীতে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করছে।

ইলিশ গবেষকেরা জানান, নদীর পানিতে এক ধরনের প্লাঙ্কটোন বা সূক্ষ্ম জলজ উদ্ভিদ আছে। এটি ইলিশের প্রধান খাবার। পানিদূষণের কারণে নদীতে এখন এই প্লাঙ্কটোন কমে গেছে। ফলে নদীতে ইলিশের খাবারও কমছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড· মোহাম্মদ খুরশীদ আলমসহ আরও কয়েকজন বিশেষজ্ঞ নদীর পানি নিয়ে কয়েক বছর আগে গবেষণা করেছেন। ওই গবেষণা থেকে জানা গেছে, কার্বন কমে যাওয়ায় নদীর পানির স্বচ্ছতাও কমেছে। এতে মাছের খাদ্যের উপকরণ সংকট দেখা দিয়েছে। কলকারখানার বর্জø সরাসরি নদীতে ফেলায় এই পানি দূষিত হয়েছে।

ড· খুরশীদ আলম বলেন, নদীর মাটি সাধারণত পানি ও বায়ুকে দূষণমুক্ত করে। কিন্তু অতিরিক্ত বর্জেøর কারণে মাটির মান পরিবর্তন হয়েছে। পানি আর স্বচ্ছতা ফিরে পাচ্ছে না। ইলিশ অনুকূল পরিবেশ পায় না।

গঙ্গার দূষণ পদ্মায়ঃ জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি), বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (ফাও) এবং বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, ’৬০-এর দশকে গঙ্গায় (ভাগীরথী) প্রচুর ইলিশ ধরা পড়ত। কিন্তু কলকাতা ও এর আশপাশের কারখানার বর্জে গঙ্গার পানি দূষিত হয়ে পড়ে। এতে ’৭০-এর দশকেই গঙ্গা ছেড়ে ইলিশ পদ্মায় আসতে শুরু করে। এখন পদ্মার অবস্থাও ক্রমশ গঙ্গার মতো হচ্ছে।

মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড· মোহাম্মদ কামাল এখন চাঁদপুর কেন্দ্রে পদ্মার ইলিশ নিয়ে কাজ করছেন। তিনি জানান, ডিম ছাড়ার সময় সাগর ছেড়ে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ নদীতে আসে। কিন্তু পদ্মায় আসতে গিয়ে এসব ইলিশ অসংখ্য চরে বাধা পায়। এতে অনেক ইলিশ আসতে না পেরে আবার সাগরে ফিরে যায়।

ইনস্টিটিউটের মুখ্য বৈজ্ঞানিক ড· জি সি হালদার জানান,

ইলিশ খুবই সংবেদনশীল মাছ। এরা গভীর পানিতে দ্রুত সাঁতার কাটে। তাই নদীর গভীরতা কমায় সমস্যা হয়েছে। এ কারণে ফেনী, মুহুরী, কর্ণফুলী, শীতলক্ষ্যা, ধনু, কালিনদী, হুরাসাগর, কুমার, নবগঙ্গা, মধুমতি, গড়াই ও চিত্রা নদীর ইলিশ হারিয়ে গেছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, এখন শুধু পদ্মার নিম্নাংশ, কীর্তনখোলা, তেঁতুলিয়া, শাহবাজপুর চ্যানেল এবং বরিশাল অঞ্চলের কয়েকটি নদীতে ইলিশ পাওয়া যায়। এসব নদীতে জেলেরা নিয়মিত মাছ ধরছেন। তাঁরা মৎস্য অধিদপ্তরের পরিদর্শকদের জানিয়েছেন, এ নদীতেও এখন আর আগের মতো ইলিশ তাঁরা পাচ্ছেন না।

এদিকে মৎস্য অধিদপ্তরের তালিকায় নেই এ রকম কয়েকটি নদীর জেলেরা জানান, বরিশালের সন্ধ্যা, কঁচা, সুগন্ধ্যা, বুড়া গৌরাঙ্গ, লোহালিয়া, কীর্তনখোলা ও পায়রা নদীতে ইলিশ পাওয়ার পরিমাণ অনেক কমে গেছে। বরিশালের বানারীপাড়া থানার কাজলাহার গ্রামের অধিবাসী ও জেলে রশিক লাল বিক্রম জানান, সাত-আট বছর আগেও জোয়ারে জাল ফেলে কমপক্ষে ৫০টি ইলিশ পেয়েছেন। রশিক বলেন, ‘এখন সারা দিনে ১০টা মাছের আশা করি। মিলাইতে পারি না।’

জরিপে ইলিশঃ ১৯৮৫-৮৬ সালে ইউএনডিপি, ফাও এবং ’৮৩-৮৪ সালে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট পরিচালিত ইলিশের এক জরিপে দেখা গেছে, নদী ও সংশ্লিষ্ট অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে প্রতিবছর গড়ে ইলিশ ধরা পড়েছে শূন্য দশমিক ৯০ লাখ মেট্রিক টন। ২০০০-০১ সালে নদীতে ধরা হয়েছে শূন্য দশমিক ৭৫ লাখ মেট্রিক টন। এই হিসাবে ১৬-১৭ বছরে নদীতে ইলিশ ধরা পড়ার পরিমাণ কমেছে শতকরা ১৭ ভাগ। সরকারি কর্মকর্তারা জানান, আগে দেশের শতকরা ৯৫ ভাগ ইলিশ নদী থেকেই ধরা হতো। এখন মোট ইলিশের মাত্র ৩৪ থেকে ৩৫ শতাংশ নদী থেকে পাওয়া যায়।

ইলিশের প্রাচুর্য ফিরবেঃ বছর-বছর নদীর ইলিশ ধরা হবে, তারপরও ইলিশের কোনো কমতি হবে না। এ অবস্থা একসময় ছিল। এখন নেই। আগের অবস্থা ফিরিয়ে আনতে স্ত্রী ইলিশকে অন্তত একবার ডিম ছাড়ার এবং পুরুষ ইলিশকে একবার শুক্রাণু ছাড়ার সুযোগ দিতে হবে। অর্থাৎ অপ্রাপ্ত বয়স্ক কোনো ইলিশ ধরা যাবে না। এ কথা জানিয়ে ড· শফি বলেন, ইলিশ সারা বছরই ডিম ছাড়ে। একটি ইলিশ আট থেকে ১৮ লাখ পর্যন্ত ডিম ছাড়তে পারে। তবে নভেম্বর থেকে মে পর্যন্ত ডিম ছাড়ার উত্তম মৌসুম। তিনি বলেন, যে মাছটি একবার ডিম কিংবা শুক্রাণু ছাড়বে, সেটিই ধরার উপযুক্ত হবে। এ কারণে মৎস্য আইনের এখন সংস্কার করা দরকার।

অধ্যাপক শফি মনে করেন, এখন নয় ইঞ্চি মাছ ধরার আইনটি যথেষ্ট নয়। ১২ ইঞ্চির কম কোনো মাছ ধরা যাবে না-এই আইন করতে হবে। এ ছাড়া আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করে কারেন্ট জালের ব্যাপারেও ব্যবস্থা নিতে হবে। সংশ্লিষ্টরা বলেন, ইলিশের অনুকূল পরিবেশের জন্য নদীতে সরাসরি কলকারখানার বর্জ না ফেলা এবং নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি করে সার্বিক দূষণ রোধ করার ব্যবস্থা নিলে ইলিশের প্রতিকূল পরিবেশ অনুকূল হবে।

এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অসংখ্য প্রতিবন্ধকতার কথা জানালেন মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন,
এতে যে লোকবল দরকার, তা মৎস্য অধিদপ্তরের নেই। এ ছাড়া কোন জেলে ছোট ফাঁসের জাল দিয়ে মাছ ধরছে, এটি নদীতে বসে থেকে ধরবে কে?’
নজরুল ইসলাম বলেন, নদীর তীরে যদি অপরিকল্পিত শিল্প গড়ে ওঠে, তা দেখার জন্য পরিবেশ মন্ত্রণালয়, আইন বাস্তবায়নের জন্য পুলিশ, কোস্টগার্ড ও নৌ-সেনাদের সমন্বয়ে এসব বিষয় পরিচালনা করা যায়, তাহলে আইনের বাস্তবায়ন সম্ভব। এমনকি গণসচেতনতার জন্য গণমাধ্যমকেও এগিয়ে আসতে হবে।

 

সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, মে ৩১, ২০০৭ 

মন্তব্যগুলো (0)Add Comment

মন্তব্য লিখুন

security code
Write the displayed characters


busy
সর্বশেষ আপডেট ( Friday, 01 June 2007 )
 
< পূর্বে   পরে >