• Narrow screen resolution
  • Wide screen resolution
  • Auto width resolution
  • Increase font size
  • Decrease font size
  • Default font size
Member Area

নিসর্গ : বাংলার প্রকৃতি | Nishorga : Bangladesh Nature & Environment

Monday
Oct 06th
হোম arrow প্রবন্ধ arrow সামুদ্রিক কচ্ছপ প্রজননে সাফল্য
সামুদ্রিক কচ্ছপ প্রজননে সাফল্য প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন আবদুল কুদ্দুস রানা   
Sunday, 03 June 2007
যুক্তরাজ্যের কলেজছাত্র লরেন্স (২৫) গত বছর সেপ্টেম্বরে মালয়েশিয়া গিয়েছিলেন গভীর সাগর থেকে কয়েক হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে উপকুলে ডিম পাড়তে আসা কচ্ছপ দেখতে। মালয়েশিয়ার সাভা সৈকতে তাঁরা সাত বন্ধু তিন দিন তিন রাত পড়ে থাকেন। কিন্তু কচ্ছপ আর আসে না। অবশেষে তাঁদের আশা মিটল বাংলাদেশের কক্সবাজারে এসে। মা-কচ্ছপের ডিম পাড়া শুধু নয়, সেই ডিম থেকে বিশেষ ব্যবস্থায় বাচ্চা ফোটানো এবং সেই বাচ্চার হেঁটে হেঁটে সাগরে নেমে পড়ার বিরল দৃশ্য দেখে ‘যারপরনাই’ বিস্নিত, পুলকিত, বিমোহিত এই বিদেশি শিক্ষার্থীরা।

গত ১২ মে লরেন্স তাঁর এক বন্ধু কেনেডিকে নিয়ে বাংলাদেশ সফরে আসেন। তাঁরা কক্সবাজার, টেকনাফ, মহেশখালী, সেন্ট মার্টিন ইত্যাদি উপকুলীয় এলাকা পরিদর্শন করেন। ১৯ মে দুই বিদেশি শিক্ষার্থীকে দেখা গেল প্যাচারদ্বীপ সৈকতে একটি কচ্ছপ প্রজননকেন্দ্রে বাচ্চা কচ্ছপের ছবি তুলছেন। লরেন্স বলেন, লাখ লাখ টাকা খরচ করেও অনেকে এই দুর্লভ দৃশ্য দেখার সুযোগ পায় না। অথচ তাঁরা এখানে বিনা পয়সায় খুব সহজে এ সুযোগ পাচ্ছেন। লরেন্স আরও বলেন,
আগামী বছর যুক্তরাজ্য থেকে আমার অনেক বন্ধু বাংলাদেশে আসবেন। টেলিফোনে তাঁদের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। শুনে তাঁরা মহা খুশি। আমরা দেশে গিয়ে এখানকার বালুচরে কচ্ছপ প্রজননের বিষয়টি সবাইকে বলব।

বালুচরে কচ্ছপ প্রজনন! শুনতে অবাক লাগলেও কক্সবাজারসহ আশপাশের সমুদ্রসৈকতের বালুচরে রীতিমতো হ্যাচারি বানিয়ে কচ্ছপের ডিম থেকে বাচ্চা ফোটানোর কাজ চলছে। তবে কোনো বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে নয়। উদ্দেশ্য হলো সামুদ্রিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অতি জরুরি এই কচ্ছপ প্রজাতিকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচানো। এই মহৎ উদ্দেশ্য সামনে রেখে কক্সবাজার সাগর উপকুলের প্রায় ১২০ কিলোমিটার বালুচর থেকে ডিম সংগ্রহ করে বাচ্চা ফুটিয়ে সেগুলো নিরাপদে সাগরে ছেড়ে দেওয়ার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে সরকারি ও বেসরকারি তিনটি সংস্থা।


‘কচ্ছপপাগল’ বা ‘কচ্ছপের বাপ’: ১৯৮৮ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের ছাত্র মো. জহিরুল ইসলাম জুয়েল সেন্ট মার্টিনে শিক্ষাসফরে গিয়ে দেখেন, কয়েকটি কুকুর বালুচরে পড়ে থাকা কচ্ছপের ডিমগুলো খেয়ে ফেলছে। ওদিকে আবার সাগরের ঢেউয়ের সঙ্গে ভেসে আসছে অসংখ্য মৃত কচ্ছপ। জুয়েলের মনটা খারাপ হয়ে যায়। ১৯৯১ সালের নভেম্বরে তিনি ‘বাংলাদেশ পৌষ’ নামের একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় যোগ দিয়ে উপকুলের জীববৈচিত্র্য নিয়ে কাজ করেন। এ সময়ও তিনি দেখেন কচ্ছপের বেঘোরে মারা পড়ার নানা দৃশ্য। ১৯৯৬ সালে তিনি ‘কারিনাম’ নামে একটি এনজিওর সঙ্গে যুক্ত হয়ে সেন্ট মার্টিনে কচ্ছপ সংরক্ষণের কাজ শুরু করেন। কিন্তু ফান্ড না থাকায় ’৯৮ সালে এটি বন্ধ হয়ে যায়। পরে ‘সিএনআরএস’ নামে আরেকটি এনজিও এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের একাধিক প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি কচ্ছপ ও বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেন। কিন্তু এসব কাজে পরিতৃপ্তি না আসায় এখান থেকে বেরিয়ে নিজেই গঠন করেন ‘মেরিন লাইফ এলায়েন্স’ নামে একটি উন্নয়ন সংস্থা, যার কাজ হচ্ছে−বালুচর থেকে কচ্ছপের ডিম সংগ্রহ করে বাচ্চা ফুটিয়ে সাগরে অবমুক্ত করা এবং কচ্ছপের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জেলে ও উপকুলবাসীকে সচেতন করা। জাপানের একটি প্রতিষ্ঠান এতে আর্থিক সহযোগিতা দেয়।

বে কচ্ছপের হ্যাচারি চিংড়ি হ্যাচারির মতো বড় কিছু নয়। যন্ত্রপাতিও লাগে না। বালুচরে বড় বড় ঘর বানানো হয়। ওপরে কোনো চালা থাকে না। বাঁশের বেড়া দিয়ে বালুর নিচে কলসির আদলে এক ফুট গভীর গর্ত খুঁড়ে তাতে ৫০ থেকে ১০০টি ডিম রাখা হয়। ৫০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে ডিম থেকে বাচ্চা বের হয়। গর্ত থেকে এক ফুট বালু ঠেলে উপরে উঠতে বাচ্চাদের দুই দিন সময় লাগে।


জুয়েলের কাছে জানা যায়, হাজারে একটি মেয়েবাচ্চা হয়তো মা হতে পারে। বাকি ৯৯৯টি নানা কারণে মারা পড়ে। জুয়েল বলেন, আগামী বছর থেকে তাঁরা উপকুলে হ্যাচারির সংখ্যা আরও বাড়াবেন। এক প্রশ্নের জবাবে জুয়েল হাসতে হাসতে বলেন, ‘কচ্ছপ নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে করতে অনেকে আমাকে কচ্ছপপাগল বলে ডাকে। কেউ কেউ আবার কচ্ছপের বাপও বলে।’ ৩৮ বছর বয়সী এই কচ্ছপপাগল মানুষটি এখনো বিয়ে করেননি। ‘কেন’ জানতে চাইলে বলেন, ‘বিয়ে করলে কচ্ছপদের দেখবে কে?’

 

গত ১০ মে দুপুরে মেরিন লাইফ এলায়েন্সের কর্মীরা প্যাচারদ্বীপ উপকুলে আড়াই দিন বয়সী ৫৪টি কচ্ছপছানা সমুদ্রে ছাড়েন। এই হ্যাচারির বালুর নিচে ১৩টি গর্তে আরও কয়েক হাজার ডিম রয়েছে। জানা যায়, সংগৃহীত ডিম থেকে ৮০ শতাংশ বাচ্চা ফোটে, বাকিটা নষ্ট হয়। গত সেপ্টেম্বর থেকে ৩০ এপ্রিল−এই সাত মাসে মেরিন লাইফ এলায়েন্স প্রায় ১১ হাজার ডিম সংগ্রহ করে এ পর্যন্ত সাড়ে নয় হাজার বাচ্চা সমুদ্রে অবমুক্ত করেছে। জুন পর্যন্ত আটটি হ্যাচারি থেকে আরও সাড়ে তিন হাজার বাচ্চা ফুটিয়ে ছাড়া হবে। হ্যাচারিতে ডিম রয়েছে চার হাজার ২১৩টি।


মেরিন লাইফ এলায়েন্স ছাড়াও সরকারের পরিবেশ অধিদপ্তর ও আরেকটি বেসরকারি সংগঠন সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডিজ (সিএনআরএস) এ কাজ করছে। গত সাত মাসে তাঁরাও চার হাজার ৩০০ কচ্ছপছানা সাগরে অবমুক্ত করেন। কচ্ছপের মায়ার জালে: টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের বাসিন্দা আবুল কালাম (৫৪) বলেন, ‘১০ বছর ধরে সাগরে চিংড়ি পোনা ধরতাম। নানা প্রজাতির মাছের পোনা মারা পড়ত। জালে আটকে মারা যেত মা-কচ্ছপ। আবার সাগরে নামার সময় অসংখ্য কচ্ছপছানা জালে আটকে মরত। এসব দেখে খারাপ লাগত। একসময় মেরিন লাইফ এলায়েন্স চাকরি পেলাম। এখন কচ্ছপ সংরক্ষণের কাজ করি। অন্যদের সচেতনও করি।’ সেন্ট মার্টিন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাওলানা ফিরোজ আহমদ বলেন, কয়েক বছর আগেও এখান থেকে হাজার হাজার কচ্ছপের ডিম নৌকা বোঝাই করে মিয়ানমারে পাচার হতো। মানুষ ডিমও নিত, মা-কচ্ছপটিও মেরে বেচে দিত। এখন এসব বন্ধ হয়েছে।

জীববিজ্ঞানীদের কাছ থেকে জানা যায়, কোনো কচ্ছপেরই প্রধান খাদ্য মাছ নয়। এরা সাধারণত শামুক, ঝিনুক, জেলি ফিশ, কাঁকড়া, চিংড়ি, অক্টোপাস, কাটল ফিস, স্পঞ্জ, শৈবালসহ সামুদ্রিক ঘাস খেয়ে জীবন ধারণ করে। জেলি ফিশ বা নুইন্যা কচ্ছপের অন্যতম প্রধান খাদ্য।


অন্যদিকে মাছের পোনা জেলি ফিশের খাদ্য। তাই কচ্ছপ জেলি ফিশ খেয়ে মাছের পোনা রক্ষা করে। কচ্ছপ এক উপকুল থেকে অন্য উপকুলে সামুদ্রিক গাছগাছড়ার বিস্তার ঘটিয়ে পরিবেশ রক্ষা করে। আর তাই কচ্ছপ রক্ষার নানা উদ্যোগ রয়েছে বিশ্বজুড়ে। কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা আব্দুল হান্নান বলেন, ভারত মহাসাগর ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সামুদ্রিক কচ্ছপ সংরক্ষণসংক্রান্ত সমঝোতা স্নারকে বাংলাদেশ সরকার ২০০৪ সালে স্বাক্ষর করে এই অঞ্চলের সামুদ্রিক কচ্ছপ সংরক্ষণের জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ হয়। টেকনাফ অঞ্চলের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান বলেন, কচ্ছপ সংরক্ষণে সরকার কক্সবাজার থেকে সেন্ট মার্টিন উপকুল পর্যন্ত নানা কর্মসুচি হাতে নিয়েছে। স্থানীয়দের পাশাপাশি জেলেদেরও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সচেতন করার কাজ চলছে। কচ্ছপ রক্ষা করা গেলে উপকুলের পরিবেশ এমনিতেই রক্ষা পাবে।


সাতসমুদ্র পাড়ি দিয়ে: বিশেষজ্ঞরা বলেন, জীবনের বেশির ভাগ সময় সমুদ্রের পানিতে থাকলেও মা-কচ্ছপ ডিম ছাড়ার জন্য দক্ষ নাবিকের মতো কয়েক হাজার মাইল সাগর পাড়ি দিয়ে উপকুলের বালুচরে আসে। অন্ধকার রাতে জোয়ারের পানির সর্বোচ্চ সীমার উপরে উঠে শুকনো বালুচরে ডিম পেড়ে গর্তে মাটি চাপা দিয়ে সাগরে ফিরে যায়। মাস দুয়েক পর সুর্যের তাপে ডিম ফুটে বাচ্চাগুলো নিজে নিজেই বালির নিচ থেকে বেরিয়ে সাগরে চলে যায়। এ সময় বহু বাচ্চা কুকুর, শেয়াল, কাঁকড়া, গুইসাপ দ্বারা আক্রান্ত হয়। যারা বেঁচে যায়, তারা সাগরে নেমেই টানা ৪৮ ঘণ্টা সাঁতরে গভীর সমুদ্রে চলে যায়। যে মা-কচ্ছপ এত আশা নিয়ে এ দেশের মাটিতে ডিম পাড়তে আসে, তার নিরাপত্তা কি রাখা হয়? প্রতিবছর জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত হাজার হাজার মা-কচ্ছপ জেলেদের পুঁতে রাখা জালে আটকা পড়ে মারা যায়। মেরিন লাইফ এলায়েন্স গত জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে কয়েকটি উপকুল থেকে পাঁচ শতাধিক মৃত কচ্ছপের দেহাবশেষ উদ্ধার করে। তারা জানায়, সেন্ট মার্টিনে গত পাঁচ বছরে কচ্ছপের ডিম পাড়ার স্থানও অনেক কমে গেছে। মূলত দ্বীপের উত্তর-পশ্চিম দিকে অপরিকল্পিতভাবে হোটেল নির্মাণ, বালিয়াড়ি ধ্বংস, গাছগাছালি সাবাড়সহ প্রাকৃতিক পরিবেশ নষ্ট করায় এই পরিস্থিতি হয়েছে। তা ছাড়া মা-চিংড়ি ধরার জাল থেকে কচ্ছপ বেরিয়ে যাওয়ার বিশেষ ব্যবস্থা রাখার কথা থাকলেও বাংলাদেশে আজও তা বাস্তবায়ন হয়নি।

মিসেস মিসিকো (২৫) নামে একজন জাপানি পর্যটক প্রথম আলোকে বলেন,

‘ছয় বছর আগে বাবার সঙ্গে কক্সবাজার সৈকতে এসে দেখেছি, বিশাল চরে লাখ লাখ রাজকাঁকড়া ছুটছে। রাতে কচ্ছপ এসে ডিম পেড়ে চলে যাচ্ছে। এখন তেমনটা নেই। পুরো সৈকতে হোটেল, মোটেল, হ্যাচারি, ঘরবাড়ি বানিয়ে ভরে রাখা হয়েছে। পাহাড়-পর্বত, গাছপালা কেটে, বিদ্যুতের আলো জ্বালিয়ে সৈকতে রাতভর হইচই চলছে। কচ্ছপ কেন, কোনো ভালো মানুষও এ পরিবেশে থাকতে চাইবে না।’
জার্মান পর্যটক স্টেফানি (৪৪) বলেন, ‘১৯৯৭ সালে একবার সেন্ট মার্টিনে গিয়ে একরাতে ৮৭টি কচ্ছপকে ডিম পাড়তে দেখেছি। আর এখন? হোটেল, মোটেল, দালানকোঠা বানিয়ে আকর্ষণীয় এই দ্বীপটিকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলা হচ্ছে।’

বিদেশি পর্যটকদের মতে, পৃথিবীর দীর্ঘতম এই সৈকতের বিশেষ জায়গায় কচ্ছপের জন্য ‘নিরাপদ সৈকত জোন’ ঘোষণা করা দরকার। নিরিবিলি পরিবেশে হাজার মাইল দুর থেকে কচ্ছপ এসে ডিম দিয়ে চলে যাবে। সেখানে পাখিরা উড়বে, বসবে। বালুচরে লাল কাঁকড়ার দল ছোটাছুটি করবে। পানিতে মাছেরা ঝাঁক বেঁধে বিচরণ করবে। তাঁরা বলেন, ‘আমরা বিদেশিরা দুর থেকে এসব দেখতে দলে দলে আসব। এই না হলে কীসের পর্যটন?’



সূ্ত্র: দৈনিক প্রথম আলো, ২ জুন ২০০৭
মন্তব্যগুলো (0)Add Comment

মন্তব্য লিখুন

security code
Write the displayed characters


busy
সর্বশেষ আপডেট ( Thursday, 14 June 2007 )
 
পরে >

এ ধরনের লেখা