| সামুদ্রিক কচ্ছপ প্রজননে সাফল্য |
|
|
| লিখেছেন আবদুল কুদ্দুস রানা | |
| Sunday, 03 June 2007 | |
|
যুক্তরাজ্যের কলেজছাত্র লরেন্স (২৫) গত বছর সেপ্টেম্বরে মালয়েশিয়া গিয়েছিলেন গভীর সাগর থেকে কয়েক হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে উপকুলে ডিম পাড়তে আসা কচ্ছপ দেখতে। মালয়েশিয়ার সাভা সৈকতে তাঁরা সাত বন্ধু তিন দিন তিন রাত পড়ে থাকেন। কিন্তু কচ্ছপ আর আসে না। অবশেষে তাঁদের আশা মিটল বাংলাদেশের কক্সবাজারে এসে। মা-কচ্ছপের ডিম পাড়া শুধু নয়, সেই ডিম থেকে বিশেষ ব্যবস্থায় বাচ্চা ফোটানো এবং সেই বাচ্চার হেঁটে হেঁটে সাগরে নেমে পড়ার বিরল দৃশ্য দেখে ‘যারপরনাই’ বিস্নিত, পুলকিত, বিমোহিত এই বিদেশি শিক্ষার্থীরা। গত ১২ মে লরেন্স তাঁর এক বন্ধু কেনেডিকে নিয়ে বাংলাদেশ সফরে আসেন। তাঁরা কক্সবাজার, টেকনাফ, মহেশখালী, সেন্ট মার্টিন ইত্যাদি উপকুলীয় এলাকা পরিদর্শন করেন। ১৯ মে দুই বিদেশি শিক্ষার্থীকে দেখা গেল প্যাচারদ্বীপ সৈকতে একটি কচ্ছপ প্রজননকেন্দ্রে বাচ্চা কচ্ছপের ছবি তুলছেন। লরেন্স বলেন, লাখ লাখ টাকা খরচ করেও অনেকে এই দুর্লভ দৃশ্য দেখার সুযোগ পায় না। অথচ তাঁরা এখানে বিনা পয়সায় খুব সহজে এ সুযোগ পাচ্ছেন। লরেন্স আরও বলেন, আগামী বছর যুক্তরাজ্য থেকে আমার অনেক বন্ধু বাংলাদেশে আসবেন। টেলিফোনে তাঁদের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। শুনে তাঁরা মহা খুশি। আমরা দেশে গিয়ে এখানকার বালুচরে কচ্ছপ প্রজননের বিষয়টি সবাইকে বলব। বালুচরে কচ্ছপ প্রজনন! শুনতে অবাক লাগলেও কক্সবাজারসহ আশপাশের সমুদ্রসৈকতের বালুচরে রীতিমতো হ্যাচারি বানিয়ে কচ্ছপের ডিম থেকে বাচ্চা ফোটানোর কাজ চলছে। তবে কোনো বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে নয়। উদ্দেশ্য হলো সামুদ্রিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অতি জরুরি এই কচ্ছপ প্রজাতিকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচানো। এই মহৎ উদ্দেশ্য সামনে রেখে কক্সবাজার সাগর উপকুলের প্রায় ১২০ কিলোমিটার বালুচর থেকে ডিম সংগ্রহ করে বাচ্চা ফুটিয়ে সেগুলো নিরাপদে সাগরে ছেড়ে দেওয়ার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে সরকারি ও বেসরকারি তিনটি সংস্থা।
বে কচ্ছপের হ্যাচারি চিংড়ি হ্যাচারির মতো বড় কিছু নয়। যন্ত্রপাতিও লাগে না। বালুচরে বড় বড় ঘর বানানো হয়। ওপরে কোনো চালা থাকে না। বাঁশের বেড়া দিয়ে বালুর নিচে কলসির আদলে এক ফুট গভীর গর্ত খুঁড়ে তাতে ৫০ থেকে ১০০টি ডিম রাখা হয়। ৫০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে ডিম থেকে বাচ্চা বের হয়। গর্ত থেকে এক ফুট বালু ঠেলে উপরে উঠতে বাচ্চাদের দুই দিন সময় লাগে।
গত ১০ মে দুপুরে মেরিন লাইফ এলায়েন্সের কর্মীরা প্যাচারদ্বীপ উপকুলে আড়াই দিন বয়সী ৫৪টি কচ্ছপছানা সমুদ্রে ছাড়েন। এই হ্যাচারির বালুর নিচে ১৩টি গর্তে আরও কয়েক হাজার ডিম রয়েছে। জানা যায়, সংগৃহীত ডিম থেকে ৮০ শতাংশ বাচ্চা ফোটে, বাকিটা নষ্ট হয়। গত সেপ্টেম্বর থেকে ৩০ এপ্রিল−এই সাত মাসে মেরিন লাইফ এলায়েন্স প্রায় ১১ হাজার ডিম সংগ্রহ করে এ পর্যন্ত সাড়ে নয় হাজার বাচ্চা সমুদ্রে অবমুক্ত করেছে। জুন পর্যন্ত আটটি হ্যাচারি থেকে আরও সাড়ে তিন হাজার বাচ্চা ফুটিয়ে ছাড়া হবে। হ্যাচারিতে ডিম রয়েছে চার হাজার ২১৩টি।
জীববিজ্ঞানীদের কাছ থেকে জানা যায়, কোনো কচ্ছপেরই প্রধান খাদ্য মাছ নয়। এরা সাধারণত শামুক, ঝিনুক, জেলি ফিশ, কাঁকড়া, চিংড়ি, অক্টোপাস, কাটল ফিস, স্পঞ্জ, শৈবালসহ সামুদ্রিক ঘাস খেয়ে জীবন ধারণ করে। জেলি ফিশ বা নুইন্যা কচ্ছপের অন্যতম প্রধান খাদ্য। অন্যদিকে মাছের পোনা জেলি ফিশের খাদ্য। তাই কচ্ছপ জেলি ফিশ খেয়ে মাছের পোনা রক্ষা করে। কচ্ছপ এক উপকুল থেকে অন্য উপকুলে সামুদ্রিক গাছগাছড়ার বিস্তার ঘটিয়ে পরিবেশ রক্ষা করে। আর তাই কচ্ছপ রক্ষার নানা উদ্যোগ রয়েছে বিশ্বজুড়ে। কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা আব্দুল হান্নান বলেন, ভারত মহাসাগর ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সামুদ্রিক কচ্ছপ সংরক্ষণসংক্রান্ত সমঝোতা স্নারকে বাংলাদেশ সরকার ২০০৪ সালে স্বাক্ষর করে এই অঞ্চলের সামুদ্রিক কচ্ছপ সংরক্ষণের জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ হয়। টেকনাফ অঞ্চলের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান বলেন, কচ্ছপ সংরক্ষণে সরকার কক্সবাজার থেকে সেন্ট মার্টিন উপকুল পর্যন্ত নানা কর্মসুচি হাতে নিয়েছে। স্থানীয়দের পাশাপাশি জেলেদেরও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সচেতন করার কাজ চলছে। কচ্ছপ রক্ষা করা গেলে উপকুলের পরিবেশ এমনিতেই রক্ষা পাবে।
মিসেস মিসিকো (২৫) নামে একজন জাপানি পর্যটক প্রথম আলোকে বলেন, ‘ছয় বছর আগে বাবার সঙ্গে কক্সবাজার সৈকতে এসে দেখেছি, বিশাল চরে লাখ লাখ রাজকাঁকড়া ছুটছে। রাতে কচ্ছপ এসে ডিম পেড়ে চলে যাচ্ছে। এখন তেমনটা নেই। পুরো সৈকতে হোটেল, মোটেল, হ্যাচারি, ঘরবাড়ি বানিয়ে ভরে রাখা হয়েছে। পাহাড়-পর্বত, গাছপালা কেটে, বিদ্যুতের আলো জ্বালিয়ে সৈকতে রাতভর হইচই চলছে। কচ্ছপ কেন, কোনো ভালো মানুষও এ পরিবেশে থাকতে চাইবে না।’ বিদেশি পর্যটকদের মতে, পৃথিবীর দীর্ঘতম এই সৈকতের বিশেষ জায়গায় কচ্ছপের জন্য ‘নিরাপদ সৈকত জোন’ ঘোষণা করা দরকার। নিরিবিলি পরিবেশে হাজার মাইল দুর থেকে কচ্ছপ এসে ডিম দিয়ে চলে যাবে। সেখানে পাখিরা উড়বে, বসবে। বালুচরে লাল কাঁকড়ার দল ছোটাছুটি করবে। পানিতে মাছেরা ঝাঁক বেঁধে বিচরণ করবে। তাঁরা বলেন, ‘আমরা বিদেশিরা দুর থেকে এসব দেখতে দলে দলে আসব। এই না হলে কীসের পর্যটন?’ সূ্ত্র: দৈনিক প্রথম আলো, ২ জুন ২০০৭ মন্তব্যগুলো (0)
![]() মন্তব্য লিখুন
|
|
| সর্বশেষ আপডেট ( Thursday, 14 June 2007 ) |
| পরে > |
|---|