| মৃতপ্রায় নদী, বর্জ্য দূষণ ও বিপন্ন পরিবেশ |
|
|
| লিখেছেন শাহ মতিন টিপু | |
| Friday, 09 March 2007 | |
|
আজকের কাগজ: ঢাকা, মার্চ ১০, ২০০৭। অপরিকল্পিত শিল্প কারখানা ও পরিত্যক্ত বর্জ্য রাজধানীর সংশ্লিষ্ট নদ-নদী ও রাজধানী উপকন্ঠে বসবাসরতদের জন্য মারাত্নক বিপদের কারণ হয়ে উঠেছে। বর্জ্য দূষণে একদিকে ঢাকা সংলগ্ন নদ-নদীর পানি বিবর্ণ হয়ে উঠেছে, নদী মরে যাচ্ছে; অন্যদিকে রাজধানীর চারধারে বাসিন্দারা বর্জ্য বিষাক্ততায় জর্জরিত। সঙ্গত কারণে শিল্পকারখানার বর্জ্য মহা উদ্বেগের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের নৌপথ ব্যবসা·বাণিজ্য ও নানা যোগাযোগের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তুলনামূলক সড়ক পথের চেয়ে নৌপথে চলাচল অনেকটাই কম ব্যয়বহুল ও অর্থ সাশ্রয়ী। এ কারণে ব্যবসায়ীদের জন্য নৌপথে মালামাল পরিবহন অনেক সুবিধাজনক ও গ্রহণীয়। দেশের নদ·নদী এবং নৌপথ এখন মহাদুর্দশাগ্রস্ত। অথচ এ দিকটি রাষ্ট্র কর্তৃপক্ষের কাছে বড়ই উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। অনেক নদী মরে যাচ্ছে, নদী মরে যাওয়ার কারণে কৃষি উৎপাদনেও বিপর্যয় নেমে এসেছে। এ মহাদুর্বিষহ পথে চলে যাচ্ছে নদী মাতৃক বাংলাদেশ। এ অবস্থা থেকে রক্ষায় দায়িত্ব নিতে হবে রাষ্ট্রেরই। অন্যথায় ভবিষ্যতে দুর্যোগময় হয়ে পড়াটাই শিরোধার্য হয়ে পড়বে। রাজধানী ঢাকা সংশ্লিষ্ট নদ·নদীর দিকে দৃষ্টি দিলেই দেশের নদ·নদীর দুরবস্থার চিত্রটি অনুধাবন সম্ভব। ঢাকার পাশ দিয়ে প্রবাহিত এককালের ঐতিহ্যবাহী বালু নদী এখন মারাগাঙ, জানা যায় সুদীর্ঘ ৩০ বছর যাবত এ নদীটির নাব্যতাহানি ঘটে চলেছে। বালু এখন মানুষের কল্যাণে নয় বর্তমানে বিস্তীর্ণ এলাকার বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য অভিশাপের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। নৌপথ সচল রাখতে যে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও আভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের সময়োচিত যে ড্রেজিং পদক্ষেপ দরকার, তা এখানে নেই। ফলে বালু এখন মরা নদী। যে নদী অচলাবস্থায় পতিত হওয়ার কারণে ব্যাপকভাবে পানি দূষণ ছড়িয়ে পড়েছে। এতে একদিকে যেমন পরিবেশ দূষিত হয়ে পড়ছে, ঠিক তেমনি ফসলহানিতার ভয়াবহ পরিস্থিতির উদ্ভব রয়েছে। নদী তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকার আবাদযোগ্য ফসলের মাঠ·অনাবাদি পড়ে থাকার দশায় পতিত হয়েছে। এককালের প্রচণ্ড খরস্রোতা বালু এখন শীর্ণকায়। বছরের ৬/৭ মাসই যেখানে পানি শূন্যতা বিরাজমান থাকে। বর্ষায় অব্যাহত পানি প্রবাহর পর পানি নেমে গেলে প্রায় শুকিয়ে যাওয়া বালু নদীর ভয়াবহ দূষণে দুই তীরের বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবনধারায় নেমে আসে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ। বর্ষাকালের রেশ ধরে বছরের ৬ মাস শীতলক্ষ্যা নদীর ডেমরা এলাকা থেকে উজানে টঙ্গী পর্যন্ত ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নৌপথে আন্তঃজেলা নৌ·পরিবহন ব্যবস্থা সচল থাকলেও পরবর্তী ৬ মাস শুকিয়ে যাওয়া এই নদী পথে নৌ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ফলে হাজার হাজার ব্যবসায়ী, জেলে পরিবার, মাঝি·মাল্লা ও শ্রমিক কর্মীহীন হয়ে বেকারত্বের অভিশাপে মানবেতর জীবন কাটাতে বাধ্য হয়। শুস্ক মৌসুমে টঙ্গীর শিল্পকারখানার পরিত্যক্ত রাসায়নিক বর্জ্য বালু নদীকে বিষাক্ত রঙিন পানির রিজার্ভারে পরিণত করে। এই বিষাক্ত পানির বিরূপ প্রতিক্রিয়াকে ৬ মাস নদীতে বিরাজমান, মৎস্য শূন্যতার মাঝে নদী তীরবর্তী শত শত জেলে পরিবার পেশাচ্যুত হয়ে পড়ে। ভয়াবহ পানি দূষণের কারণেই বালু নদীর উজানে গাজীপুর জেলার একমাত্র বোরো উতপাদনের বৃহত্তর বেলাই বিলে জোয়ারের পানি সরবরাহের অভাবে প্রতি বছরই প্রায় ১৪/১৫ হাজার একর জমির বোরো উতপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এ ছাড়া দূষিত পানি ব্যবহারে চর্মরোগেরও প্রাদর্ভাব ঘটে। কেবল যে বালু নদীর এই দুরবস্থা তা নয়, ঢাকার পার্শ্ববর্তী বুড়িগঙ্গা এবং শীতলক্ষ্যার অবয়বও এখন অনেকেটা বালু নদীর মতোই। একদিকে পানি দূষিত হয়ে পড়ছে, অন্যদিকে নদী ভরাট হয়ে যাচ্ছে। দেশের অনেক নদীর অবস্থাই এখন দুর্দশাগ্রস্ত। এসবের দিকে নজর দেওয়া জরুরি হলেও দায়িত্বশীলরা এ ব্যাপারে আশ্চর্য রকমের উদাসীন। আর এই অবহেলা ও উদাসীনতায় নদী মাতৃক বাংলাদেশ আপন ঐতিহ্য হারিয়ে আজ মহা দুর্বিপাকের পথে ধাবিত। রাজধানীর উপকন্ঠে অবস্থিত এলাকাগুলো শিল্পকারখানার বর্জ্যে ক্রমেই বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। যেমন রাজধানীর উপকন্ঠ সাভারের বিস্তৃত এলাকায় গড়ে উঠেছে প্রচুর কলকারখানা। ভৌগোলিক অবস্থানগত ÷রুত্ব, অনুকূল ভূপ্রকৃতিগত অবকাঠামো এবং রাজধানী ঢাকার সন্নিকটে হওয়ায় সাভারে সরকারি·বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হওয়ার পাশাপাশি দ্রুতগতিতে প্রচুর শিল্প কারখানা গড়ে উঠেছে। কিন্তু এসব কলকারখানা প্রতিষ্ঠার সময় কোনও প্রকার পরিকল্পনাকেই অনুসরণ করা হয়নি। সম্ভবত কেউ বিষয়টি নিয়ে মোটেও ভাবেননি। বরং উদ্যোক্তারা তাদের ইচ্ছা এবং সুবিধামতো পরিবেশ দূষণের কথা বিবেচনায় না এনেই যেখানে সেখানে গড়ে তুলেছে শিল্পকারখানা। এমনকি আবাসিক এলাকার মধ্যেও এ রকম অনেক শিল্প কারখানা গড়ে তোলা হয়েছে। যার ফলাফলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে। জীবন হয়ে পড়েছে হুমকির সম্মুখীন। এক দুর্বিষহ জীবন যাপন করতে হচ্ছে সাভারের বাসিন্দাদের। নিঃসন্দেহে এমন পরিবেশ উদ্বেগজনক। আর সঙ্গত কারণেই এমন দুঃসহ পরিবেশ থেকে মানুষকে মুক্তিদানে উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। জানা যায়, সাভারে বিভিন্ন কলকারখানা থেকে নির্গত তরল বিষাক্ত বর্জ্য দূষণে সাভার উপজেলার পৌর এলাকাসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের ৩৫টি গ্রামের প্রায় সাড়ে ৫ হাজার একর বোরো ও রোপা আমন চাষের জমির ঊর্বরতা ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। এছাড়া ৫ হাজার একর মতস্য বিচরণ এলাকা এবং ২ হাজার একর পানি সম্পদ এলাকা আজ ধ্বংসের মুখোমুখি। জানা যায়, এমন সমস্যার উদ্ভব হওয়ায় এই বর্জ্য দূষণজনিত সমস্যা থেকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অন্তত ২০ হাজার কৃষক পরিবার। এছাড়াও কল·কারখানার আশপাশের জলাশয়ের দূষিত পানিতে শাকসবজি, তরিতরকারি ইত্যাদি ধৌত করায় বৃহত জনস্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এখানে আরেকটি উদ্বেগজনক সংবাদ এই যে, রাজধানীর মানুষ প্রতিদিন যে শাকসবজি ও তরিতরকারি ক্রয় করে থাকে, তার একটি বড় অংশই সরবরাহ হয় সাভার থেকে। বলা যায়, অনিচ্ছা সত্ত্বেও এবং অনেকটা অজ্ঞাতসারেও রাজধানীর মানুষ সাভারের বর্জ্য দূষিত এলাকায় উতপাদিত বিষাক্ত শাকসবজি ক্রয় করে থাকে। সাভারের দূষণগত এ সমস্যা যে খুবই সঠিক তাতে সন্দেহ নেই। কারণ সাভার উপজেলা কৃষি অফিসও জরিপের মাধ্যমে এ বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে। আজ দেশব্যাপী যে উচ্ছেদ অভিযান চলছে, অপরিকল্পিত কলকারখানা এই অভিযানের আওতায় নিয়ে আসা জরুরি বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। জানা যায়, সাভারের ইপিজেডসহ প্রায় অর্ধশত টেক্সটাইল মিল ও ডায়িং, স্পিনিং কারখানা থেকে রাসায়নিক মিশ্রিত গাঢ় কালো ও বে÷নি রঙের দূষিত তরল বর্জ্য অবাধে ভূমিতে ও নদীতে ফেলা হচ্ছে। আর তা ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে এবং পরিবেশ হয়ে পড়ছে দূষিত। নদী ও জলাশয়ের পানি বিষাক্ত হওয়ায় সেচের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। ডিইপিজেডের সকল ফ্যাক্টরির রাসায়নিক বর্জ্য পেছন দিক থেকে নির্গত হয়ে তা সরাসরি আবাদি জমিতে পড়ছে। এতে ফলজ বৃক্ষেরও মারাত্নক ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। পরিবেশ ভাবুকরা মনে করছেন দীর্ঘদিন ধরে বর্জ্য দূষণের কারণ মাটির নিম্নস্তরের পানিও দূষিত হয়ে পড়তে পারে। অদূর ভবিষ্যতে মাটির উর্বর শক্তি ধ্বংস, মতস্য সম্পদ বিলুপ্ত এবং বিশুদ্ধ পানীয় জলের অভাব দেখা দিতে পারে। বর্জ্য দূষণের এমন আলামত যে কেবল সাভারেই সীমাবদ্ধ তা নয়। ঢাকার চারপাশ জুড়েই বিরাজ করছে এমন ভয়াবহ পরিবেশ। কোথাও কোথাও ইটেরভাটার কারণে পরিবেশ বিবর্ণ হয়ে গেছে। দীর্ঘদিন ধরেই পরিবেশের এই দুরবস্থা বিরাজিত থাকলেও এ ব্যাপারে দায়িত্বশীল মহল অবাক রকমের নিশ্চুপ। অথচ পরিবেশকে বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচাতে সরব হওয়ার গত্যন্তর নেই। মন্তব্যগুলো (0)
![]() মন্তব্য লিখুন
|
|
| সর্বশেষ আপডেট ( Friday, 09 March 2007 ) |
| < পূর্বে | পরে > |
|---|