| বন সংহার এবং বনভূমির সংকোচন |
|
|
| লিখেছেন ইত্তেফাক সম্পাদকীয় | |
| Friday, 06 April 2007 | |
|
ঢাকা ৫ এপ্রিল ২০০৭: সিলেট বন বিভাগের ১৩টি রেঞ্জের প্রায়
সবখানে এখন চোখে পড়ে শুধু
ঝোপঝাড়। আর এইসব ঝোপজঙ্গলে
আগাছার রাজত্ব। মূল্যবান
বৃক্ষ বিরল। গত
মঙ্গলবার এতদসংক্রান্ত
একটি রিপোর্ট ছাপা হইয়াছে
পত্রিকান্তরে। রিপোর্টে
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বন
সংহারের যে চিত্র তুলিয়া ধরা
হইয়াছে, তাহা
পাঠ করিয়া যে কেহ স্তম্ভিতবোধ
করিবেন, ইহাই
স্বাভাবিক। আমাদের দেশে
নির্বিচারে বৃক্ষনিধন
প্রক্রিয়া আগে হইতে শুরু
হইলেও, প্রকাশিত
রিপোর্ট অনুযায়ী সাম্প্রতিক
বছরগুলিতে যেইরূপ কাণ্ড
ঘটিয়াছে, তাহার
কোনো জবাব নাই। এক রাজাকান্দি
বন রেঞ্জেরই নাকি ২ লাখ ঘনফুট
সেগুনকাঠ বিক্রি করিয়া দেওয়া
হইয়াছে অবৈধ পন্থায়। হোম
পারমিটের নামে কাঠচোরদের
সুযোগ করিয়া দেওয়া হইয়াছিল
মূল্যবান সব গাছ কাটিয়া নিবার।
খবর পড়িয়া বোঝা যায়,
কাঠচোরদের সঙ্গে
দায়িত্বপ্রাপ্ত বনবিভাগীয়
কর্মকর্তাদের কাহারো কাহোরা
গড়িয়া উঠিয়াছিলো মাস্তুতো
ভাই রূপ সখ্য। পরিণতিতে সিলেটের
বনরাজি উজাড় হইয়াছে। শুধু
তাহাই নহে, নূতন
করিয়া বনসৃজনের কর্মসূচিও
ভণ্ডুল হইয়াছে। খালি জায়গায়
গাছের চারা লাগাইবার পরিবর্তে
এইখাতে বরাদ্দ টাকা মারিয়া
দেওয়া হইয়াছে বলিয়া অভিযোগ।
মোটকথা, সিলেটে
বন যাহা ছিলো,
তাহার এক বিরাট
অংশ তো শেষ করা হইয়াছে,
উপরনৱু বনের
ভবিষ্যতও ঝরঝরা করিয়া দেওয়া
হইয়াছে।
সরকারী সংরক্ষিত বন ধ্বংসের উপরোক্তরূপ কাণ্ড যে কেবল সিলেট বিভাগেই সীমাবদ্ধ, তাহা অবশ্য নহে।বনখাতক দুরাচারীরা শুধু বৃক্ষনিধন করিয়া ক্ষ্যান্ত নয়, ইহারা অনেক ক্ষেত্রে দখল করিয়া নিয়াছে হাজার হাজার হেক্টর বনভূমি। নানা কৌশলে বনের জায়গা দখল করিয়া জঙ্গল সাফ করিয়া গড়িয়া তোলা হইয়াছে ইমারত, বাড়িঘর। কোনো কোনো ক্ষেত্রে হইয়াছে শিল্প কারখানা। গত ডিসেম্বরে প্রকাশিত একটি সহযোগী দৈনিকের রিপোর্টে বলা হয়, মাত্র তিন বৎসরে দেশের চারটি বনবিভাগের কমপক্ষে ৩ হাজার হেক্টর ভূমি বেদখল হইয়া গিয়াছে। ইহার মধ্যে ময়মনসিংহ বনবিভাগের ১ হাজার হেক্টর, সিলেট বিভাগের ২ হাজার হেক্টর এবং ঢাকা বনবিভাগের ১শত হেক্টর জমি বেহাত হইয়া গিয়াছে। গাজীপুর চৌরাস্তা হইতে ভালুকা চৌরাস্তা পর্যন্ত এই যাবৎ প্রায় ৪ হাজার একর বনভূমি দখলদাররা গ্রাস করিয়া নিয়াছে বলিয়া জানা যায়। এই প্রক্রিয়ায় সংকীর্ণ হইয়া আসিয়াছে সংরক্ষিত বনের আয়তন। অন্যদিকে, অবশিষ্ট বন যাহা রহিয়াছে, তাহাও উজাড় হইয়া গিয়াছে বিরামবিহীনভাবে বৃক্ষ কর্তনের ফলে।
প্রসঙ্গত এইখানে উলেস্নখ করা বাঞ্ছনীয় যে, বাংলাদেশে এক্ষণে কতটুকু বনাঞ্চল আছে, তাহা নিশ্চিত করিয়া বলা কঠিন। এক হিসাব হইতে জানা যায়, অশ্রেণীবদ্ধ বনাঞ্চলসহ বাংলাদেশে সরকার নিয়ন্ত্রিত বনভূমির মোট আয়তন ২২ লাখ ৪২ হাজার হেক্টর। কিন্তু এই বিপুলায়তন বনভূমির সামান্যই এখন যথার্থ বনাচ্ছাদিত। বেশীর ভাগটাই বৃক্ষ-পল্লবহীন হইয়া পড়িয়াছে। স্বাধীনতা উত্তরকালে ৩৬ বৎসরে প্রতিবৎসর গড়ে ২.১ শতাংশ হারে বনাঞ্চল ধ্বংস হইয়া যাইতেছে বলিয়া বিভিন্ন তথ্যসূত্রে প্রকাশ। ১৯৭৮ সালে ইউনেস্কো এবং এশীয় উন্নযন ব্যাংক কর্তৃক পরিচালিত জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশে মোট আয়তনের মাত্র ১০ শতাংশ বনভূমি রহিয়াছে। কিন্তু বর্তমানে বনভূমির আনুপাতিক হার কমিয়া দাঁড়াইয়াছে ৬.৯ শতাংশে। তাহার মানে এক্ষণে বন আচ্ছাদিত ভূমির আয়তন মাত্র ১০ লাখ হেক্টর। গত দশ-পনের বৎসরের ব্যবধানে বনাঞ্চল কমিয়া আসিয়াছে অর্ধেকেরও বেশী। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং ইউএনইপির দেওয়া হিসাব অনুযায়ী প্রতিবৎসর গড়ে ০.৮৩ শতাংশ হারে বনভূমি হ্রাস পাইতেছে। বর্তমানে এইদেশে মাথাপিছু বনভূমির আয়তন মাত্র ০.০২ শতাংশ। বিশ্বে ইহাই সর্বনিম্ন।
বিদ্যমান এই পরিস্থিতি বাস্তবিকই উদ্বেগজনক। যাহাদের যোগসাজশে দেশের সর্বত্র সংরৰিত বন নিঃশেষ হইতে বসিয়াছে তাহাদের সামাল দেওয়া একান্ত প্রয়োজন। সংরক্ষিত বনভূমির যে বিপুল অংশ বেদখল হইয়া গিয়াছে, তাহা পুনরুদ্ধার যেমন প্রয়োজন, তেমনই পতিত বনভূমিতে নূতন করিয়া বনসৃজন করা দরকার। পরিবেশের ভারসাম্য রৰার জন্য বন প্রয়োজন। সম্পদ হিসাবেও ইহার গুরুত্ব কম নহে। বিষয়টির প্রতি আমরা সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কার্যকর দৃষ্টি আকর্ষণ করি। মন্তব্যগুলো (0)
![]() মন্তব্য লিখুন
|
|
| সর্বশেষ আপডেট ( Friday, 06 April 2007 ) |
| < পূর্বে | পরে > |
|---|