| বাংলাদেশের পাখি ও পরিবেশ |
|
|
| লিখেছেন Dr. Md. Redwanur Rahman | |
| Sunday, 11 February 2007 | |
|
সৃষ্টির শুরু থেকে বিবর্তনের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর পরিবেশে সৃষ্টি হয়েছে সুপরিকল্পিত ভারসাম্য৷ প্রাণী আর উদ্ভিদ, নাইট্রোজেন চক্র এবং খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল৷ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য উদ্ভিদ ও প্রাণী তাদের নিজ নিজ অবস্থানে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে৷ কোনো একটি প্রজাতি যদি কোনো কারণে বিলুপ্ত হয় তবে অন্য প্রজাতির সংখ্যা বেড়ে যায় বিপজ্জনকভাবে৷ চায়নায় ক্ষেতের শস্য রক্ষার জন্য দেশব্যাপী চড়–ই পাখি ধ্বংসের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল৷ কিন্তু দেখা গেল চড়ুই ধ্বংস হওয়ার ফলে কীট-পতঙ্গের সংখ্যা বেড়েছে অপ্রত্যাশিতভাবে আরো ধ্বংস হচ্ছে বিপুল পরিমাণ শস্য৷ তখনই প্রকৃতিতে পাখির গুরুত্ব উপলব্ধি করলো পরিবেশবিদরা৷ আমাদের পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হলো পাখি৷ যে পাখি তার নিজস্ব ভুবন থেকে পরিবেশের সেবা করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত৷ পরিবেশের এই গুরুত্বপূর্ণ অংশটিকে নিয়ে আজকের পাখি বিষয়ক প্রবন্ধ লেখার একটি ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা৷ পাখি নিয়ে জাতীয় পত্রিকা থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের জার্নালগুলোতে কিছু না কিছু লেখা আসে৷ পাখিদের নিয়ে বহু কিংবদন্তির গল্প রচিত হয়েছে৷ বিজ্ঞানীরা পাখির বৈচিত্র্য এবং রহস্যময় ভূমিকা নিয়ে রচনা করেছেন অসংখ্য বিজ্ঞান গ্রন্থ৷ পাখিদের নিয়ে গবেষণা এবং সংরক্ষণ কবে শুরু হয়েছিল তার চুলচেরা সময়ও বিজ্ঞানীরা আজো বের করতে পারেননি৷ বিজ্ঞানীরা যখন দেখলেন এদের সঙ্গে আমাদের পরিবেশের কি নিবিড় সম্পর্ক এবং কতোই না মধুর আমাদের পাখির জগৎ তখনই দৃষ্টি আকর্ষণ করলো৷ জীব বৈচিত্র্য বা Biodiversity নিয়ে সাম্প্রতিককালের জাতিসংঘ থেকে শুরু করে ছোট বড় সব দেশেই সর্বস্তরের জনগণের মধ্যে বেশ তোলপাড় চলছে৷ উদ্ভিদ ও প্রাণী বিলীন হতে শুরু করেছে৷ মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে উদ্ভিদ ও প্রাণী বিলীন হয়ে একাধিক খাদ্যচক্র ভেঙে যাচ্ছে এবং পরিবেশ বিপর্যয়ের সৃষ্টি হচ্ছে৷ পৃথিবীতে প্রাণী মাত্রই একে অপরের ওপর নির্ভরশীল৷ পরিবেশ সংরক্ষণে পাখিদের গুরুত্ব অপরিসীম৷ পৃথিবীতে পাখির প্রজাতির সংখ্য প্রায় ৮,৬০০ থেকে ৯,০০০ বলে পাখি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন৷ বাংলাদেশ, ইনডিয়া এবং পাকিস্তানে পাখির প্রজাতির সংখ্যা ১,২০০ (সলীম আলী ও রিপল ১৯৬৮-৭৪)৷ বাংলাদেশে পাখির প্রজাতির সংখ্যা ৫২০ ( জাকির হোসেন, ১৯৭৯) এবং Wild Life of Bangladesh A Cheek List বইটিতে ড. আলি রেজা খান ১৯৮২ সালে ৫৮০টি প্রজাতির কথা উল্লেখ করেন৷ পরে আরো ১৫টি প্রজাতি বাংলাদেশে দেখা গেছে (Thompson et al.1994)৷ সর্বসাকুল্যে প্রজাতির সংখ্যা ৬০০টি৷ কিন্তু আজ অধিকাংশ পাখিই চোখে পড়ে না৷ বিপন্ন বা বিলুপ্ত প্রায় পক্ষিকুলের মধ্যে ময়ূর মথুরা, কাঠমৌর, কাঠঠোকরা, পুটিয়ালধনেশ, রাজধনেশ, পাকড়াধনেশ, ময়না, বালিহাস, নাকতা, ঈগল, জলাতিতির, কালোতিতির, রাজশকুন, তোতাচনচু, মনিপুরি কয়েল, পাহাড়ি নীলকণ্ঠ, প্যাঙ্গা এবং হাড়গিলাসহ প্রায় ২৭ প্রজাতির পাখি৷ আমাদের দেশে যে সব পাখি চোখে পড়ে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পানকৌড়ি, বক, চিল, শকুন, ডাহুক, কামেল, পিপি, কবুতর, গাংচিল, ঘুঘু, টিয়া বুলবুলি, কোকিল, ভূতুম, মাছরাঙ্গা, কাঠঠোকরা, আবাবিল, ফিঙ্গে, শালিক, কাক, ফটিকজল, সাতভাই, টুনটুনি, দোয়েল, ফুলঝুরি, মৌচুষি, চড়–ই, বাবুই, মুনিয়াসহ প্রভৃতি৷ বিশ্ববিখ্যাত জীববিজ্ঞানী ও পক্ষীবিদ পরলোকগত স্যার জুলিয়াত হ্যাক্সলি বলেছেন, ‘যাযাবর পাখিদের দূরপাল্লার পাড়ি প্রকৃতি জগতের এক অন্যতম রহস্য’ যাযাবর পাখিদের মধ্যে গোল্ডেন গ্লোভারকে শ্রেষ্ঠ উড়ালবাজ হিসেবে ধরা হয়৷ আলাস্কা থেকে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ পর্যন্ত একটানা ২ হাজার ৪শ মাইল পথ অতিক্রম করে কোনো বিশ্রাম না নিয়ে৷ কোনো কোনো পাখি আছে যারা সর্বোচ্চ উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু, আবার দক্ষিণ মেরু থেকে উত্তর মেরুতে যাতায়াত করে৷ উত্তর মেরুতে যখন শীতকাল তখন যায় দক্ষিণ মেরুতে, আর দক্ষিণ মেরুতে যখন শীতকাল তখন যায় উত্তর মেরুতে৷ একবার যেতে সময় লাগে তিন মাস এবং আসতে তিনমাস এভাবে জীবনের অর্ধেক সময় কাটে উড়ে আর অর্ধেক সময় বরফে৷ পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ পাখা বিশিষ্ট পাখি অ্যালবাট্রাস, এদের ঠোট থেকে পা পর্যন্ত এক মিটার না হলেও পাখার দৈর্ঘ্য প্রায় ১১ মিটার৷ মাত্র ৬ দিনে প্রায় ৪ হাজার মাইল পাড়ি দেয় এই অ্যালবাট্রাস৷ রোমান সাম্রাজ্যের অধিপতি দ্বিতীয় ফ্রেডরিক ১২৪৫ সালে শিকার সম্পর্কিত একটি বই লিখেছেন৷ আর এই বইয়ের ১১টি অধ্যায় জুড়ে রয়েছে দেশান্তরী পাখির স্বভাব ও চরিত্র সম্পর্কে নানা কথা৷ বিশ্বের ৭ শতাংশ এবং এ উপমহাদেশের ৫০ শতাংশ পাখি আমাদের বাংলাদেশে রয়েছে৷ যাযাবর পাখিদের আমরা অতিথি পাখি বলে থাকি৷ আসলে এরা অতিথি নয়৷ এরা আমাদের পরিবারের এবং পরিবেশের অংশ৷ এই অতিথি বন্ধুরা বিশেষ করে সাইবেরিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং ইনডিয়ার পাহাড়ি অঞ্চল থেকে আসে৷ ঢাকা মিরপুর চিড়িয়াখানা, জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটির লেক, পদ্মার পাড়, টেকনাফ, সেন্টমার্টিন্স, কক্সবাজারসহ বিভিন্ন উপকূলীয় অঞ্চল, জামালপুর, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ ও সিলেটসহ বিভিন্ন অঞ্চলের বিল, ঝিল ও হাওর-বাওড় এলাকায় বেশি পরিমাণে অতিথি পাখি দেখা যায়৷ পরিবেশগত কারণ যেমন-অতিরিক্ত শীত, বৃষ্টিপাত, আবহাওয়া চাপ, খাদ্যের অভাব, দিনের আলোর অপর্যাপ্ততায় হরমোন দ্বারা উদ্দীপিত হয়ে অতিথিরা আমাদের দেশে আসে৷ আমাদের দেশে ২৪০ প্রজাতির মতো অতিথি পাখি বা শীতের পাখি আসে৷ তার মধ্যে বুবি সারস বক খঞ্জন, কাদা খোঁচা, গাঙ্গ-কবুতর, টনি এবং ২০ প্রজাতির হাঁস উল্লেখযোগ্য৷ হাঁসগুলোর মধ্যে বাচা হাঁস, হলদে হাঁস, হলদে সিথি হাঁস, ছোট সরালি হাঁস, বড় সরালি হাঁস, বৈকাল হাঁস, লেনজা হাঁস, বালি হাঁস, রাঙ্গাঝুটি হাঁস, নীলশির হাঁস, খোপা হাঁস, শিখাযুক্ত হাঁস, সাদা আখি হাঁস, ভূতি হাঁস, পিয়ং হাঁস, কালো হাঁস, ভাদি হাঁস, পাতারি হাঁস, ধূসর রাজ হাঁস, নীলফাখা রাজ হাঁস, চকাচকী, খুন্তে হাঁস এবং সাচকা উল্লেখযোগ্য৷ অতিথি পাখিদের এক বিশাল সংখ্যক পতঙ্গভুখ৷ শীতের অতিথিরা আমাদের দেশে সাত আট মাস অবস্থান করে৷ এ সময় তাদের বিষ্টা হাওর-বাওড়, বিল, ঝিল ও মাটিতে জমা হয়ে এ দেশের মাটিকে ফসফরাস ও ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ করে তোলে এবং জৈব সার হিসেবে কাজ করে, যা মাছের জন্য অত্যন্ত জরুরি৷ এসব পাখি শীতের আমেজ সৌন্দর্য ও কলকাকলিতে বাংলাকে অপরূপ করে পর্যটকদের মনে নৈসর্গিক আবেগের সঞ্চার ঘটায়৷ বর্তমানে বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতা বৃদ্ধি, সবুজ বৃক্ষরাজির ধ্বংস পক্ষীকুলের উপযোগী পরিবেশ ধ্বংস হওয়ায় ৪০০ প্রজাতির পাখি ইতিমধ্যে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন Thomas E. Lovejoy, ১৯৯৩ সালে In Praise of Biodiversity; In Environment the Next Frontier: Searching for a Sustainable Future নামক বিখ্যাত গ্রন্থে৷ উক্ত গ্রন্থে তিনি আরো উল্লেখ করেছেন যে প্রতিদিন প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে অবিরত সংগ্রাম করে একটি করে প্রজাতির প্রাণী বিলুপ্ত হচ্ছে৷ পক্ষী নিয়ে গবেষণা আমাদের দেশে তেমন একটা হয় না৷ রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষণে ব্যবস্থাও নেই৷ শুধু পাখির কয়েকটি জরিপ সম্পূর্ণ হয়েছে এবং হারিয়ে যাওয়া পাখিদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে কিন্তু তাদের রক্ষার কোনো ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি৷ রাষ্ট্রীয়ভাবে পাখি শিকার এবং সংরক্ষণের আইন বইয়ের পাতায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শোভাবর্ধন করেছে কিন্তু বাস্তবে উল্টো৷ পাখিদের উপকারের কথা বলে শেষ করা দুরূহ৷ খাদ্যের উৎসাহ হিসেবে পাখি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ৷ পাখিরা ইঁদুর এবং অন্যান্য কীটপতঙ্গ খেয়ে আমাদের উপকার করছে এবং একইসঙ্গে নোংরা আবর্জনা খেয়ে আমাদের পরিবেশকে পরিচ্ছন্ন করে দিচ্ছে৷ পাখিরা পরিবেশের ঝাড়ুদার৷ উদ্ভিদ এবং পাখির মধ্যে রয়েছে একটা নিবিড় সম্পর্ক৷ পরাগায়ন ও বনায়নে পাখির একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে৷ ছোট ছোট পাখি যখন এক ফুল থেকে অন্য ফুলে যায় তখন পালকে সে ফুলের পরাগ রেণু মেখে নেয়৷ এভাবে পরাগায়ন হয়ে ফুল থেকে ফল হয়৷ বট ও ডুমুরের বৃক্ষের বীজ পাখির পরিপাকনালিতে না গেলে অঙ্কুরোদ্গম হয় না৷ আর পাখিদের সাহায্যে দূর-দূরান্তের গাছের বীজ চলে আসে নতুন জায়গাতে৷ দেশি পাখিদের গুণাগুণ বিচার করলে প্রথমে আসে পতঙ্গভুক৷ ফিঙ্গে সবচেয়ে বেশি পোকা খায়৷ পাখি চাষীদের বন্ধু৷ কাক, শকুন, চিল এদের প্রকৃতির ঝাড়ুদার বলা হয়৷ মানুষের পরিবেশকে দুর্গন্ধ হতে রক্ষা করে৷ মধুচুরি, ফুলচুষি, টুনটুনি, মধুকুয়া, ফটিকজল এবং বুলবুলি ফুলের পরাগায়ন ঘটায়৷ এক কথায় পাখিরা পরিবেশের মহাকল্যাণে প্রতিনিয়ত ব্যস্ত রয়েছে৷ পাখিরা বন-বনানীর পরিচর্যায় চিকিৎসক ও সেবিকা৷ এখনো গ্রামে-গঞ্জে নারীরা রুমালে সুই-সুতা দিয়ে সুন্দর করে টিয়া পাখি অঙ্কন করে নিচে সুতা দিয়ে লিখে, ‘যাও পাখি বলো তারে সে যেন ভোলে না মোরে’৷ অনেক মানুষই পাখিকে উপমা হিসেবে ব্যবহার করে গান লিখেছেন৷ ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়’, লালন ফকির এই পরান পাখির স্বরূপ জানার জন্য সাধক হয়েছেন৷ ‘বাবুই পাখিরে ডাকি বলিছে চড়াই এই বাবুই-এর কাছে আমরা পেয়েছি শিল্পের প্রেরণা৷ তবে চড়ুইয়ের মতো পরাশ্রয়ী লোকের অভাব আমাদের সমাজে নেই৷ পাখির রাজ্যে ফাঁকিবাজদের দলে পড়ে আমাদের প্রিয় কোকিল, বউ কথা কও, পাপিয়া, চোখ গেল ইত্যাদি৷ ব্যাঙ্গ উপমায় পাখির এবং পাখির ডাকের বেশ সমাদর রয়েছে৷ বাসা তৈরির নৈপুণ্যে টুনটুনি এবং বাবুই পাখিরা অতুলনীয়৷ পাখির সমাজে এই টুনটুনি পাখিদের মতো দক্ষ গৃহনির্মাতা আর নেই বললেই চলে৷ এভাবে অসংখ্য পাখি নিয়ে কাব্যরস প্রবন্ধ প্রবাদ বাক্য উপমা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে৷ আমার ক্ষুদ্র ভাষা জ্ঞানে সবকিছু ফুটিয়ে তোলা সম্ভব নয়৷ তবে হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে পারি মাত্র৷ পাখিরা নিষ্পাপ, নিষ্কলুষ৷ এরা বোঝে না কোনো আইন, মানে না কোনো সীমানা, লাগে না কোনো পাসপোর্ট৷ এরা কোনো জাতির নয়, এরা শুধু পৃথিবীর এবং শুধুই আমাদের৷ এভাবে মানব সৃষ্টির শুরু থেকে পাখি আমাদের কাছে চলে আসছে; শিক্ষা, সাহিত্যে, কাব্যে, গবেষণায়৷ আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সকাল বেলার পাখি হতে চেয়ে লিখেছিলেন: ‘আমি হব সকাল বেলার পাখি খুব ছোটবেলায় এই কবিতাটি যখন মুখস্থ করছিলাম তখন খুবই সাধ জাগতো সকালের পাখির ডাক শোনার, তাই খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে বাড়ির পার্শ্বে ঝোপে গিয়ে গান শোনার জন্য অপেক্ষা করতাম৷ মনের মুকুরে গভীর ভাবনায় হারিয়ে যেতাম পাখির ডাক শুনতে শুনতে৷ পাখি দেখলেই ভীষণ আদর করতে ইচ্ছা করে৷ কতো না সুখে পাখি বাসা বাধে গাছে, ঝোপে, জঙ্গলে, খাল এবং বিলসহ সুউচ্চ পর্বতে এবং ঠোঁটে ঠোঁট লাগিয়ে আদর করে চালায় মধুর গুঞ্জন এবং গড়ে তোলে অতিথি পাখিদের সঙ্গে বন্ধুত্ব৷ কাছে গেলে উড়ে যায়, আকাশে মুক্ত ডানার রঙ্গ ছড়িয়ে, বাতাসে ছন্দ তুলে, গানে গানে সুরের মূর্ছনায় মোহনীয় করে রাখে আমাদের পরিবেশ এবং ধরণী৷ পাখিদের কলকাকলিতে ঘুম ভাঙে এবং কিচিরমিচির ধ্বনিতে সন্ধ্যার আগমন বার্তা জানায়৷ সাহিত্যিকরা যখন দেখলো কতোই না মধুর পাখির জগৎ তখন মনের মাধুরী মিশিয়ে পাখিদের নিয়ে লিখতে শুরু করলো৷ জীবনানন্দ দাসের কবিতায় চড়ুই, কোকিল, পানকৌড়ি এবং ডাহুকের ডাক পাখি প্রেমিকদের মুগ্ধ করেছে৷ প্রকৃতি প্রেমিকেরাও পাখিকে নিয়ে রচনা করেছেন সাহিত্যরস৷ মহাকবি হোমার সারস ও নকুটি পাখির কথা লিখে গেছেন তার ওডেসি কাব্যে৷ মা-বাবা আদর করে সন্তানের নাম রেখেছে ময়না, বুলবুলি, মুনিয়া, পাপিয়া, টুনটুনি আরো কতো কি৷ হ্যাঁ পাখির কাছে অনেক কিছু শিখেছে মানুষ৷ পাখির ওড়া দেখেই আবিষ্কার হয়েছে উড়োজাহাজ৷ বাংলাদেশের এয়ার লাইন্সের বিমানে বলাকার ছবি স্থান পেয়েছে৷ ডাক বিভাগের সূচনা হয় কবুতর থেকেই৷ শান্তির প্রতীক কবুতর তাই আজকাল রাজনৈতিক নেতাদের হাতে শোভা পায়৷ পাখিতে মানুষে যে ভালোবাসা তা পাখিদের কাছে না গেলে বোঝা যায় না৷ কী বিচিত্র পাখি৷ কী মধুর গঠনে তাদের ভিন্নতা৷ কোনোটি লম্বা, কোনোটি বেঁটে এবং কোনোটি চিকন বেঁটে৷ অপূর্ব তাদের রঙ৷ পা-লাল, ঠোট কালো-চ্যাপ্টা, গলায় পুঁথির মালার মতো বেড়ি এবং সব শরীর সাদা কমল পালকে আবৃত৷ অনেক পাখির মাথায় ফুল লাল-কালো ইত্যাদি৷ অপরূপ সাজে পৃথিবীকে সজ্জিত করেছেন স্রষ্টা শুধু আমাদেরই জন্য৷ পাখির ডাকে মেলোডি বা স্বরমাধুর্য রয়েছে৷ যেসব পাখির স্বরযন্ত্র রয়েছে সাধারণত সে পাখিকে গায়ক পাখি বলে৷ শুধু পুরুষ পাখিগুলো গান গাইতে পারে৷ প্রত্যেক পাখির গানের বা স্বরের একটা নিজস্ব অর্থ আছে৷ আমরা যে কারণে কথা বলে থাকি পাখিরাও নিজেদের মধ্যে সে কারণে স্বর বা গান গেয়ে থাকে৷ কোনো কোনো পাখি যেমন ময়না, কাকাতুয়া, তোতা, টিয়া৷ ভিংরাজ অন্য পাখি বা অন্য কারো গান বা স্বর নকল করতে পারে৷ প্রত্যেক ধর্মগ্রন্থে পাখিকে মহিমান্বিত করে অনেক কথা এসেছে৷ পবিত্র কুরআনে পাখিকে গুরুত্ব দিয়ে নাজিল হয়েছে বেশকিছু আয়াত৷ আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘ওয়া আরছালা আলাইহীম তাইরান আবাবীল’ (সূরা ফীল, আয়াত-৩)৷ অর্থ ‘তিনি তাদের ওপর প্রেরণ করেছিলেন ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি’৷ আল্লাহতায়ালার নির্দেশে এক ঝাঁক আবাবিল পাখি প্রস্তর খণ্ড পায়ের নখে নিয়ে আকাশে উড়ে বিশাল হস্তি বাহিনীর ওপর নিক্ষেপ করে তৃণের সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছিলেন৷ শত্রুকে দমন এবং পরাস্ত করার জন্য মহান স্রষ্টা তার সৃষ্টি পাখিকে শক্তিশালী হাতির সঙ্গে লড়াইয়ে জয়ী করেছেন৷ সুলায়মান (আঃ)-কে উড়ন্ত পক্ষীকুলের ভাষা আল্লাহ শিক্ষা দিয়েছেন৷ (সুরা আল-নমল, ২০ নাম্বার আয়াত)৷ পাখির মাধ্যমে বহু শিক্ষা আল্লাহতায়ালা জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শনস্বরূপ রেখে দিয়েছেন৷ আল্লাহ নবী-রাসূলের শিক্ষা দিতে গিয়ে পাখিকে শিক্ষণীয় উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করেছেন৷ পাখির ভুবনে পাখি সম্পর্কে জ্ঞান আমার খুবই সীমিত৷ তাছাড়াও আমি কোনো পক্ষীবিশারদ নই তবে পাখির প্রতি আমার গভীর ভালোবাসা রয়েছে৷ তাই ক্ষুদ্র ভাষা জ্ঞান ও স্বল্প জানার পরিধিতে ভালোবাসা প্রকাশ করতে এসে পাখি প্রেমিক সেজে পক্ষীকুলের নিরাপত্তা বাসস্থান এবং পরিবেশ নিয়ে আজ পাখি হারানোর বিরহ ব্যথা অনুভব করছি৷ পরিবেশ বাচাতে হলে পাখিকে বাচাতে হবে৷ পাখি পরিবেশের একটি অংশ৷ পাখি শিকার নিষিদ্ধ হলেও প্রকাশ্যে অনেক পাখি শিকার হচ্ছে৷ বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ (সংশোধিত) আইন, ১৯৭৪-এর অধীনে অবৈধ পাখি শিকারের জন্য শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে৷ তবে এই আইনের কোনো প্রয়োগ নেই৷ ইদানীং শৌখিন শিকারির চেয়ে ব্যবসায়িক শিকারির সংখ্যাও বাড়ছে৷ যে পাখি শীতের ছোবল থেকে বাচতে ছুটে আসে বাংলাদেশে তার সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে- শিকারির জালে অথবা বন্দুকের গুলি সেই পাখিকে আর বাচতে দেয় না৷ যে পাখি এ দেশে এসে দেশীয় পাখিদের সঙ্গে সখ্য গড়ে কপোত-কপোতীর মতো সুখ অনুভব করতো সেই অতিথি পাখি সঙ্গীদের ছেড়ে চলে যাচ্ছে৷ সঙ্গীদের রক্তাক্ত দেহ দেখে ওই অতিথি কি আর ফিরে আসবে এ দেশে৷ অতিথি পাখির মাংস যেসব ভোজন বিলাসী লোকদের খাবার টেবিলে রসনা জোগাচ্ছে সেসব বিজ্ঞরাই আইন প্রণয়ন করছে৷ বর্তমান মুহূর্তে জরুরি ভিত্তিতে পাখি প্রেমিকদের সারা দেশে ব্যাপক গণসচেতনতা গড়ে তোলা উচিত৷ আমার বিশ্বাস এই আয়োজনটিও গণসচেতনতার একটি অংশ৷ অন্যদিকে গবেষকদের পাখি বিষয়ক গবেষণা প্রকল্প গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি৷ পেশাগত গবেষণার দিকটি ছাড়াও পাখি পর্যবেক্ষণের মতো একটি আনন্দদায়ক অভ্যাস গড়ে তোলা অতীব জরুরি৷ বিজ্ঞান মনস্ক বন্ধু, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ, সরকার প্রধান, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, ছড়াকার, গল্পকার, গীতিকার, কবি এবং সাহিত্যিকসহ সর্বস্তরের জনগণের প্রতি আমার আহবান - আসুন, আমাদের স্বার্থে এবং শুধুই নিজের স্বার্থে পক্ষীকুলকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাচাই৷ (প্রবন্ধটি ২৭ জানুয়ারি রাজশাহী ইউনিভার্সিটির পরিবেশ বিজ্ঞান ইন্সটিটিউট এবং বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘বাংলাদেশের পাখি ও পরিবেশ’ শীর্ষক সেমিনারের মূল প্রবন্ধ হিসেবে উপস্থাপিত)৷ Author: Dr Mohammad Redwanur Rahman Source: The Daily Jaijaidin, February 11, 2007. Slightly edited by Enayetur Raheem. মন্তব্যগুলো (1)
![]() লিখেছেন Bangladesh Wildlife Network (BaWNet), April 02, 2008
Its a nice, compact and informative article. I am requesting the so called wildlife biologists to go through this article and learn how to write such a readable article. Thanks Dr. Redwanur Rahman.
মন্তব্য লিখুন
|
|
| সর্বশেষ আপডেট ( Sunday, 25 February 2007 ) |
| < পূর্বে | পরে > |
|---|