স্বপ্নের শুরু
আর ইউ শিওর?? প্রশ্নটা করেছিলেন সাগর ভাই, ইমরান ভাইকে কোনো এক শীতের সন্ধ্যায়। আমরা বাংলা মোটরের মোড়ে চা খেতে খেতে আড্ডা মারছিলাম, আড্ডার বিষয় ছিলো আমাদের পরবর্তী ভ্রমণ নিয়ে, তখনই বিদ্যুৎ ঝলকের মতো ইমরান ভাই তার আইডিয়াটা আমাদের জানালেন,
তিনি নিরীহ মুখ করে আমাদের জানালেন যে তিনি প্ল্যান করছেন আমাদের পরবর্তী ভ্রমণটা হোক একটু অন্যরকম। আমরা সবাই জানতে চাইলাম অন্যরকমটা কিরকম হবে? তখন তিনি যা বললেন তা শুনে আমাদের কারো কারো চোখ লোভে চকচক করে উঠেছিলো, আবার কারো কারো চোখ ছানাবড়া হয়ে গিয়েছিলো। তাঁর প্লানটা ছিলো কেওক্রাদং যাওয়া হবে, তবে পায়ে হেঁটে নয় আমরা যাবো সাইকেলে চড়ে...... আর সেটা শুনেই সাগর ভাই এর ওই প্রশ্ন (এরমধ্যে জানিয়ে রাখি আমাদের ঘুরে বেড়ানোর দলের নামও কিন্তু কেওক্রাদং) ।
বাস্তবায়নের দরজায় করাঘাত
ওই রাতের পর থেকে আমরা মোটামুটিভাবে জল্পনা কল্পনা শুরু করে দিয়েছি যে সাইকেলে কেওক্রাদং ভ্রমণ ব্যাপারটা কতটুকু উত্তেজনাকর হতে পারে, এরসাথে আমরা যা করেছি তা হলো ঢাকা শহরের কতগুলো সাইকেল মেকারের বিরক্তির কারণ হয়েছি তাদের কাছ থেকে যতটুকু সম্ভব সাইকেল মেরামত করার প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করে। তবে যতই বিরক্তি দেখাক না কেন তারা কিন্তু বেশ ভালোভাবেই মনোযোগ দিয়ে আমাদের সমস্যা শুনতো এবং সমাধান দিতো। যার জন্য একটা বিশাল ধন্যবাদ অবশ্যই তাদের প্রাপ্য। তো মোটামোটি এভাবেই আমদের দিনকাল চলছিলো। যারা যাওয়ার ব্যাপারে সিরিয়াস ছিলাম তাদের মাথায় তো প্রতিদিন সাইকেল সাইকেল রব চলতো, আর প্রতিদিন কে কি শিখলাম বা জানলাম তা এসে উগরে দিতাম বাংলা মোটরের সেই আড্ডায়। এভাবে আমরা এগিয়ে চলেছিলাম আমাদের স্বপ্নের বাস্তবায়নের পথে।
প্রস্তুতি পর্ব
মোটামোটি সাইকেল সম্বন্ধে বিশদ জ্ঞান অর্জন করার পর আমরা আমাদের অভিযানের দিনক্ষণ ঠিক করার চেষ্টা করতে থাকলাম। যেহেতু আমরা সংখ্যায় সাতজন, এবং আমাদের মধ্যে চাকরিজীবি মানুষের সংখ্যাই বেশী তো আমরা কোরবানী ঈদ এর ছুটিটাকেই টার্গেট করলাম। এবং সেই অনুযায়ী আমাদের প্রস্তুতি পর্বও চলতে থাকলো, মোটামুটিভাবে আমরা ঠিক করলাম ঈদের দিন রাতেই শুরু করবো আমাদের অভিযান।
যাত্রা পর্ব
ঈদের দিন রাত ৯.৩০ মিনিট, ঢাকা শহরের রঙীন আলোগুলো ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হচ্ছে আর আমরা সবাই এই শীতের রাতে প্রস্তুতি নিচ্ছি আমাদের অভিযানের। যাই হোক রাত ঠিক ১০.৩০ মিনিটে আমরা আমদের আনুষাঙ্গিক জিনিসপত্র নিয়ে হাজির হলাম কমলাপুরস্থ এস. আলম বাস কাউন্টারে। আমাদের মধ্যে সাইকেল অভিযাত্রী ছিলেন ৫ জন। এবং ২ জন আমরা ছিলাম ব্যাকআপ টিম। সাইক্লিস্ট টিম এর সদস্যরা হলেন ইমরান ভাই, সাগর ভাই, তন্ময়, মুন এবং সালমান। আর ব্যাকআপ টিমে ছিলাম নাযাম ভাই, আমি এবং আমাদের সবার মিলিত প্রেরণা ।
বাস ছাড়বে রাত ১১.১৫ মিনিটে, এরমধ্যে রিফাত ভাই এবং গণী ভাই এসে আমাদের সবাইকে অনুপ্রেরণা দিয়ে গেলেন এবং জানিয়ে গেলেন তাদের আশির্বাদ আমাদের উপর সবসময়ই থাকবে। আমরা আমাদের সাইকেল এবং মালপত্রগুলো বাসে তুলে দিয়ে চা খেতে খেতে আমাদের অভিযান সম্মন্ধে আলোচনা করতে থাকলাম। এবং আমরা এর সাফল্যের ব্যপারে ১০০ ভাগ নিশ্চিত ছিলাম। তবে আমাদের বাসের সহযাত্রীদের ছানাবড়া চোখগুলো মনে থাকবে অনেকদিন.....
শীতের আবেশে ঘুমাতে ঘুমাতে আমরা একসময় কালুরঘাট ব্রিজে আমাদের আবিষ্কার করলাম। ঢুলু ঢুলু চোখে আমরা আবিস্কার করলাম ব্রিজের ছাদে আমাদের একটি সাইকেল আটকে গেছে, ফলশ্রুতিতে বাস আর সামনে আগাচ্ছে না। ওই শীতের রাতে তন্ময় চরম বিরক্তি দেখিয়ে বাসের ছাদে উঠে গেল এবং কাঁপতে কাঁপতে সাইকেল গুলো আবার ঠিক করে বেঁধে এলো। এছাড়া আমাদের আর কোন সমস্যা হয়নি। এবং একসময় আমরা আমাদের বান্দরবান শহরে আবিস্কার করলাম এবং এরসাথে আমরা আরো আবিষ্কার করলাম আমাদের সাইকেল গুলো দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে, তাদের ফিটনেস সার্টিফিকেট হারিয়েছে। যাইহোক আমরা বাস থেকে সাইকেল গুলো নামিয়ে সেখানেই ঠিকঠাক করে ফেল্লাম। এরপর চাঁদের গাড়ির খোঁজে বেড়িয়ে পড়লাম। বান্দরবান থেকে আমাদের যেতে হবে কৈক্ষংঝিরি, সেখান থেকে সাঙ্গু নদী পাড়ি দিয়ে আমরা পৌঁছাবো রুমা বাজার, এবং সেখান থেকেই আমাদের যাত্রা শুরু হবে কেওক্রাদং এর পথে।
যেহেতু ঈদের পরদিন তাই অনেক অভিযাত্রি এসেছেন, কেউ যাবেন কেওক্রাদং, কেউ তাজিনডং, কেউ অন্যকোথাও। কিন্তু সবাইকেই যেহেতু যেতে হবে রুমাবাজার, তো আমরা সবাই মিলে একটা চাদের গাড়ি ঠিক করে ফেল্লাম। বান্দরবানের সুন্দর দৃশ্য দেখতে দেখতে এবং দুঃসাহসিক গল্প শুনতে শুনতে পথচলাটা খুব একটা খারাপ হয়নি। তিনঘন্টা পর বেলা প্রায় ১১.০০ টার দিকে আমরা কৈক্ষংঝিরি এসে পৌঁছলাম। এখান থেকে আমাদের যেতে হবে রুমাবাজার। নৌকায় চড়ে অথবা পায়ে হেঁটে। নৌকার ঘাটে পৌঁছাতেই ওই এলাকার মাঝিরা নৌকার দাম তিন চারগুণ হাঁকতে থাকলো। কারণ আর কিছুই না আমাদের সাইকেলগুলো তাদের যতো মাথা ব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যাই হোক এরমধ্যে আমাদের সাইকেল আরোহিরা ঠিক করলো তারা সাইকেলে চড়েই যাবে। আর আমরা মানে ব্যাকআপ টিমের সদস্যরা নৌকায় করে যাওয়াই স্থির করলাম। নতুন একদল অভিযাত্রিদের সাথে আমরা ঝুলে পড়লাম নৌকায়। তারা সবাই ছিলেন সজ্জন প্রকৃতির চার্টাড আ্যকাউন্ট্যান্ট, সংখ্যায় চারজন (উচিমংদা, জীবনদা, হায়দার ভাই এবং হাজী ভাই) কাজ করছেন অক্সফাম নামক একটি এন.জি. ও তে। প্রথমবারের মতো এসেছেন বান্দরবান। সাঙ্গু নদীর উপর দিয়ে বয়ে চলতে থাকলাম আমরা। আর দেখলাম আধুনিকায়নের নামে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কৃত্রিমতায় বেঁধে ফেলার চেষ্টা চলছে সর্বত্র। এভাবে একসময় আমরা পৌঁছে গেলাম রুমা বাজার। যেখান থেকে আমরা রওয়ানা হবো কেওক্রাদং এর পথে। বেলা বাজে তখন প্রায় ১.০০ টা, আমরা রুমাবাজারে পা রাখার ঠিক পাঁচ মিনিটের মাথায় দেখা পেলাম আমাদের সাইকেল অভিযাত্রীদের। তারা সবাই কাদা বালুতে মাখামাখি, কিন্তু চোখগুলো কিছু করে ফেলার উত্তেজনায় চকচক করছে। "পথ কেমন" সালমানকে এই প্রশ্ন করতেই তার জবাব "চরম, এক্কেবারে ১০০% মজা"। "কখোনো আমি সাইকেলের ঘাড়ে, কখোনো সাইকেল আমার ঘাড়ে", তম্ময়ের জবাব। আর ইমরান ভাই আমাদের জানালেন এভাবেই অভিযান গুলো হয়, সবসময় সাইকেলে চড়তে হবে এমন কোন কথা নেই, আমাদের অভিযানের সাথে সবসময় সাইকেলগুলো থাকলেই সেটা সাইকেল অভিযান হিসেবে গণ্য করা যায়। এভাবে আড্ডার মধ্য দিয়ে হঠাৎ দেখি আমাদের দিকে একটি মোটর সাইকেল এগিয়ে আসছে। মোটর সাইকেলটা পরিচিত লাগতে না লাগতেই আমরা পরিচিত গলা পেয়ে চমকে উঠলাম! ! ! এযে মঞ্জু ভাই, আমরা সবাই হতবম্ব এবং তার রেশ কাটতে না কাটতেই তিনি আমাদের জানালেন তিনি ঢাকা থেকে সারারাত মোটর সাইকেল চালিয়ে পৌছালেন রুমা বাজার শুধু আমাদের সহযাত্রী হওয়ার জন্য। বাহ্ একেবারে সোনায় সোহাগা, আমাদের সঙ্গে এখন একটি যান্ত্রিক সাইকেলও চলে এসেছে। আমরা মোটামোটি ভাবে সাইকেলগুলো মেরামত করে দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য বগালেক। ঠিক হলো পুরো রাস্তা যেহেতু উঁচু নীচু তো আমরা সবাই যতটুকু সম্ভব সাইকেলে চড়বো আর বাকী রাস্তাটা হেঁটে হেঁটে চলবো এভাবে আমাদের একসাথে থাকাও হবে যেটা একটি অভিযানের পূর্ব শর্ত। ঠিক ৩.০০টার দিকে আমরা আমাদের যাত্রা শুরু করলাম। আমরা বগালেক যাওয়ার জন্য বেছে নিয়েছিলাম গাড়ি যাওয়ার রাস্তাটাকে।
অভিযান প্রথম পর্ব (০২.০১.২০০৭)
আমরা বেড়িয়ে পড়লাম, পাহাড়ি উচু নীচু রাস্তা দিয়ে ছুটে চলেছি আমরা সবাই। আমাদের সবার সামনে ছিলেন মঞ্জু ভাই এবং তার পিছেই সাগর ভাই। বেলা ঠিক ৫.০০ টার দিকে আমরা একটি পাহাড়িদের পাড়া পেলাম, যেখানে তাদের কোন একটা উৎসব চলছিলো। সেখানে আমরা হালকা বিশ্রাম নিয়ে শুরু হলো আমাদের পথচলা। বেড়ার ফাঁকে কতগুলো অবাক চোখ আমাদের দিকে চেয়ে ছিলো নিস্পলক। পাগল নাহলে এই পথে সাইকেল দিয়ে কেউ যায়? এই ছিলো তাদের প্রশ্ন। এভাবে হাজারো পলকহীন চোখ পিছে ফেলে আমরা আস্তে আস্তে লোকালয় ছেড়ে জনমানবহীন প্রান্তরে চলে আসতে লাগলাম। আর একটু একটু করে আমাদের চোখে ধরা দিতে থাকলো পাহাড়ি পথের সৌন্দর্য গুলো। আমরা পাহাড়ী সূর্যাস্তের সৌন্দর্য দেখলাম এবং আসতে আসতে শীত জেঁকে বসার আগেই আমরা শীতের কাপড় গুলো পড়ে ফেললাম। আর আমাদের অবিরাম পথচলা শুরু হলো। পথের ক্লান্তি যখন আমাদের গ্রাস করতো তখন পথ দেখাতো আমাদের চাঁদ।
সেই চাঁদের আলো আমাদের নতুন করে পথচলার প্রেরণা যোগাত। কখনো সাইকেল কখনো মোটর সাইকেলে চড়ে অথবা সেগুলো ঠেলে আমরা পথ চলতে থাকলাম। একটা সময় আমাদের সঙ্গে থাকা পানির সবগুলো বোতল শেষ হয়ে গেলো, এবং আমরা পড়লাম মহা বিপদে। পানি শেষ হওয়ার পর আস্তে আস্তে আমাদের শক্তির পরিমাণও কমতে থাকলো। এরমধ্যে মড়ার ওপর খাড়ার ঘায়ের মতো ঘন্টাখানেক পথ চলার পর আমরা আমাদের আবিষ্কার করলাম একটি ৮০ ডিগ্রি ঢাল এর সামনে, পুরো রাস্তা বালুতে পরিপূর্ণ। স্বাভাবিক ভাবে হেঁটে ওঠাই যে রাস্তায় কষ্টকর সেখানে আমাদের উঠতে হবে সাইকেল নিয়ে। শুধু সাইকেল না মোটর সাইকেলও সঙ্গে নেই একফোঁটা পানি। যাই হোক যেভাবে হোক আমাদের তো উঠতে হবেই, কারণ বগালেক ছাড়া সামনে আর কোন লোকালয় নেই। সবাই মিলে হাচরে পাচরে সাইকেল নিয়ে প্রথমে উঠলাম। ওখানে গিয়েই মুন এবং নাযাম ভাই রাস্তার পাশে শুয়ে পড়লো বাকিরা সবাই আবার ওই খাড়া ঢাল বেয়ে নিচে নামলাম এবং পাঁচজন মিলে ঠেলে মোটর সাইকেলটাকে ওপরে ওঠালাম, এরমধ্যে নাযাম ভাই উঠে সামনে কোন লোকালয় এর খোজ পাওয়া যায় কিনা দেখতে গেলো, এবং আমরা সবাই সেই রাস্তার পাশে শুয়ে বসে পড়লাম, বেঁচে থাকার শেষ আশাটুকুও যখন ছেড়ে দিয়েছি তখন নাযাম ভাই এসে উপস্থিত হলো আরো দুজনকে সঙ্গে নিয়ে তারা বললো আর পাঁচ মিনিট হাটলেই বগালেক। এভাবে অমানুষিক শ্রমের মাধ্যমে আমরা রাত ১১.৪০ মিনিটে এসে পৌঁছলাম বগালেক। একটু নিরাপত্তা আর মানুষের সান্নিধ্য যে কতটুকু আরাধ্য হতে পারে বুঝতে পেরেছিলাম সেই রাতে প্রথম। উচিমংদার চীড়া আর গুড় দিয়ে আপ্যায়ন আর লম্বাচুলের হায়দার ভাই এর "ওয়েলকাম টু বগালেক" কথাটা আমাদের নতুন করে বেঁচে ওঠার প্রেরণা দিয়েছিলো এই কথাটা স্বীকার করতে আজ আর কোন দ্বিধা নেই। আর আরও পেয়েছিলাম বগালেককে চাঁদের আলোয় তার অপরুপ সাজে। সবাই ইচ্ছামতো পানি খেয়ে তাড়াতাড়ি হাতমুখ ধুয়ে সাইকেলগুলো ভালো করে বেধে তাঁবু খাটিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।
অভিযান দ্বিতীয় পর্ব (০৩.০১.২০০৭)
যেহেতু গতকাল রাতে আমাদের ওপর দিয়ে অনেক ঝড় গিয়েছে, তাই স্বভাবতই আমরা সবাই ঘুম থেকে উঠলাম একটু দেরি করে। এবং ঘুমথেকে উঠেই আমরা হাজারো প্রশ্নের মুখোমুখি হলাম, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশী যে প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি আমরা হয়েছি সেটা হলো "পাগল নাকি তোমরা? মরতে মরতে বেঁচে ফিরেছ, এভাবে সাইকেল নিয়ে ওই পথ পাড়ি দেয় কেউ? যাই হোক এরকম দুঃসাহস আর দেখাতে যেওনা" ইত্যকার প্রশ্নের। আবার কেউ কেউ আমাদের বাহবা দিচ্ছিল, যা আমাদের সামনের পথগুলোকে এগিয়ে যাবার প্রেরণা দিচ্ছিল। এরমধ্যে আমরা আর্মিক্যাম্পে রিপোর্ট করে নাস্তা খেয়ে নিলাম। বেলা ঠিক ১১.০০ টার দিকে আমাদের পথচলা আবার শুরু {mosimage}হলো। যেহেতু আগের রাতের অভিজ্ঞতা আমাদের ভালো না এবং লারাম বম ভাই আমাদের নিরস্ত্র করলো তাই আমরা মোটর সাইকেল টি রেখে যাওয়াই মনস্থির করলাম। যদিও এতে মঞ্জু ভাই এর মন খারাপ হয়েছিলো সবচেয়ে বেশী। এবার আমরা পায়ে হাটা পথ দিয়েই যাওয়াটা মনস্থির করলাম। ঝিরি গুলো পার হওয়া ছাড়া আমাদের আর তেমন কোন ঝামেলা হয়নি। তবে সেটা খুব সহজ কাজও ছিলো না। একটি ঝিরি তে তো মুন তার সাইকেল নিয়ে পড়ে হাত পা ভেঙে ফেলতে গিয়েছিলো। সাগর ভাই আর মুন দুইবার করে পড়ে গেলেও কোন মেজর ইনজুরি হয়নি। মোটামোটি ভালোভাবেই আমরা দাজিলিং পাড়া পৌঁছালাম বেলা ৫.০০ টায়। সেখানে গিয়ে ওই পাড়ার কারবারির বাড়িতে থাকাটা মনস্থির করলাম। কারবারি আমাদের সম্মানে একটি মোরগ ধরে এনে দিলে সেটা দিয়েই আমরা আমাদের রাতের খাবার খেলাম।
এরমধ্যে আমরা বিশ্রাম নিয়ে মনস্থির করলাম রাতের বেলা আমরা কেওক্রাদং যাবো এবং সেখানেই থাকবো। রাত আনুমানিক ১১.০০ টার সময় আমরা আমাদের যাত্রা শুরু করলাম কেওক্রাদং এর পথে এবং ঠিক ১১.৪০ মিনিটে আমরা উঠলাম কেওক্রাদং এ। রাতে বাংলাদেশের ওপরে বসে আমরা হালকা ক্যাম্প ফায়ার করলাম। এবং সৌন্দর্য কে কৃত্রিমতায় বেধে ফেলার যে অপচেষ্টা শুরু হয়েছে তা দেখে দুঃখ করে ঘুমাতে গেলাম।
অভিযান তৃতীয় পর্ব (০৪.০১.২০০৭)
বেলা আনুমানিক ৮.০০ টার সময় কারবারির ছেলে সরেন এসে আমাদের ঘুম থেকে উঠালো। আমরা আমাদের অভিযানের সবচেয়ে কঠিন অংশের মুখোমুখি আজকে। আজ আমরা সাইকেলে করে কেওক্রাদং থেকে নামবো। এরমধ্যে আমরা আমাদের ব্যাকপ্যাক গুছিয়ে সাইকেলগুলো ঠিকঠাক করে নামা শুরু করলাম এবং এক ঘন্টার মধ্যেই কেওক্রাদং থেকে দার্জিলিং পাড়ায় এসে পৌছালাম। কারবারির বাড়িতে সকালে তাদের ঐতিহ্যবাহী পিঠা বিন্নি চালের ভাত দিয়ে নাস্তা করলাম। এরপর পানি ও অন্যান্য আনুষাঙ্গিক খাবার নিয়ে আমরা আমাদের পথচলা শুরু করলাম। বেলা আনুমানিক ১১.০০ টার সময় আমরা দার্জিলিং পাড়া থেকে রওয়ানা দিলাম, আর আমরা বগালেক পৌছালাম ২.০০ টার সময়। ষেখানে আমরা দুপুরের খাবার খেয়ে আর্মি ক্যাম্প এ রিপোর্ট করে ঠিক করলাম গাড়ি তে করে যাওয়ার। কারণ একে তো সময় কম আর তা ছাড়া সবারই ঢাকায় কাজ আছে তাই এই ব্যবস্থা। বগালেক থেকে ৩.০০ টার সময় রওয়ানা দিয়ে আমরা ৬.০০ টার সময় রুমা বাজার পৌঁছালাম। রুমা বাজার পৌছে হোটেল কেওক্রাদং এ রাতের থাকা নিশ্চিত করলাম। আর রাতে আমরা রান্না করে খেলাম আমাদের আরেক পাহাড়ি বন্ধু পাচুং এর বাসায়। এবার রাতে আমরা আনন্দ উল্লাস করে ঘুমাতে গেলাম আমাদের অভিযান সফল হয়েছে দেখে।
ঘরের টানে পথের বাঁকে
সকাল ৮.০০ টার সময় ঘুম থেকে উঠে আমরা যারা নৌকায় যাবে তারা নৌকায় উঠে গেলাম অন্যান্যরা তাদের দ্বিচক্রযান গুলো নিয়ে বেড়িয়ে পড়লো। আমরা সবাই একসঙ্গে কৈক্ষংঝিরিতে এসে মিলিত হলাম। সেখান থেকে চাঁদের গাড়িতে করে যেতে হবে বান্দরবান শহরে, এবং সেখান থেকে যন্ত্রদানবে চড়ে ঢাকা। যান্ত্রিকতাকে পেছনে ফেলে এই ক'টা দিন আমাদের সবারই খুব ভালো কেটেছিলো। মনে হয়েছিলো একটা নতুন জীবনের স্বাদ পেয়েছি। কোন যান্ত্রিকতা নেই, নেই কোন মোবইল ফোনে অবিরাম মিথ্যাচার, ক্লাস অ্যাসাইনমেন্ট সব কিছূ পেছনে ফেলে নিখাদ সময় রসকে উপভোগ করার এমন সুযোগ যে আবার কবে আসবে কে জানে?
ভিডিও ক্লিপ
যত মন্তব্য
মন্তব্য করুন