Share |

ঢাকা - কুয়ালালামপুর - লংকাভি (পর্ব - ১)

মাত্র পাঁচ দিনে ৩ লাখ ৭৫০ হাজার বর্গকিলোমিটারের বিশাল একটি দেশ কি ঘুরে দেখা সম্ভব? সে দেশটি আবার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিকাশমান অর্থনীতির দেশ। সাম্প্রতিক বিশ্ব রাজনীতিতে দৃঢ় কথা বলার জন্য বার বার আলোচিত হয়েছে দেশটি। বিশ্বের পর্যটনপ্রেমিকদের প্রধান গন্তব্য।

হ্যাঁ, মালয়েশিয়ার কথাই বলছি। পরিকল্পনাটা বেশ ক’মাস আগেই জানিয়েছিলেন খলিলী ভাই। আমি, খলিলী ভাই আর মাসুম বিল্লাহ ভাই। তিনজনের টিম। ২০০৭ সালের ২ মার্চ দিবাগত রাত দেড়টায় মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে কুয়ালালামপুরের উদ্দেশে আমাদের যাত্রা শুরু হলো। নির্দিষ্ট সময়ের কিছু পর ঠিক ২টা ৯ মিনিটে বিমান আকাশে ডানা মেলল।

malysia_writer2.jpgউপমহাদেশের আবহাওয়া কিছুটা খারাপ ছিল। দিনের বেলায় বৃষ্টি হয়েছে। বিমানে বসে তা আরো বেশি বুঝতে পেলাম, যখন বিমান বরিশালের লঞ্চের মতো বারবার ঝাঁকুনি খেতে লাগল। বাংলাদেশের সীমানা থেকে সরে যাওয়ার পর জানালা দিয়ে তাকিয়ে বাইরে অপূর্ব রাতের শোভা আমাদের মুগ্ধ করল। পুরো পৃথিবী তখন জ্যোৎস্নার প্লাবনে সিক্ত। আকাশে এক ফালি চাঁদও আছে, আর আমাদের বিমান সেই জ্যোৎস্নাপুরির মাঝ দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। এ রকম স্বপ্ন সময় আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দিলো। যখন ঘুম ভাঙল তখন সকাল হচ্ছে। সাদা মেঘের মধ্য থেকে সূর্য তার প্রথম কিরণ ছাড়ছে। শুভ্র মেঘের দল তাদের শরীরে সূর্যের আভাকে লেপ্টে নিয়ে খানিক সোনালি রঙ ধারণ করেছে। বিমানের জানালা দিয়ে যত দূর চোখ যায় শুধু সাদা শুভ্র মেঘ। এটা মেঘদের বাড়ি। জানালাটা খোলা থাকলে মেঘগুলোকে হাতে ধরে দেখতাম। সে উপায় নেই। মেঘদের উঠোন, মাঠ আর বাড়ির মধ্যে হুটোপুটি করতে করতে এক সময় মানচিত্রের লিজেন্ডের মতো একটি জনপদ দেখলাম। হ্যাঁ, এটাই আমাদের গন্তব্য কুয়ালালামপুর শহর।

মালয়েশিয়ার ইতিহাস খুব দীর্ঘ নয়। সপ্তদশ শতকের প্রথম দিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ডাচরা বাণিজ্য এলাকা গড়ে তোলে। ১৭৮৬ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ফ্রান্সিস লাইট এই উপদ্বীপে আসেন। ১৭৯১ সালে কেদাহর সুলতানের কাছ থেকে বার্ষিক কর পরিশোধের চুক্তিতে ব্রিটিশরা পেনাংয়ে বাণিজ্য ও নৌ-ঘাঁটি স্থাপন করে। ১৮১৯ সালে ব্রিটিশরা সিঙ্গাপুর এবং ১৮২৪ সালে মেলাকা ডাচদের কাছ থেকে দখল করে নেয়। এ সময় পেনাং, মেলাকা এবং সিঙ্গাপুরে দ্বৈত শাসন চালু হয়। ১৮৯৬ সালে পেরাক, সেলাঙ্গর, পাহাং এবং নাগবি সেমবিল নিয়ে ফেডারেল মালয় স্টেট গঠিত হয়। ১৯০৯ সালে এর সাথে যুক্ত হয় কেদাহ, কেলান্তান, পার্লিস ও তেরাঙ্গানো। টিন ও রাবার খনির কারণে মালয় রাতারাতি আলোচিত হয়ে ওঠে। এ সময়ে দক্ষিণ ভারতীয় ও চাইনিজ জনগোষ্ঠী দলে দলে এখানে আসতে থাকে।

malysia_writer.jpgদ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও হল্যান্ড জাপানের সাথে বাণিজ্যিক অবরোধ আরোপ ও তেল সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। ফলে কাছাকাছির মালয় জাপানি হুমকির মুখে পড়ে। ১৯৪১ সালের ৮ ডিসেম্বর মালয়ের কোটা ভারু ও কেলান্তান দ্বীপে এবং সিঙ্গাপুরে ব্যাপক বোমাবর্ষণ করে জাপানিরা। প্রায় কোনোরকম প্রতিরোধ ছাড়াই জাপানিরা সিঙ্গাপুর ও মালয়কে দখল করে নেয়। এ সময় তারা অনেক চায়নিজকে নির্যাতন ও হত্যা করে এবং ভারতীয়দের বার্মার ডেথ রেলওয়ে নির্মাণের কাজে লাগায়। পরবর্তী সাড়ে তিন বছর এখানে জাপানিদের শাসন চলে। ১৯৪৫ সালে জাপানের হিরোশিমা-নাগাসাকিতে আণবিক বোমা বিস্ফোরণের সাথে সাথে জাপানিরা মালয় ছেড়ে চলে গেলে এখানে ব্রিটিশ তত্ত্বাবধানের শাসন পুনঃ প্রতিষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই কমিউনিস্টপন্থী চাইনিজ গেরিলাদের কারণে মালয়ে জরুরি আইন ঘোষণা করতে হয়। বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশরা এই কমিউনিস্ট গেরিলাদের অস্ত্র দিয়েছিল জাপানিদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য। বিশ্বযুদ্ধের পর এই গেরিলারা দেশটিতে জোর করে কমিউনিস্ট শাসন প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছিল। জরুরি আইন চলে ১২ বছর, ১৯৬০ সালে এর অবসান হয়।

মালয় ১৯৫৭ সালে ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। এ বছর ৩১ আগস্ট কুয়ালালামপুরের দাডারান মারদেকায় (ফ্রিডম স্কয়ার) টিংকু আবদুর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ১৯৭৪ সালে সেলাঙ্গরের সুলতানের অনুমোদনক্রমে মালয়েশিয়া স্বাধীন ফেডারেল টেরিটরি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
মালয়েশিয়ায় রয়েছে সাংবিধানিক রাজতন্ত্র। নয় মালয় সুলতানের মধ্য থেকে একজন পাঁচ বছরের জন্য রাজা মনোনীত হন। সাবেক ব্রিটিশ কলোনি হওয়াতে সরকার পদ্ধতি ওয়েস্ট মিনিস্টার আদলে গঠিত। আইন বিভাগ থেকে নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা অনেক বেশি। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর দেশটিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন কেবিনেটের হাতে ন্যস্ত। প্রধানমন্ত্রীকে নিম্নপরিষদের সদস্য হতে হয়। মন্ত্রীরা দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইন পরিষদের যেকোনো হাউসের সদস্য থেকে মনোনীত হতে পারেন। সিনেট বা দেওয়ান নেগারা (ন্যাশনাল হল) ৬৯ সদস্যবিশিষ্ট। তারা ছয় বছরের জন্য নির্বাচিত হন। ১৩টি স্টেট অ্যাসেম্বলি ২৬ জন সিনেটর নিয়োগ করে এবং ৪৩ জন রাজা কর্তৃক মনোনীত হন। নিম্নপরিষদ বা প্রতিনিধি সভা বা দেওয়ান রাকায়াত (পিপলস হল) ১৯৩ সদস্যবিশিষ্ট। সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত।

আধুনিক মালয়েশিয়ার কথা বললে ডা. মাহাথির মোহাম্মদের নাম প্রথমেই উঠে আসে। তার পুরো নাম তুন ড. মাহাথির বিন মোহাম্মদ। মালয়েশিয়াকে একটি উন্নত রাষ্ট্রে রূপান্তর এবং আন্তর্জাতিকভাবে সাহসিকতার সাথে কথা বলার জন্য অনেকের কাছে হিরো হয়ে আছেন তিনি। ২০০৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ২২ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। মুসলিম বিশ্বে তার অসাধারণ জনপ্রিয়তা। মালয়েশিয়াকে একটি রাবার রফতানিকারক দেশ থেকে একটি আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত করেন। ১৯২৫ সালের ২০ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণকারী মাহাথির ১৯৮১ সালের ১৬ জুলাই মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আবির্ভূত হন। পেশায় তিনি একজন ডাক্তার। ১৯৬৪ সালে তিনি বৃহৎ রাজনৈতিক দল ইউনাইটেড মালয় ন্যাশনাল অর্গানাইজেশনের পক্ষ থেকে মালয়েশিয়ার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৬ সালে উপ-প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মালয়েশিয়ায় একটি মালয় মধ্যবিত্ত শ্রেণী সৃষ্টি করে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতির ভিত রচনা করেন তিনি।

মালয়েশিয়ার মোট জনগোষ্ঠীর ৬০ ভাগ মালয়ি। তারা মালয় ভাষায় কথা বলে। এক-চতুর্থাংশ চাইনিজ। ব্যবসা তাদের নিয়ন্ত্রণে। ১০ ভাগ ভারতীয়। এদের বেশিরভাগই দক্ষিণ ভারতের হিন্দু তামিল। দেশটিতে মিশ্র সাংস্কৃতিক আচরণ রয়েছে। চাইনিজরা ঘটা করে তাদের নববর্ষ, হিন্দুরা জাঁকজমকের সাথে দীপাবলি উৎসব আর সংখ্যাগুরু মুসলমানরা তাদের সব ধর্মীয় অনুষ্ঠান করে চমৎকার সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে। মালয়েশিয়ার আবহাওয়া নাতিশীতোষ্ণ। সারা বছরই গরম, সারা বছরই বৃষ্টি। প্রকৃতি সব সময়ের জন্য একই রকম, সবুজ।

মালয়েশিয়ার সময় আমাদের সময়ের চেয়ে ২ ঘণ্টা কম। স্থানীয় সময় সকাল ৭টায় ফ্লাইটটি কুয়ালালামপুর ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট বা কেএলআই-তে ল্যান্ড করল। এয়ারপোর্টের বাইরে এসে টিএম কোম্পানি সেলকমের দুটি সিম কিনলাম। বাংলাদেশে টিএম কোম্পানি মোবাইল সেবা দেয় একটেল হিসেবে। এয়ারপোর্ট থেকে একটা লিমুজিন ভাড়া করে আমাদের জন্য নির্ধারিত দুতা সড়কের হোটেল দুতাভিস্তায় উঠলাম। হোটেলের ৩৬৩ নম্বর স্যুটটি আমাদের। বেশ বড়সড় সাজানো-গোছানো এই স্যুটে দু’টি বেডরুমে মোট তিনটি সিট আছে। আছে ডাইনিং রুম, কিচেন রুম, আলমারি, ফ্রিজ, ড্রইং রুম, এসি, টেলিভিশনসহ একটি বাসার জন্য যে রকম প্রয়োজন সে রকম। এক কথায় পুরো একটি বাসা। ভাড়া প্রতিদিন ৩০০ রিংগিত, বাংলাদেশী টাকায় ৫ হাজার ৪০০ টাকা।

রাত ৯টায় স্বপন ভাই এলেন। তিনি মালয়েশিয়ায় প্রায় দেড় যুগ ধরে ব্যবসা করছেন। একটা প্রাইভেটকার নিয়ে এসেছেন, গাড়ির চালক হোসেন ভাই এখানকার প্রধান বিচারপতির গাড়ির ড্রাইভার। আমরা বেরোলাম রাতের আলো ঝলমলে কুয়ালালামপুর শহরকে দেখতে। গ্রামের মানুষ ঢাকা শহরে এলে যেমন মুগ্ধ হয়, ঠিক তেমনি আমার মুগ্ধতা বারবার রঙ-বেরঙের ঝলকানিতে আটকে যাচ্ছিল। এটা আরো অনেক বেড়ে গেল যখন হোসেন ভাই গাড়িটিকে হাজির করলেন টুইন টাওয়ারের নিচে। কেমন একটু শিহরণও বোধ করলাম। রাতের টুইন টাওয়ার দেখে হার্টফেল করার দশা আমার। বারবার আফসোস হচ্ছিল। দু-দুটি ক্যামেরা থাকার পর একটি ক্যামেরাও সাথে আনিনি ভুলে। একটি ফাস্ট ফুডের দোকানে ঢুকে আমরা কিছু খেলাম। এরপর টুইন টাওয়ারের ভেতরে মুভি কর্নারে হিন্দি ছবি ঊশষধাুধ দেখে রাত দেড়টার পর রুমে ফিরলাম।

পরদিন ৪ মার্চ। সকাল ৮টায় ঘুম থেকে উঠে ঝটপট তৈরি হয়ে নিলাম। আমাদের আজকের অন্যতম গন্তব্য গেনটিং হাইল্যান্ড। কুয়ালালামপুর সিটির ৫১ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে এই গেনটিং হাইল্যান্ড। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২ হাজার মিটার ওপরে গড়ে উঠেছে এই পর্যটন শহর। স্বপন ভাই সকাল ৯টার পর এলেন, আমরা বেরিয়ে পড়লাম। প্রায় পৌনে ১ঘণ্টা চলার পর দূর থেকে পাহাড়ের চূড়ায় উড়ে চলা মেঘের মাঝে ছোট্ট শহরকে দেখিয়ে স্বপন ভাই বললেনÑ এটিই গেনটিং হাইল্যান্ড। আরো প্রায় ১০ মিনিট পাহাড়ের আঁকাবাঁকা রাস্তা পেরিয়ে গাড়িটি পার্ক করলেন হোসেন ভাই। স্কাইওয়ের একটি ফাস্ট ফুডের দোকানে বসে আমরা নাশতা করলাম। মেনু ‘নাইস আইয়াম’। এই খাবারটি মালয়েশিয়ানদের খুবই প্রিয়। অনেকটা আমদের ‘চিকেন রাইস’-এর মতো। স্বপন ভাই জানালেন এই গেনটিং হাইল্যান্ডটি মালয়েশিয়া সরকারের তত্ত্বাবধানে চীনা বিনিয়োগে নির্মিত হয়েছে। আমরা ক্যাবল কারে চড়ার জন্য লাইনে দাঁড়ালাম। ১৮ মিনিটের এই যাত্রাপথে পাহাড়ের ওপর দিয়ে, বড় বড় গাছপালার ওপর দিয়ে আমরা পৌঁছলাম মূল হাইল্যান্ডে।

গেনটিং হাইল্যান্ডটি মানুষ আর মেঘের ভাগাভাগির শহর। উঁচু উঁচু ভবনের মাঝ দিয়েই উড়ে যাচ্ছে মেঘ। এই রোদ্দুর খানিক পরেই তা আর নেই, কেমন কুয়াশা কুয়াশা ভাব। কিছুক্ষণ গরম লাগলেও খানিক পরে কেমন হিম হিম ভাব। তাপমাত্রা ১৬ থেকে ২৩ ডিগ্রির মধ্যে থাকে। এ রকম একটি পরিবেশের মধ্যেই বেশ ক’টি পাঁচতারা হোটেল, অ্যাপার্টমেন্ট, অফিস, বাড়ি নিয়ে এই ছোট্ট পর্যটন শহর। এ ছাড়াও এখানে শিশু-কিশোরদের জন্য মজার স্বপ্নপুরী, থিমপার্ক তো আছেই, আরো আছে ট্রেন বাস। এই বাস ট্রেনের বগির মতো। চলে খুব ধীরে ধীরে। পুরো শহরটিরে ঘুরে দেখার জন্য এটি খুবই জুৎসই। হোটেল ফার্স্ট ওয়ার্ল্ডের সামনে চীনাদের ঐতিহ্যবাহী নাচ দেখে আমরা ভীষণ মুগ্ধ হলাম। মালয়েশিয়ার একমাত্র ক্যাসিনোটি আছে এখানে।

এর পরে আমরা এলাম বাতু কেভসে। কুয়ালালামপুর সিটি থেকে ১৩ কিলোমিটার উত্তরে মালয়েশীয় হিন্দুদের পবিত্র স্থান বাতু কেভস। ১০০ মিটার ওপরে বিশাল পাহাড়ের মধ্যে পাশাপাশি তিনটি বড় এবং তুলনামূলক ছোট একটি গুহার সমন্বয়ে বাতু কেভস। মোট ৪০০ মিটার দীর্ঘ এ গুহাগুলো ১৮৯২ সালে আবিষ্কৃত হয়। বাতু কেভসের সামনে গুহায় প্রবেশ করার জন্য সিঁড়ি আছে। সহজভাবে বোঝার জন্য বলা যেতে প্রায় ২২ তলা উঁচু ভবন পরিমাণ উঁচু এই সিঁড়ি। আমি উঠছিলাম আর ভিডিও করছিলাম। ফলে খলিলী ভাই আর বিল্লাহ ভাই থেকে পেছনে পড়ে গেলাম। ওনাদের কাছাকাছি হওয়ার জন্য দ্রুত উঠতে গিয়ে হাঁফিয়ে উঠলাম। ওপরে কয়েকটা দোকান আছে। সেখানে ডাব দেখে খেতে ইচ্ছে হলো। যা দাম! তিন রিংগিত, বাংলাদেশী টাকায় ৫৪ টাকা। বাতু কেভস আসলে পাহাড়ের বিশাল প্রাকৃতিক গুহা। বিশাল বিশাল হলরুমের কয়েকটি জোড়া দিলে এর একটির সমান হবে। গুহার মাঝে মাঝে ফাঁকা থাকাতে সহজেই আলো প্রবেশ করতে পারে এখানে। ভেতরে বাইরে হিন্দু দেব-দেবীর প্রচুর মূর্তি আছে, মন্দিরও আছে কয়েকটি। বানর আছে বেশ ক’প্রজাতির। এদেরকে সবাই বেশ আদর করে, খাবার দেয়, ভক্তি করে।

বিকেলে আমরা কুয়ালালামপুরের কোটারায়াতে এলাম। তুনতান সিউসিন সড়কের পাশে বাংলদেশীদের পরিচালিত বেশ ক’টি দোকান আছে এখানে। প্রতি রোববার বন্ধের দিনে এখানে প্রচুর বাংলাদেশী ভিড় করে। ভাগ্যের সন্ধানে পাড়ি দেয়া বাংলাদেশী ব্যবসায়ী, শ্রমিক কিংবা ছাত্রছাত্রীদের মিলনমেলার স্থান এই কোটারায়া। এটি আসলে কুয়ালালামপুরের এক টুকরো বাংলাদেশ। আমরা যখন কোটারায়াতে পৌঁছি, তখন পুলিশ রেইড করে অবৈধ কেউ আছে কি না চেক করছে। বিদেশী বিশেষ করে বাংলাদেশী শ্রমিকরা প্রায়ই পুলিশি হয়রানির শিকার হয়। পুলিশের রেইড থাকার কারণে আজ রোববার হলেও বাংলাদেশীদের আসর খুব একটা জমেনি। এখানকার ‘বাংলা ট্রেডিংয়ের দোতলায় কথা হয় নিপু ভাই, রাশেদ বাদলসহ বেশ ক’জন বাংলাদেশী ব্যবসায়ীর সাথে। তারা জানাল, মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশী জনশক্তি রফতানিতে বিভিন্ন সমস্যা, দূতাবাসের অসহযোগিতা, সর্বোপরি পুলিশের বিমাতাসুলভ আচরণ এখানে কর্মরত শ্রমিকদের সারাক্ষণই দারুণ উদ্বেগে রাখে। বাংলাদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দিবসগুলো কোনোরকম ঢিলেঢালাভাবে পালন করে আমাদের দূতাবাস। একবার ভারতীয় কিছু শ্রমিকের সাথে মালয়েশীয় পুলিশ অযথা দুর্ব্যবহার করলে ভারত সরকার এ দেশে শ্রমিক রফতানি এবং বিমান চলাচল বন্ধ করে দেয়ার হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে ভারতীয় শ্রমিকদের আর পুলিশি হয়রানির শিকার হতে হয় না। পক্ষন্তরে এখানে কর্মরত বৈধ বাংলাদেশী শ্রমিকরাও পুলিশি হয়রানিতে অবৈধদের মতো নির্যাতনের শিকার হয়।

কোটারায়া থেকে বেরিয়ে ভারতীয়দের পরিচালিত একটি হোটেলে খাবার খেলাম। মালয়েশিয়ায় এই প্রথম তৃপ্তির সাথে খাবার খেলাম। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে হোটেলে ফিরে খুব ক্লান্তি বোধ করছিলাম। বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই ঘুমিয়ে পড়লাম, উঠলাম রাত সোয়া ১০টায়।

মালয়েশিয়ায় আমাদের সময় খুবই কম। কুয়ালালামপুরের বাইরে কোথাও যাওয়া হলো না। খলিলী ভাই লংকাভি যাওয়ার জন্য বিভিন্ন স্থানে খোঁজখবর নিলেন। কেউই এক-দু’দিনে লংকাভি গিয়ে ফিরে আসার সম্ভাবনাকেও সাপোর্ট করছে না। সবার কথা লংকাভি কমপক্ষে এক সপ্তাহের জন্য যেতে হয়। আমাদের হাতে অত সময় নেই। বিমানে শর্টকাট রাস্তা হয় কি না দেখতে লাগলাম। না, বিমানে কমপক্ষে এক সপ্তাহ আগে টিকিট বুকিং দিতে হয়। শেষমেশ খলিলী ভাই তার এক আত্মীয়ের পরামর্শে লংকাভির রুট নির্ধারণ করলেন। সিদ্ধান্ত হলো আগামীকালই রাতের গাড়িতে রওনা হব আমরা।
৫ মার্চ ২০০৭। ঘুম থেকে উঠলাম সকাল ৯টার দিকে। উঠেই তোড়জোড় শুরু করে দিলাম। রুম ছেড়ে দেবো, তাই ব্যাগ-বোচকা গোছাতে লাগলাম। লাগেজ নিয়ে ঘুরাঘুরির সমস্যা থেকে রেহাই পেতে এগুলো আরেফিন ভাইর স্যুটে রেখে আমাদের রুমটি ছেড়ে দিলাম। রুমটি ছেড়ে দেয়ার পর সেই গানটির কথা মনে পড়লÑ ‘আমি পথে পথে ঘুরি, আমার নাইরে কোনো ঠিকানা...’। মালয়েশিয়ায় আমাদের এখন কোনো ঠিকানা থাকল না।
আজ আর স্বপন ভাই আমাদের সময় দিতে পারলেন না। ব্যবসার কাজে ব্যস্ত। তার এক ভাগ্নে এখানে থাকে, গাড়ি আছে, ভালো ড্রাইভিং জানে। নাম মাইনুল। তাকে পাঠালেন। কথা ছিল টুইন টাওয়ারের সামনে আমরা অপেক্ষা করব, সেখান থেকে সে আমাদের চিনে নেবে। একটা ট্যাক্সি নিয়ে টুইন টাওয়ারের সামনে আমরা মাইনুলের অপেক্ষায় থাকলাম। এই সুযোগে সবাই টুইন টাওয়ারের সামনে খানিক ফটোসেশন করে নিলাম। অনেকক্ষণ বসে থাকার পর খলিলী ভাই নাশতার কথা বললে ক্ষুধার কথা মনে পড়ল। টুইন টাওয়ারের দুই নম্বর টাওয়ারের ভেতরে ঢুকে দোতলার ফুড কোটে খাবারের দোকানগুলোকে দেখে ক্ষুধাটা আরেক দফা চড়ে উঠল। হরেক রকম খাবারের মাঝে আমরা ‘নাসি আইয়াম’ পাওয়া যায় কি না খুঁজতে লাগলাম। পেলাম না। শেষে ম্যাগডোনালসের একটি দোকান দেখে বসে পড়লাম। ফ্রেঞ্চ ফ্রাই দিয়ে সকালের নাশতা পর্ব শেষ করলাম।

নাশতা খেয়ে বের হলাম। রাস্তার ওপারে বাস স্ট্যান্ডের পাশেই মাইনুল গাড়িসহ দাঁড়িয়ে ছিল। গাড়িতে উঠে প্রথমেই ফিরতি টিকিট কনফার্ম করতে মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের একটি অফিসে গেলাম। অনেক সময় লাগল টিকিট কনফার্ম করতে। প্রায় ১২টা বাজল। মাইনুল একটা মার্কেটের সামনে রাস্তার পাশে গাড়িটি রেখে হাওয়া হয়ে গেল। মোবাইলটিও রেখে গেল গাড়িতে। পুলিশ এল। মাইনুল এল প্রায় ৫০ মিনিট পর। তার জরিমানা হলো রাস্তার ওপর গাড়ি রাখার অপরাধে। পুডোরায়ায় এসে রাতে লংকাভি যেতে বাসের টিকিট কাটলাম। কনসোর্টিয়াম বাস এক্সপ্রেসের প্রতি টিকিটের মূল্য ৩৩ রিংগিত।
এবার গাড়ি ছুটল পুত্রাজায়ার পথে। কুয়ালালামপুরের ২৫ কিলোমিটার দক্ষিণে পুত্রাজায়া। শহরটি মালয়েশিয়ার প্রশাসনিক রাজধানী। পুত্রাজায়াকে বিশ্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও মনোমুগ্ধকর শহর বলে মনে করেন মালয়েশিয়ানরা, সম্বোধন করেন ওয়ার্ল্ড শোকেস বলে। ৪ হাজার ৯৩২ হেক্টর জমির ওপর নির্মিত এই এলাকার প্রাচীন নাম প্রং বেছার। পুত্রাজায়ার আধুনিক নামকরণ করা হয় মালয়েশিয়ার স্বাধীনতার ঘোষক, প্রথম প্রধানমন্ত্রী টিংকু আবদুল রহমান পুত্রা আলহাজের নামানুসারে। এটা ছিল টিন জাতীয় ধাতব পদার্থের খনিজ অঞ্চল। খনিজসম্পদ নিঃশেষ হওয়ার পর এলাকাটি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। ১৯৯১ সালের গোড়ার দিকে প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ এখানে তার নতুন পরিকল্পনার কথা উত্থাপন করলে তা অনেকের কাছেই অকল্পনীয় মনে হয়।

পুত্রাজায়ায় ঢুকতে প্রথমেই চোখে পড়বে আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টার। ওআইসি’র মহাসম্মেলনসহ বড় বড় আন্তর্জাতিক সম্মেলন এখানে অনুষ্ঠিত হয়েছে। কৃত্রিম লেক তৈরি করে তার মাঝে এর অবস্থান। দূর থেকে মনে হবে কোনো কাউবয় বসে আছে হ্যাট মাথায়। এর সামনেই অপূর্ব দৃষ্টিনন্দন পুত্রা ব্রিজ। এ রকম আরো তিনটি আকর্ষণীয় ব্রিজ আছে এখানে। কনভেনশন সেন্টারের সোজা উত্তরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। মাঝখানের রাস্তার দুই পাশে মিনারা পিজেএইচ টাওয়ার, প্যালেস অব জাস্টিস, গভর্নমেন্ট কমপ্লেক্স, মিনিস্ট্রি অব ফাইন্যান্স, স্পোর্ট মিনিস্ট্রি, পারবান্দানান পুত্রাজায়া কমপ্লেক্স, মারতিমি সেন্টার ইত্যাদি। রাস্তার পাশের লাইটপোস্টের ডিজাইন পাল্টেছে প্রতি কিলোমিটার পর পর। ফুটপাতগুলোও যেন শিল্পীর ক্যানভাস। বিভিন্ন ডিজাইনের ইট দিয়ে তৈরি ফুটপাথে বাহারি সব ফুলের গাছ সাজানো আছে স্টাইলিস্ট টবের মাঝে।

প্রধানমন্ত্রীর দফতরের সামনে পুত্রা স্কয়ার। এর পশ্চিম কোণে সর্বাধুনিক স্থাপত্যশৈলীর আরেক আকর্ষণ পুত্রা মসজিদ। বাগদাদের শেখ ওমর মসজিদের অনুকরণে এ মসজিদটি নির্মিত হয়েছে। ভেতরে-বাইরে অপূর্ব অসাধারণ আধুনিক কারুকার্য নিদর্শন বিশ্বময় পর্যটকদের চোখকে তৃপ্ত করে। বিশ্বের অধিকাংশ মুসলিম দেশের রাষ্ট্রপ্রধান এই মসজিদে নামাজ আদায় করেছেন। মসজিদের দুয়ার যেকোনো ধর্ম-বর্ণের নারী-পুরুষের জন্য খোলা। তবে মহিলাদের জন্য গেটের কাছে রাখা আছে কালো বোরকা, সেটা পরে তাদের ভেতরে যেতে হয়।

পুত্রা মসজিদের পাশে খানিক সময় কাটিয়ে এলাম পুত্রা ব্রিজের নিচে। কৃত্রিম লেকের ওপর দিয়ে ঠাণ্ডা বাতাস আমাদের চোখে নেশা লাগিয়ে গেল। খলিলী ভাই আর বিল্লাহ ভাই তো ঘাসের ওপর শুয়ে খানিক ঘুমিয়ে নিলেন। এরপর পুত্রাজায়া কনভেনশন সেন্টারের সামনে এলাম। বাহির থেকে যতটুকু সম্ভব দেখে নিলাম। মাইনুল জানাল ইচ্ছে করলে ভেতরে ঢোকা যায়।


যত মন্তব্য

মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <div>
  • Lines and paragraphs break automatically.

ফরম্যাটিং অপশনস

By submitting this form, you accept the Mollom privacy policy.