দশ বছর পর ঢাকা চিড়িয়াখানা ভ্রমণ — কিছু পর্যবেক্ষণ

দশ বছর পর ঢাকা চিড়িয়াখানা ভ্রমণ — কিছু পর্যবেক্ষণ


দশ বছর দীর্ঘ সময়। প্রায় দশ বছর পর ঢাকা চিড়িয়াখানা ঘুরতে গেলাম। শুনেছিলাম জাতীয় চিড়িয়াখানা বা ন্যাশনাল জু নাম হতে যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে এখনো ঢাকা চিড়িয়াখানা নামেই পরিচিত। অন্তত বাইরের বিশাল সাইনবোর্ডে তেমনটাই লেখা।

সাপ্তাহিক ছুটির দিনে চিড়িয়াখানায় অনেক ভীড় হয়। তাই ভীড় এড়াতে মঙ্গলবার বেছে নিলাম। ঢুকেই প্রথম যে অনুভূতি হলো তা হলো সবকিছু ঝকঝকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। আমরা বেলা ১১টার দিকে ঢুকেছি; তখনো মানুষ তেমনটা আসেনি; কেবল আসা শুরু করেছে। এরই মধ্য চিড়িয়াখানা যেন ধুয়ে মুছে সবকিছু দর্শনার্থীদের জন্য প্রস্তত করে রেখেছে। কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি মনে মনে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলাম।

পরিচ্ছন্ন ঢাকা চিড়িয়াখানা (ছবি- নিসর্গ)

পরিচ্ছন্ন ঢাকা চিড়িয়াখানা (ছবি- নিসর্গ)

চিত্রা হরিণের আবাসস্থল দর্শনীর মধ্যে দিয়ে শুরু হলো আমাদের ভ্রমণ। ডিসেম্বর মাসের প্রায় পুরোটাই ঢাকার সকাল কুয়াশাচ্ছন্ন থাকছে। আজও তার ব্যতিক্রম নয়। মাঝে মাঝে ধোঁয়ার মতো মেঘের ফাঁক গলে একটু খানি রোদ এসে চিত্রা হরিণগুলোকে আলোকিত করছে। আর সে সুযোগে আমিও ছবি তুলছিলাম। আমার কাঁধে দুই ক্যামেরা– ১.৪এক্স এক্সটেন্ডার সহ ৩০০মিমি এফ ৪ + ক্যানন ৪০ডি, আর ৭০-২০০মিমি এফ ২.৮ সহ ক্যানন ৬ডি। সাদা লেন্স অতি সহজেই ময়লা এবং মানুষের দৃষ্টি কাড়ে। ক্যামেরা আর লেন্সগুলোই হয়ে পড়ল অনেক মানুষের আগ্রহের বিষয়। আমি ছবি তুলছি আর আমার আশেপাশে একদল ছোট ছেলেমেয়ে ভীড় করেছে। তাদের আগ্রহের বিষয় আমার লেন্সগুলো। একজন বলছে সে আমার ক্যামেরা দিয়ে দেখতে চায়। আরেকজন বলছে ওটা দিয়ে দূরের হরিণ অনেক কাছে দেখা যাবে, তাই না? আমি সম্মতিসূচক মাথা ঝাঁকাই। ছোট ছেলেটা এগিয়ে আসে, আমি প্রিভিউতে হরিণের ছবি দেখাই। আমাদের দেশের মানুষ আসলেই অনেক সরল।

আরো মজার ব্যাপার হলো একজন পুর্ণবয়স্ক মানুষ আমার সাথে ছবি তুলবেন বলে অনুরোধ করলেন। জিজ্ঞেস করলেন এসব ক্যামেরা আর লেন্স বিদেশী কিনা। আমি বলি, দেশে বিদেশে সবখানেই আছে। ভদ্রলোক অন্য একজনকে তার মোবাইল ফোন দিয়ে আমার পাশে এসে দাঁড়ালেন। আমার গলা থেকে ঝুলছে দুই ক্যামেরা। হঠাৎ নিজেকেই চিড়িয়া মনে হচ্ছিল।

ঢাকা চিড়িয়াখানা - চিত্রা হরিণ: ক্যানন ৪০ডি ৪২০মিমি এফ/৫.৬ ১/৫০০ আইএসও ৪০০

ঢাকা চিড়িয়াখানা – চিত্রা হরিণ: ক্যানন ৪০ডি ৪২০মিমি এফ/৫.৬ ১/৫০০ আইএসও ৪০০

ঢাকা চিড়িয়াখানা – চিত্রা হরিণ: ক্যানন ৪০ডি ৪২০মিমি এফ/৫.৬ ১/১০০০ আইএসও ৪০০  (ছবি: নিসর্গ)

ঢাকা চিড়িয়াখানা – চিত্রা হরিণ: ক্যানন ৪০ডি ৪২০মিমি এফ/৫.৬ ১/১০০০ আইএসও ৪০০ (ছবি: নিসর্গ)

ঢাকা চিড়িয়াখানা – চিত্রা হরিণ: ক্যানন ৪০ডি ৪২০মিমি এফ/৫.৬ ১/৫০০ আইএসও ৪০০  (ছবি: নিসর্গ)

ঢাকা চিড়িয়াখানা – চিত্রা হরিণ: ক্যানন ৪০ডি ৪২০মিমি এফ/৫.৬ ১/৫০০ আইএসও ৪০০ (ছবি: নিসর্গ)

ঢাকা চিড়িয়াখানা – চিত্রা হরিণ: ক্যানন ৬ডি ২০০মিমি এফ/৫.৬ ১/২৫০ আইএসও ১০০  (ছবি: নিসর্গ)

ঢাকা চিড়িয়াখানা – চিত্রা হরিণ: ক্যানন ৬ডি ২০০মিমি এফ/৫.৬ ১/২৫০ আইএসও ১০০ (ছবি: নিসর্গ)

চিত্রা হরিণের আবাসস্থল পেরিয়ে এসে আগের মতোই প্রাকৃতিক পরিবেশে রয়েল বেঙ্গল টাইগার ও সিংহের আবাসস্থল। খাঁচায় খাবার দেয়া হয়েছে কিন্তু ওরা দেখলাম ঘুমুচ্ছে। দর্শনার্থীরা যথারীতি নানা রকম শব্দ করে তাদের জাগানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু তারা নির্বিকার। এরা সম্ভবত অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে।

চিড়িয়াখানার মুল লেকটিকে বামে রেখে বাঘের আবাসস্থল পেরিয়ে সামনে এগুলে চোখে পড়ল নতুন কিছু খাঁচা। সেখানে রাখা হয়েছে লোনা পানির কুমির। এই অংশটুকু দশ বছর আগে যখন এসেছিলাম তখন ছিলনা। নতুন তৈরী হলেও কুমিরের আবাস্থলে আধুনিকতার কোন ছোঁয়া নেই। সেই ঘন করে বোনা পাটির মতো লোহার খাঁচার ভিতর দিয়ে খুব সামান্যই কুমির দেখা যায়। যে কারণেই দর্শনার্থীর খাঁচার এক পাশের নেট ছিঁড়ে ফেলেছে যার ফাঁক গলে মোটামুটি ছবি তোলা গেল।

ধারণা করি দর্শনার্থীরা যেন খোঁচাখুঁচি করতে না পারে সেজন্যই এরকম খাঁচা বানিয়েছে। কিন্তু বিদেশের চিড়িয়াখানাগুলোতে লোহার বেড়ার পরিবর্ত মোটা প্লাস্টিকের তৈরী কাঁচের মতো ঘর তৈরী করা হয়। এতে করে দর্শনার্থীরাও নির্বিঘ্নে ও বিনা বাধায় দেখতে পারে। খাঁচাবদ্ধ ছাড়াও খাঁচার বাইরেও কুমির আছে। ছবিতে দেখুন।

কুমির (ঢাকা চিড়িয়াখানা): ক্যানন ৬ডি ৭০-২০০ এফ ২.৮ ১/১২৫, ১৪২মিমি, আইএসও ৩২০

কুমির (ঢাকা চিড়িয়াখানা): ক্যানন ৬ডি ৭০-২০০ এফ ২.৮ ১/১২৫, ১৪২মিমি, আইএসও ৩২০

কুমির (ঢাকা চিড়িয়াখানা): ক্যানন ৪০ডি ৪২০মিমি এফ/৫.৬ ১/৫০০,  আইএসও ৪০০

কুমির (ঢাকা চিড়িয়াখানা): ক্যানন ৪০ডি ৪২০মিমি এফ/৫.৬ ১/৫০০, আইএসও ৪০০

কুমির দেখা হলে এলাম চিড়িয়াখানার সুপরিচিত লেকটির পাশে যেখানে পেলিক্যান পাখি আছে। দশ বছর বা তারও আগে শীতের সময় এখানে পরিযায়ি পাখি দিয়ে মুখরিত থাকতো। কিন্তু এবার একটি পাখিও দেখলাম না। শুনেছি অনেকদিন আগে থেকেই পাখিরা এই লেক পরিহার করছে। পরিযায়ি পাখি না থাকলেও আছে সেই অতি পরিচিত সাদা পেলিক্যান। তিনটি পেলিক্যান আগেও ছিল এখনো আছে। নিচের ছবিতে দেখা যাচ্ছে তিনটি পেলিক্যান। এগুলো কি দশ বছর আগের ঢাকা চিড়িয়াখানায় দেখা পেলিক্যানগুলো? হয়তো হবে।

IMG_5967

IMG_5924

সাদা পেলিক্যান (ঢাকা চিড়িয়াখানা): ক্যানন ৬ডি ৭০-২০০ এফ২.৮ ২০০মিমি এফ/৩.৫, ১/৫০০, আইএসও ১০০

সাদা পেলিক্যান (ঢাকা চিড়িয়াখানা): ক্যানন ৬ডি ৭০-২০০ এফ২.৮ ২০০মিমি এফ/৩.৫, ১/৫০০, আইএসও ১০০

ঢাকা চিড়িয়াখানায় উল্লেখযোগ্য কোন পরিবর্তন চোখে পড়লনা। তবে জলহস্তীর সংখ্যা বেড়েছে কয়েক গুন। দশ বছর আগে সম্ভবত ২টি বা ৩টি ছিল। সেটি এখন ১০ এর উপরে।

ঢাকা চিড়িয়াখানায় জলহস্তীর পাল

ঢাকা চিড়িয়াখানায় জলহস্তীর পাল

ঢাকা চিড়িয়াখানায় মা হলহস্তী ও তার বাচ্চা

ঢাকা চিড়িয়াখানায় মা হলহস্তী ও তার বাচ্চা

অল্পবয়সী জলহস্তী কাকে যেন ভয় দেখাচ্ছে (ঢাকা চিড়িয়াখানা)

অল্পবয়সী জলহস্তী কাকে যেন ভয় দেখাচ্ছে (ঢাকা চিড়িয়াখানা)

ঢাকা চিড়িয়াখানায় জেব্রা ও তার বাচ্চা

ঢাকা চিড়িয়াখানায় জেব্রা ও তার বাচ্চা

কালো ঘোড়া (ঢাকা চিড়িয়াখানা)

কালো ঘোড়া (ঢাকা চিড়িয়াখানা)

এদের নাম কী?  গাধার কোন প্রজাতি হয়তো

এদের নাম কী? গাধার কোন প্রজাতি হয়তো

এশিয়ান হাতি - ঢাকা চিড়িয়াখানা। ছবি- নিসর্গ

এশিয়ান হাতি – ঢাকা চিড়িয়াখানা। ছবি- নিসর্গ

অনেকদিন পর চিড়িয়াখানায় গিয়ে অসম্ভব ভালো লেগেছে। বিশেষ করে চিড়িয়াখানাকে এত চমৎকার করে পরিচ্ছন্ন করে রেখেছে যেটা আশা করিনি। কর্তৃপক্ষকে সেজন্য অনেক ধন্যবাদ। আরো দেখলাম দর্শনার্থীরা কিভাবে জায়গাটাকে বিকেলের মধ্যেই মোটামুটি গার্বেজে পরিণত করে ফেলল। চিড়িয়াখানার সর্বত্রই ডাস্টবিন বসানো হয়েছে। তার পরেও যত্রতত্র চিপসের প্যাকেট, আমড়ার প্যাকেট, আর ময়লা পড়ে আছে। দর্শনার্থীরা এসব ফেলছে, শিশুরা ফেলছে, বড়রা ফেলছে। বড়দের যেন কোন দায় নেই, নেই বাচ্চাদের শেখানোর কোন আগ্রহ। হায়, কবে আমরা শিখব!

এক নজরে

(জানুয়ারি ১, ২০১৫ তারিখ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক):

  • রবিবার সাপ্তাহিক ছুটি–চিড়িয়াখানা দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ।
  • প্রবেশমূল্য জন প্রতি ২০/- টাকা। ২ বছরের শিশুরও টিকিট লাগবে এমনটা টিকিট কাউন্টারের উপর লেখা আছে। চিড়িয়াখানার ভিতরে একটি প্রাণি যাদুঘর আছে। সেখানে ঢুকতে আলাদা টিকিল লাগবে; জন প্রতি ৫ টাকা। এছাড়া হাতি ও ঘোড়ায় চড়ার ব্যবস্থা আছে। এটার জন্য আলাদা টিকিট লাগবে। টিকিটের মূল্য জানতে পারিনি।
  • অফিশিয়াল ওয়েব সাইটে (www.dhakazoo.org) প্রবেশমূল্য লেখা আছে ১০/-টাকা যেটি সঠিক নয়। (জানুয়ারি ২, ২০১৫ মোতাবেক)
  • অটিসটিক শিশু সহ সকল প্রতিবন্ধীর প্রবেশ ফি লাগে না।
  • টিকিট কাটার জন্য ৮ টি কাউন্টার আছে।

সম্ভাব্য হয়রানি

  • চিড়িয়াখানার প্রবশ পথে গাড়ি বা সিএনজি থেকে নামার সাথে সাথে আপনার সাথে যদি বাচ্চা থাকে তাহলে একাধিক মানুষ এসে হাতে উল্কি আঁকা শুরু করবে। উদ্দেশ্য বুঝতেই পারছেন–উল্কি আঁকার বিনিময়ে তাদেরকে সম্মানি দিতে হবে। মানা করলেও এরা শোনে না। সেক্ষেত্রে আগে থেকেই প্রস্তত থাকতে পারেন। বিশেষ করে বাচ্চাদের হাত তাদের জ্যাকেট বা জামার পকেটে ঢুকিয়ে দিতে পারেন। অথবা ভেন্ডরদের সতর্ক করতে পারেন এই বলে যে এর বিনিময়ে আপনি কিছুই দিবে না না। আর যদি উল্কি এঁকে নিতে চান সেক্ষেত্রে সম্মানি দিয়ে দিবেন। কত দিলে তারা খুশি হবে সেটা নির্ভর করবে আপনার পোষাকের উপর।
  • চিড়িয়াখানার অভ্যন্তরে অনেক খাবারের দোকান আছে। অনেকেই তাদের রেস্টুরেন্টে খেতে আহবান জানাবে–ভদ্র ভাবে না করে দিন। খাবারের দাম বাইরের দ্বিগুন। উদাহরণ: বোম্বে পটাটো ক্রাকার্স বাইরে ১০ টাকা আর ভিতরে নকল প্যাকেটে অন্য ব্যান্ডের চিপসএর দাম ২০ টাকা। অর্থাৎ দ্বিগুন দাম দিয়ে অপেক্ষাকৃত নিম্ন মানের খাবার পাচ্ছেন।

2 Comments

Add yours
  1. 1
    Samim Samim Samim

    অনেক ‍ দিন পর চিরিয়াখানার কথা মনে পড়ল. ছবি গুলো খুব সুন্দর হয়েছে।

+ Leave a Comment

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.