যেভাবে চাঁদের ছবি তোলা যায়

যেভাবে চাঁদের ছবি তোলা যায়


চাঁদের ছবি দেখতে দেখতে একসময় মনে হল চাঁদের ছবি তোলা দরকার। চাঁদের ছবি তুলতে গেলে অনেক সময় ভালো আসেনা। আমি চাঁদের ছবি তোলার বিশেষজ্ঞ নই। তবে চাঁদের ছবি তোলার প্রচেষ্টা থেকে যা শিখলাম তার আলোকেই এই লেখা। যারা চাঁদের ছবি তুলতে চান কিন্তু নানা কারণে সেগুলো ভালো আসেনা তারা কিছুটা জানতে পারবেন কিভাবে আমি ছবিগুলো তুলেছি।

সময়

প্রথমেই ঠিক করতে হবে চাঁদের কী ধরনের ছবি চাইছেন। অন্ধকার রাতে চাঁদের ছবি, দিনের আলোয় চাঁদের ছবি, সন্ধ্যায় চাঁদের ছবি–এরকম অনেক সময়ই চাঁদের ছবি তোলা যায়। কখন তুলবেন সেটা নির্ভর করবে আপনি ছবিটি দিয়ে কী করতে চাইছেন বা কোন মুহূর্তকে তুলে ধরতে চাইছেন।

দিনের চাঁদ দেখে আমরা মোটামুটি অভ্যস্ত। সেকারণে দিনের বেলার চাঁদের প্রতি আকর্ষণ সাধারণত কম থাকে। তবে সন্ধ্যা বা রাতের চাঁদের প্রতি আমাদের অনেকেরই বিশেষ করে ফটোগ্রাফারদের আলাদা আগ্রহ থাকে। সন্ধ্যা এবং রাতের চাঁদের ছবি তোলার এক্সপোজার এবং সেটিং নিচে দিয়ে দিচ্ছি।

যা যা লাগবে

চাঁদের ছবি তোলা খুবই সহজ। এজন্য ক্যামেরা তো লাগবেই। সেই সাথে লাগবে মোটামুটি লম্বা একটা লেন্স। আমার মতে কমপক্ষে ২০০ মিলিমিটার লেন্স থাকতে হবে। এরচেয়ে ছোট লেন্স দিয়ে চাঁদের ছবি তোলা যাবে কিন্তু সেরকম ছবিতে চাঁদকে প্রধান উপজীব্য হিসেবে উপস্হাপন করা কঠিন হবে। সবচেয়ে বেশী দরকারি জিনিসটি হল ট্রাইপড। ট্রাইপড না থাকলে কোন কিছুর উপর ঠেস দিয়ে ট্রাইপডের কাজ চালানো গেলেও চাঁদের ছবি তোলার জন্য এরকম ব্যবস্থা খুব একটা সুবিধার নয়। কেননা চাঁদ সাধারণত মাথার উপরে থাকে এবং ক্যামেরাকে সেভাবে ঠেস দিয়ে রাখার জন্য আনুসঙ্গিক অনেক কিছু লাগবে। তার চেয়ে একটা ট্রাইপড যোগড়া করে নেয়া ভাল। মেঘমুক্ত আকাশ থাকলে খুবই ভালো হয়, যদিও বিচ্ছিন্ন মেঘ থাকলে তেমন অসুবিধা হবে না। তবে পরিষ্কার আকাশে চাঁদের ছবি বেশী স্পষ্ট আসবে। স্পষ্ট বলতে চাঁদের গায়ের খানাখন্দ এসব খুবই ডিটেইল আসবে –এমনটা বোঝানো হয়েছে।

কেন ট্রাইপড দরকার

আমার মতে ট্রাইপড হল সবচেয়ে দরকারি জিনিস। আপনার যদি লম্বা টেলিফটো লেন্স থাকে তাহলে এটি দরকার কারণ বড় লেন্স হাতে নিয়ে রাতের ছবি তোলার জন্য যতটা স্ট্যাবিলিটি দরকার ততটা স্ট্রাবিলিটি আমাদের নেই। আর যদি মাঝারি আকারের লেন্স থাকে যেমন ২০০ মিমি বা ৩০০ মিমি, তাহলেও ট্রাইপডে ছবি তুললে সেই ছবি ক্রপ করে ব্যবহারযোগ্য ছবি তোলা সম্ভব। চাঁদের একক ছবি তুলতে গেলে প্রায়ই ক্রপ করতে হয়। ট্রাইপডে তুললে ক্রপ করলেও শার্প ছবি পাওয়া সম্ভব হবে।

এক্সপোজার

এক্সপোজার নির্ভর করবে চাঁদের অবস্থান, ঔজ্জ্বল্য, এবং কোন সময় ছবি তোলা হচ্ছে তার উপর। মনে রাখতে হবে চাঁদ কিন্তু পৃথিবীর মতই গতিশীল এবং প্রতিসেকেন্ডেই এর অবস্থান পরিবর্তন করে। সেকারণে ধীর সাটার স্পীডে চাঁদের ছবি তুললে মোশন ব্লার চলে আসতে পারে। উদাহরণ স্বরুপ চাঁদ যদি ৪৫ ডিগ্রি কোণে থাকে তাহলে সেই চাঁদ খুবই ধীর গতিতে অবস্থান পরিবর্তন করে। এরকম অবস্থায় সন্ধ্যার আগে আগে f/5.6 এপারচার দিয়ে 1/60  থেকে 1/250 এর মধ্যে যেকোন একটা এক্সপোজার সেটিং-এই ভালো ছবি আসবে। আইএসও 100 এ রাখতে হবে।

অনেকের মতে চাঁদের ছবি তুলতে f/8- f/11 এর মধ্যে এপারচার রাখা ভালো। তবে আমি দেখেছি এপারচারের চেয়ে শাটার স্পীড বেশী গুরুত্তপূর্ণ। আমি সর্বনিম্ন 1/60 এবং সর্বোচ্চ 1/250 স্পীডে তুলেছি। উভয় ক্ষেত্রেই ভালো ফল পেয়েছি। তবে 1/125 এ প্রায় সবসময়ই ভালো ছবি পেয়েছি।

আপনার ক্যামেরাকে ম্যানুয়াল মোডে নিয়ে আইএসও 100 তে সেট করে চাঁদের ঔজ্জ্বল্য অনুযায়ী f/5.6 এবং সাটার স্পীড 1/125 দিয়ে ছবি তুলে দেখুন। এরপর প্রয়োজন মতো এক্সপোজার এডজাস্ট করে নিন।

ছবি তোলা

ছবির তোলার সময় যতটা সম্ভব ঝাঁকুনি  দূর করার চেষ্টা করতে হবে। এর জন্য ক্যামেরায় ক্যাবল রিলিজ ব্যবহার করা যেতে পারে। ক্যাবল রিলিজ না থাকলে ডিলেইড সাটার রিলিজ ব্যবহার করুন। সব ক্যামেরাতেই নিজের ছবি তোলার জন্য এই ব্যবস্থাটি থাকে। আপনার ক্যামেরাতে আছে কিনা সেটা ক্যামেরার ম্যানুয়ালে দেখে নিন। প্রথম দিকে ১০ সেকেন্ডের ডিলেইড শাটার রিলিজ ব্যবহার করে দেখুন। শাটার রিলিজ বোতাম টেপার ১০ সেকেন্ড পরে ছবি উঠবে। এই সময়ের মধ্যে ক্যামেরাও স্থির হয়ে যাবে। ফলে ছবি উঠবে চমৎকার।

ক্যামেরায় মিরর লকআপ করার ব্যবস্থা থাকলে আরো ভালো। মিরর লকআপ কিভাবে করে সেটাও ক্যামেরার ম্যানুয়ালে পাবেন। উল্লেখ্য ডিএসএলআর ক্যামেরাগুলোতে মিরর লকআপ করার অপশন থাকে।

পোস্ট প্রসেসিং

পোস্ট প্রেসেসিং এখন অনেকের আয়ত্বের মধ্যে চলে এসেছে। ফটোশপ না থাকলেও পিকাসা কিংবা ফ্লিকারেও ছবি এডিট করা যায়। তবে চাঁদের ছবির পোস্ট প্রসেসিং খুবই সামান্য করতে হয়। কারণ হল, ছবি তোলার সময়ই সঠিক এক্সপোজারে চাঁদের ছবি তুলতে হয়। যেমনটা আগেই উল্লেখ করেছি–ক্যামেরা ভাইব্রেশন যতটা সম্ভব কমানোর ব্যবস্থা করতে হবে। নিচে দুটি ছবি দেখুন– প্রথমটি এডিট করা হয়নি। এক্সপোজার f/7.1 1/125, ISO 100 । এই ছবির সবই ঠিক আছে শুধু কন্ট্রাস্ট আর শার্পনেস কম।

আনএডিটেড ছবি f/7.1 1/125, ISO 100 Canon 40D EF300mm f/4L IS USM +1.4x

 

পোস্ট প্রসেস করা ছবি: f/7.1 1/125, ISO 100

লাইটরুমে কনট্রাস্ট বাড়ানো হয়েছে (+৪০), ক্ল্যারিটি বাড়ানো হয়েছে (+৩১), এক্সপোজার সামান্য কমানো হয়েছে (-.১২) এবং হাইলাইটস সামান্য কমানো হয়েছে(-৫)। আর শার্পনেস খানিকটা বাড়ানো হয়েছে। কোনটি কতটুকু বাড়ানো বা কমানো হয়েছে তা পাশের চিত্রে দেখে নিন। এটি লাইটরুম ৫ থেকে নেয়া স্কৃনশট।

শেষ কথা হলো ছবি তোলার জন্য খানিকটা সময় ব্যয় করতে হবে। পরিকল্পনা থেকে শুরু করে ছবি প্রসেস করে প্রকাশযোগ্য করার জন্য সময় রাখতে হবে। মুহূর্তের অপেক্ষায় থাকলে অনেক সময়ই দারুণ সব ছবি তোলা যায়। তবে মহাজাগতিক বস্তুর ছবি তোলার জন্য পরিকল্পনার কোন বিকল্প নেই।

চাঁদের আরো কিছু ছবি

নীচের ছবিটি দেখুন।

Yellow_Stone_Moon

ছবি: তৌহিদ এজাজ – ইয়েলোস্টোন ন্যাশনাল পার্কে তোলা ছবি। f/5.6, 1/60, ISO 1600,  240mm

 

আপনি কিভাবে চাঁদের ছবি তোলেন এবং প্রসেস করেন তা আমি জানতে আগ্রহী। অনুগ্রহ করে মন্তব্যে জানান। আর ফটোগ্রাফি বা প্রকৃতি নিয়ে লেখার জন্য আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন। ছবি তুলুন, মজা করুন।


+ There are no comments

Add yours

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.