নগরে নিসর্গ / ১

নগরে নিসর্গ / ১


অনেকদিন বনে বাদাড়ে ঘুরাঘুরি হয়না। আগের মত সুযোগও পাইনা। তাই নগরের নিসর্গ নিয়েই ভাবছি লিখব। আমেরিকা এসেছি দুই বছর হয়। তার মধ্যে একবছর হয় রকি মাউন্টেনের দেশ কলোরাডোতে। লোকজন কেন যে পাহাড়ে ওঠে সেটা এখানে এসে কিছুটা হলেও বুঝতে পারছি। পাহাড়ের আছে চুম্বকের মতো আকর্কষণ যা যে কাউকেই টানবে। এই টান পাহাড়ের যত কাছে যাওয়া যায় ততই বাড়ে। কিন্তু পাহাড়ের চেয়ে বড় টান হল জীবিকার টান। আর সেই টানের কারণেই আজ অব্দি তেমন কোথাও যাওয়া হয়নি। যাওয়ার মধ্যে ডেনভার চিড়িয়াখানায় আর বার দুয়েক রকি মাউন্টেন ন্যাশনাল পার্কে।

মিউজিয়ামের মতই এসব দেশের চিড়িয়াখানায় গেলে প্রথমেই তুলনায় চলে আসে বাংলাদেশের মিউজিয়াম এবং চিড়িয়াখানা। ভেবে খারাপ লাগে দেশে এত সম্পদ থাকা সত্বেও সেগুলোকে নিরাপদ/সুস্থ বিনোদন কিংবা শিক্ষাণীয় কাজে সেভাবে কাজে লাগানো যায়নি। এরা একটা লাল পান্ডাকে যেভাবে রাখে, কিংবা একটা কালো ভাল্লুককে যেভাবে দর্শকের সামনে উপস্থাপন করে সেটার সাথে বাংলাদেশের চিড়িয়াখানার তুলনা করলে শুধুই কষ্ট বাড়ে। আমাদের চিড়িয়াখানাগুলোতে এখনো যে সম্পদ রয়েছে সেগুলোর সুন্দর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই কর্তৃপক্ষ একদিকে যেমন সমাদৃত হতেন, অপরদিকে অর্থনৈতিকভাবেও এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাবলম্বী করতে পারতেন।

ধারণা করি, চিড়িয়াখানা ব্যবস্থাপনা বিষয়ে খুলনা কিংবা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নিশ্চয়ই পড়ানো হয়। সেসব নিয়ে আমাদের লেখালেখির প্রয়োজন রয়েছে।

১। বাচ্চা ও মা ময়ূরী

Madonna and Child
ঐদিন তোলা সবগুলো ছবির মধ্যে এই ছবিটি দিনের সেরা ছবি বলে আমি মনে করি। ছবিটি খুবই সাধারণ আবার (আমার কাছে) খুবই অসাধারণ। মা ময়ূর তার একটিমাত্র বাচ্চার দিকে মাতৃদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। এদের যখন দেখি তখন একটা প্রশ্নই মাথায় এসেছিল–এর অন্য বাচ্চারা কোথায়। সাধারণত মা ময়ূরকে একসাথে ৮-১০টি বাচ্চা নিয়ে ঘুরতে দেখা যায়। গতমাসে যখন আসি তখন সেরকম কয়েকটা ময়ূর পরিবার দেখেছিলাম। হয়তো এই একটিই বেঁচে গিয়েছে। বাকীগুলো কোথায় কে জানে।

উটের প্রদর্শণীর কাছে রেইলিং-এর ওপাশে আমার থেকে ১-২ গজ দূরত্বে এরা বসে ছিল। ছবিটির এ্যাংগেল-এর কারণেই ময়ুরীটির মাতৃরূপ ফুটে উঠেছে বলে মনে করি। দেখা মাত্রই চট করে নীচু হয়ে ময়ূরটির চোখের লেভেলে দুটি ছবি তুলতে পেরেছিলাম। হয়তো অযাচিত মনে করেই উড়াল দিয়ে দূরে সরে গিয়েছিল।

২। পোলার বেয়ার বা মেরু ভল্লুক (পিছনে ফিরে তাকাচ্ছে মেরু ভল্লুক)
Polar Bear Looking Back at Denver Zoo

ডেনভার চিড়িয়াখানার অন্যতম আকর্ষণ এই পোলার বেয়ার। নানা কারণেই একে ভালো লাগে। এর শুভ্র তুলতুলে শরীর দেখলেই মনে হয় জড়িয়ে ধরি। কয়েক সপ্তাহ আগেও দেখেছিলাম কিন্তু আজ আরো শুভ্র দেখাচ্ছে। স্বাস্থ্যও বেশ ভালো হয়েছে। দুলদূরে শরীর দেখেই তা বেশ বোঝা যাচ্ছে। অলস ভঙ্গিতে এদিক ওদিক চলাফেরা করেই কাটে দিনের বেশীরভাগ সময়। মাঝে মাঝে চুপচাপ বসে থাকে। একবার বসলে আর ওঠার নাম করে না। গরম বেশী পড়লে নেমে আসে পানিতে।

Polar Bear Resting at Denver Zoo

Polar Bear at Denver Zoo

Polar bear resting at Denver Zoo

৩। ইংলিশ ল্যাভেন্ডার
IMG_3347
এটা মনে হয় ল্যাভেন্ডার। আমার ভুলও হতে পারে তবে কলোরাডোর প্রায় সর্বত্রই এদের দেখা যায়। বিশেষ করে সামারের শেষে জুলাই-অগাস্ট। হয়তো পরেও দেখা যায়। বাড়ির আশে আশে, রাস্তার ধারে নীলতে-বেগুনী এই ফুলের সমাহার। মৌমাছিরা সঙ্গত কারণেই এদের পিছু ছাড়ে না।

৪। মঙ্গোলিয়ান বুনো ঘোড়া
Mongolian Wild Horse at Denver Zoo
এদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী পৃথিবীর একমাত্র বুনো ঘোড়ার প্রজাতি যা এখনো অবশিষ্ট আছে। বাকীগুলোকে গৃহস্হালির কাজে পোষ মানানো হয়েছে। এই প্রজাতিকে কখনোই পোষ মানানো হয়নি। মজার ব্যাপার হল এই ঘোড়া যখন গত বছর দেখেছিলাম তখন এদের পা এবং ঘাড়ের কেশর আরো বড় ছিল। সম্ভবত বছরের এই সময়ে ওরা কেশরগুলো হারায় এবং পরবর্তীতের নতুন কেশর গজায়।

৫। ওকাপি ও তার বাচ্চা
Okapi at Denver Zoo
আমার খুবই প্রিয় এই প্রাণী। দেখুন কী সুন্দর গাঢ় বাদামী গায়ের রঙ। সেই সাথে পায়ে কী অদ্ভুত কারুকাজ। মা এবং বাচ্চা একই জায়গায় দাঁড়িয়ে খেয়ে যাচ্ছে অনবরত। একটি বারের জন্যও ওখান থেকে নড়েনি!

৬। চিতা
The Denver Cheetah!
এটাকে আমি বলি ডেনভার চিতা। এই ছবিটি হয়তো আগেও দেখে থাকবেন। কিন্তু আমার খুবই প্রিয় এই চিতা। বেচারার কাজই হলো এভাবে পোজ দেয়া। ঘাড় ঘুড়িয়ে সবার দিকে একবার করে তাকানো আর গড়াগড়ি খাওয়া। যতবারই যাই ততবারই একই রকমের একটা পোজের ছবি তোলার সুযোগ পাই। ভেরিয়েশন খুবই কম। দুটো আছে। কিন্তু বোঝার উপায় নেই কোনটা কে। হয়তো প্রাণিবিদরা ভালো বলতে পারবেন।

৭। গাছের মত বাড়ছে বয়স
Tree trunk at Denver Zoo
গাছটার বাকলগুলো দেখুন–কী সুন্দর বাড়ছে। কী অদ্ভুত এদের জীবন। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে জীবন পার করে দেয়! ভাবতেই মানুষ হয়ে জন্মাবার স্বার্থকতা খুঁজে পাই।

সবগুলো ছবিই আমার তোলা। ৬ডি ক্যামেরায় 70-200 F2.8 L IS II লেন্স দিয়ে তোলা। চিতার ছবিটি 300mm F4 L IS দিয়ে তোলা। ফ্লিকারে গেলে বিস্তারিত এক্সিফ দেখা যাবে। ছবিগুলো বিনা পয়সায় ব্যবহার করা যাবে তবে ব্যবহার করলে এই পোস্টের লিংক কিংবা ছবিগুলোর প্রকৃত লিংক (ফ্লিকারে) এবং ফটোগ্রাফারের নাম উল্লেখ করতে হবে।

সবাই ভালো থাকুন। সবাইকে বুনো ফুলের শুভেচ্ছা।
IMG_3354

শেষ।

+ Leave a Comment

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.