রাতের ডেনভার চিড়িয়াখানা

রাতের ডেনভার চিড়িয়াখানা


প্রকৃতি ও পরিবেশ বিশেষ করে পাখি ও বন্যপ্রাণি বিষয়ে আমার আগ্রহ প্রবল। একাডেমিক আগ্রহ নয় বরং ভালো লাগা বলা যায়। তাই সময় এবং সুযোগ হলেই যেখানে গেলে এসবের দেখা মেলে সেখানে যাওয়ার চেষ্টা করি। ঢাকা শহরে বেজি দেখলে কেউ যেমন অবাক হন, এখানে বাড়ির উঠোনে হরিণ দেখলেও কেউ বোধহয় ততটা অবাক হবেন না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার ইনস্টিটিউটের আশেপাশে অনেক বেজী ছিল, তাই বেজীর উদাহরণ দিলাম। ১৯৯০-২০০০ সময়কালে ছাত্র বয়সে আমরা ঢাকাকে যেমনটা দেখেছি, যেমনটা ধারণ করেছি, ঢাকাকে যেমনটা চিনতাম, সেই বিচারে ক্যাম্পাসে বেজির উপস্হিতি আমাকে অবাক করতো।

৩১শে ডিসেম্বর ২০১৩, আকাশ পরিষ্কার, ওয়েদার ফোরকাস্ট বলছে স্নো পড়বে না। তাছাড়া বছরের শেষ দিনটিও একটু ভিন্নভাবে কাটানো হবে। বাচ্চাদের আর বাচ্চাদের মা’কে নিয়ে চলে গেলাম ডেনভার চিড়িয়াখানায়।

ডেনভার চিড়িয়াখানার টিকিট বুথ -- এনায়েতুর রহীম

ডেনভার চিড়িয়াখানার টিকিট বুথ — এনায়েতুর রহীম

এই হল রাতের ডেনভার চিড়িয়াখানার টিকিট কাউন্টার। ভাবছিলাম থার্টিফার্সষ্ট নাইটে ভীড় কম হবে। কিন্তু এসে দেখি বিশাল লাইন। প্রায় আধা কিলোমিটার লম্বা। আমরা আবার চিড়িয়াখানার ফ্যামিলি মেম্বার। আর মেম্বারদের এরা বিশেষ খাতির করে। তাই আমরা দাঁড়ালাম মেম্বারদের জন্য বিশেষ লাইনে। মেম্বার হলেও রাতের জন্য ঠিকই টিকিট কাটা লাগবে। দুটো টিকিট আমরা মেম্বারশীপ কেনার জন্য ফ্রি পেয়েছিলাম। তাই বাচ্চাদের জন্য টিকিট কাটতেই এই লাইনে। টিকিট কাটা না লাগলে অন্য লাইন দিয়ে কম সময়েই ঢুকে পড়া যেতো। বড়জোড় ১০ মিনিট দাড়িয়েছিলাম। কার্ড দেখিয়ে সাথে ফটো আইডি দেখে ডিসকাউন্ট টিকিট কাটলাম। রাতের বেলা ৩ থেকে ১১ বছর বয়সীদের টিকিট ৮ টাকা। মেম্বারদের জন্য ১টাকা করে ডিসাউন্ট। এই ছবিটি তুলেছি ভিজিট শেষে।

ছোটবেলায় বাংলা বইয়ে পড়েছিলাম লন্ডনের চিড়িয়াখানা নামে একটা গল্প। সেখানে জেনেছিলাম বিদেশের চিড়িয়াখানা এত বড় হতে পারে যে ভালোভাবে দেখতে কয়েকদিন লেগে যায়। বাংলাদেশের তিনটি চিড়িয়াখানা দেখার সুযোগ আমার হয়েছিল–ঢাকা, রাজশাহী আর চট্টগ্রাম। সে অনেকদিন আগের কথা। তবে পরিস্থিতি বদলেছে বলে শুনিনি। ঢাকা চিড়িয়াখানাকেই হাজার গুন সমৃদ্ধ মনে হয়েছিল।

প্রবাসে ছোট বড় বেশ কয়েকটি চিড়িয়াখানা দর্শনের অভিজ্ঞতা হয়েছে। এসব চিড়িয়াখানা দেখে প্রথমেই একধরনের অহমিকাবোধ হয়েছে। মনে হয়েছে মিরপুর চিড়িয়াখানায় যা আছে তা তোমাদের রাখার জায়গাও নেই। একই সাথে কষ্টও হয়েছে আমাদের চিড়িয়াখানা ম্যানেজমেন্টের সাথে এদের ম্যানেজমেন্টের তুলনা করে। এরা গুটিকতক প্রাণিকে কত চমৎকারভাবে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করেছে তা না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।

জানা মতে জুয়োলজিক্যাল পার্ক-এর সংক্ষিপ্ত রূপ জু (Zoo). বাংলায় চিড়িয়াখানা শব্দটির চেয়ে জুয়োলজিক্যাল পার্কের মতো প্রাণিবাগান বা এরকম কোন নাম দেয়া গেলে মনে হয় আমরা এরকম প্রতিষ্ঠানের প্রতি আরো যত্নবান হতে পারতাম।

যাহোক, এরা চিড়িয়াখানায় কিভাবে প্রাণিদের প্রদর্শনী করে তা নিয়ে ভবিষ্যতে বিস্তারিত লেখার ইচ্ছে আছে। আজ আপনাদের অন্যরকম কিছু দেখাবো। রাতের চিড়িখানা। চিড়িয়াখানা যে রাতেও প্রদর্শন হতে পারে এবং সেখানে থেকে কর্তৃপক্ষের উপার্জনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে তা আগে জানা ছিলনা।

ডাউনটাউন ডেনভারে এই চিড়িয়াখানার অবস্থান। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১১৫ বছর আগে। এখানেই ডিসেম্বের শেষ সপ্তাহ থেকে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত সময়ে রাতে চিড়িয়াখানা দর্শনের ব্যবস্থা করেছে। উদ্দেশ্য চিড়িয়া প্রদর্শন নয়, বরং চিড়িয়ারূপী আলোকসজ্জা প্রদর্শন করা।

ফ্লেমিংগোর জলকেলি -- এনায়েতুর রহীম

ফ্লেমিংগোর জলকেলি — এনায়েতুর রহীম

ঢুকতেই চোখে পড়ে আলোর তৈরী বিশাল ময়ূর। সেখানে বাচ্চাদের ছবিতোলার হুল্লোড়ে আমি আর সুযোগ পেলাম না। তাছাড়া আলোর পরিমাণও বেশ কড়া। আরেকটু এগুতেই উপরের ছবিটির দৃশ্য দেখলাম। ফ্লেমিংগোরা জলকেলি করছে। এখানেও অনেক ভীড়। একটা সুযোগ পেলাম তোলার। বাল্ব-মোডে তুলেছি কিন্তু কেবল-রিলিজ ছাড়াই। তাই এক্সপোজার একটু বেশী হয়ে যাওয়ায় ফ্লেমিংগোর নড়াচড়া ছবিতে ধরা পড়েছে। এটা এই ছবির একটা বড় ত্রুটি।

আলো দিয়ে তৈরী মাকড়শার জাল--এনায়েতুর রহীম

আলো দিয়ে তৈরী মাকড়শার জাল–এনায়েতুর রহীম

এখানে পাতাহীন বিশাল এক গাছের তলায় আলো দিয়ে মাকড়শার জাল বুনে রেখেছে। অনেকটা রমনার বটমূলের মতো জায়গাটা। গাছের একদম নিচেই জাল পাতা। আর গাছে গাছে ফড়িং উড়ছে এমনটা সাজিয়েছে। জালের ক্লোজআপে দেখা যাচ্ছে একটা ফড়িং আটকা পড়েছে আর একটা মাকড়শা সেটা খেতে আসছে। সিকোয়েন্সটা এমন যে মাকড়শা ডান দিক থেকে এসে ফড়িংটা খেয়ে বাম দিক দিয়ে চলে যাবে। বাচ্চাদের জন্য শিক্ষণীয় একটা বিষয়।

গাছের উপর আলোকসজ্জা--এনায়েতুর রহীম

গাছের উপর আলোকসজ্জা–এনায়েতুর রহীম

সেখানে আরেকটি গাছে আলোকসজ্জা করেছে এমনভাবে যেন গাছ থেকে আলো খসে পড়ছে চুইয়ে চুইয়ে। স্হির ছবিতে এরকম দেখানো সম্ভব নয়। তাও লম্বালম্বা সাদা রেখাগুলো দেখে আন্দাজ করা যাবে হয়তো।

মেরু ভাল্লুক ও তার বাচ্চা--এনায়েতুর রহীম

মেরু ভাল্লুক ও তার বাচ্চা–এনায়েতুর রহীম

এখানে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান স্পন্সরশীপের মাধ্যমে তাদের পন্যের বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকে। বিনিময়ে তারা নানা রকম কাভারেজ পায়। উপরের ছবিতে যেমন দেখা যাচ্ছে ফ্লাইফ্রন্টিয়ার এয়ারলাইনস-এর বিজ্ঞাপন। নীচে মেরুভাল্লুক তার বাচ্চা নিয়ে খেলছে। মাঝখানে একটা সীল ঘাই মারছে।

ডেনভার চিড়িয়াখানায় মাউন্টেইন লায়ন বা পুমা ও তার বাচ্চা--এনায়েতুর রহীম

ডেনভার চিড়িয়াখানায় মাউন্টেইন লায়ন বা পুমা ও তার বাচ্চা–এনায়েতুর রহীম

কুগার বা মাউন্টেইন লায়ন বা পুমা যে নামেই ডাকিনা কেন এখানে মা কুগার বসে আছে আর তার বাচ্চা লুকোচুরি খেলছে।

ডেনভার চিড়িয়াখানায় শিশুদের জন্য ক্যারোসেল -- এনায়েতুর রহীম

ডেনভার চিড়িয়াখানায় শিশুদের জন্য ক্যারোসেল — এনায়েতুর রহীম

ভিতরে বাচ্চাদের জন্য আছে ক্যারোসেল (Carousel) যা শাহবাগ শিশুপার্কের কথা মনে করিয়ে দেয়। একদম সেই একই জিনিস। দুইটা ছবির প্রথমটা থামা অবস্থায় আর দ্বিতীয়টা স্লো শাটার স্পিডে তোলার কারণে মোশন ব্লার দেখা যাচ্ছে।

হাতির পালের জলকেলি--এনায়েতুর রহীম

হাতির পালের জলকেলি–এনায়েতুর রহীম

হাতির পাল পানিতে দাড়িয়ে পানি ছিটাছিটি করছে। একটা হাতি শুড় দিয়ে পানি তুলে সেটা মাঝেরটার গায়ে ছুঁড়ে মারছে। আর একেবারে ডানেরটা নিজে নিজেই গায়ে পানি ছিটিয়ে দিচ্ছে। সুন্দর একটা আলোকসজ্জা। বাচ্চা, বুড়ো, টিন-এজাররা সবাই এখানে দাড়িয়ে ছবি তুলছিল।

আলোকসজ্জিত ঐরাবত (হাতি) --এনায়েতুর রহীম

আলোকসজ্জিত ঐরাবত (হাতি) –এনায়েতুর রহীম

এই ছবিটা টয়োটার স্পন্সরে গড়া এলিফ্যান্ট প্যাসাজ-এ তোলা। আমি যেখানে দাঁড়িয়ে ছবি তুলেছি তার পিছনেই হাতির বাসা। টয়োটা মোটর কোম্পানি এটা স্পন্স করে। হাতিটির নকশা এতই সুন্দর যেন ভারতীয় সাজে সজ্জিত। ডেনভার চিড়িয়াখানার সবগুলো হাতিই এশিয়ান এলিফ্যান্ট যেটি আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পাওয়া যায়।

আলোকসজ্জিত পথ--এনায়েতুর রহীম

আলোকসজ্জিত পথ–এনায়েতুর রহীম

ডেনভার চিড়িয়াখানায় আলোক সজ্জিত কনডর --এনায়েতুর রহীম

ডেনভার চিড়িয়াখানায় আলোক সজ্জিত কনডর –এনায়েতুর রহীম

উপরে রাস্তা ধরে এলিফ্যান্ট প্যাসাজ পার হয়ে গাছের উপর ডানা ঝাপটানো শকুন দেখলাম। এরকম দৃশ্যও আগে কখনো দেখিনি। অসাধারণ লেগেছে। তবে তার চেয়েও অসাধারণ লেগেছে নীচের ছবি দুটি।

অনন্ত নক্ষত্রবীথির পথে --এনায়েতুর রহীম

অনন্ত নক্ষত্রবীথির পথে –এনায়েতুর রহীম

ছবিটি দেখে মনে হয় এই পথ যেন মিশে গিয়েছে অনত্র নক্ষত্রবীথিতে।

বর্ণচোরা গাছ --এনায়েতুর রহীম

বর্ণচোরা গাছ –এনায়েতুর রহীম

ছবির গাছটি যেন বর্ণচোরা, ক্ষণে ক্ষণে বদলাচ্ছে রং। এই সাদা তো এই সবুজ। সবুজ আস্তে আস্তে বদলে যাচ্ছে বেগুনী রঙে।

অবশেষে চিড়িয়াখানার শেষ প্রান্তে চলে এলাম। রাতও বেড়েছে। শীতের রাতে প্রায় তিনঘন্টা বাইরে থাকায় গ্লাভসের ভিতর আঙুলগুলো কষ্ট জানান দিচ্ছিল। বাড়ি ফিরলাম। শেষ হল স্মরণীয় একটি ভ্রমণ।

বি.দ্র. গুলো সবই বাল্ব-মোডে ম্যানুয়াল এক্সপোজারে তোলা।

+ There are no comments

Add yours

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.