রকি মাউন্টেন বন্যপ্রাণির অভয়ারণ্যে


আমরিকার পূর্ব প্রান্তের মানুষ এই মুহূর্তে বরফের নীচে চাপা পড়ে আছে। আর কালারফুল কলোরাডোর মানুষ মাথার উপর গনগনে সূর্য রেখে শার্ট গায়ে দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। একটু খোঁচা দিয়ে লিখতে ভালই লাগছে কেননা এরকম বরফের তলায় কাটিয়ে এসেছি নয় নয়টি বছর। তবে এখানেও তাপমাত্রা কমে শুন্যের নিচের নেমে যায়। গত সপ্তাহের আগের সপ্তাহে শুন্যের নিচে ১৫ ডিগ্রীতে গিয়ে ঠেকেছিল। এ সপ্তাহের পুরোটাই ১৫-২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। লোকে বলে কলোরাডোর আবহাওয়া যদি তোমার খারাপ লাগে তো আধা ঘন্টা অপেক্ষা কর। যার মানে হলো আধা ঘন্টার মধ্যেই রোদ উঠে সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে।

ইউরোপীয় শালিক

ইউরোপীয় শালিক

মধ্যাহ্নের আগেই হঠাৎ ঘুরে আসতে মন চাইল। তারচেয়েও বড় ব্যাপার হলো কিছু একটা লেখার তাগিদ। এর আগে কখনো লিখতে ইচ্ছে করেছে বলে মনে পড়ছে না। লেখার জন্য চাই উপকরণ আর আমার একমাত্র উপকরণ হলো ক্যামেরাবাজির ফাঁকিবাজি। সেজন্যই আজ রকি মাউন্টেন আর্সেনাল বণ্যপ্রাণির অভয়ারণ্যে (Rocky Mountain Arsenal Wildlife Refuge) খানিকটা সময় কাটানো হলো।

রকি মাইন্টেন আর্সেনাল অভয়্যারণ্য থেকে রকি মাউন্টেনের একাংশ

রকি মাইন্টেন আর্সেনাল অভয়্যারণ্য থেকে রকি মাউন্টেনের একাংশ

সময়টা ডিসেম্বরের ১৮, ২০১৩। শীতের প্রকোপ না থাকলেও এখন শীতকাল। প্রকৃতি তাই খানিকটা ন্যাড়া। গাছে পাতা নেই, মাঠের ঘাস তার সবুজ রঙ হারিয়েছে মাস দুয়েক আগেই। কলোরাডোর প্রেইরি ততটা রুক্ষ না হলেও কমনীয়তার ঘাটতি আছে। জালের মতো গাছগুলোর ফাঁক দিয়ে দেখা যায় রকি মাউন্টেটের চূড়ায় জমে থাকা বরফ। যেখানে দাঁড়িয়ে ছবি তুলেছি সেখান থেকে মাউন্টেন মাইল পঞ্চাশেক দূরে। অথচ মনে হয় কত কাছে।

এই অভয়ারণ্যে ঢুকলে প্রথমেই পড়ে বাইসনের আবাসস্থল। প্রবেশদ্বারে সতর্কবাণী দেয়া আছে–বাইসন বুনো প্রাণি এবং আনপ্রেডিক্টেবল অর্থাৎ এরা বড় আকারের গরু হলেও কখন তেড়ে আসবে তা আগে থেকে বোঝা যায় না। তাই দূর থেকেই ছবি তুলতে হবে এবং গাড়ি থেকে নামা বারণ। নিরাপত্তার জন্য অনেক জায়গায় রয়েছে তারের উঁচু বেড়া। বেড়ার কাছে না যাওয়ার জন্য দেয়া আছে নির্দেশনা। গাড়িতে বসে ঘুরতে একেবারে খারাপ লাগে না। তবে অনেক্ষণ ঘুরেও যখন কোন বন্যপ্রাণির দেখা মিলল না ঠিক তখনই একটা বাইসনের পরিবারের দেখা পাওয়া গেল। ক্যামেরা রেডি করা ছিলনা। রেডি করার ফাঁকে বেচারারা ঢিবি ডিঙিয়ে ওপারে অদৃশ্য হওয়ার আগে একটা মাত্র ছবি তোলা গেল।

বাইসন বিশালাকার ষাঁড়। মহিষের দেড়/দুই গুন হবে হয়তো। মাথাটা শরীরের তুলনায় বড় এবং ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দিয়ে ঢাকা। ধারণা করি এর একটা গুঁতোই আমার গাড়ি রাস্তা থেকে ফেলে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। তবে আশার কথা হলো এরা রাস্তার কাছাকাছি যাতে আসতে না পারে সেজন্য তারের বেড়া দেয়া আছে।

ফ্রোজেন লেক

ফ্রোজেন লেক

তাপমাত্রা ১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলেও কয়েকদিন আগের ঠান্ডায় পানি জমে বরফ হয়ে আছে। আসছে সপ্তাহে আবার শীত পড়বে বলে শোনা যাচ্ছে।

রাস্তার পাশে গাড়ি রেখে প্রেইরির ভিতরে যাওয়ার ট্রেইল আছে। গাড়ির ভিতর গরম লাগলেও নামার পরে ঠান্ডা কিছুক্ষণের মধ্যেই টের পাওয়া যায়। এটা লম্বা-ঘাসের প্রেইরি (Tall grass prairie). কিন্তু ঘাস প্রায় মরে গেছে, বুনো ঝোপঝাপড়াও মলিন। তারই ফাঁক দিয়ে দূরে রকি মাউন্টেন দেখা যাচ্ছে। ভরদুপুর ছবি তোলার জন্য ভালো সময় না হলেও একেবারে খারাপ আসেনি। খুব সকালে আর সন্ধ্যা নামার আগে আগে চমৎকার ছবি উঠবে তা আন্দাজ করতে পারছি।

প্রেইরির গাছ

প্রেইরির গাছ

 

প্রেইরি কুকুর

প্রেইরি কুকুর

অভয়ারণ্যের ভেতর দিয়ে পাকা রাস্তা। তার দুপাশে আফ্রিকার সাভানার মতো। এর মাঝে জায়গায় জায়গায় গর্ত খুঁড়ে বাসা করে আছে প্রেইরি কুকুর। দেখতে গিনিপিগের চেয়ে একটু বড় কিন্তু কুকুরের মতো লেজ আছে। মুখটা গিনিপিগের মতই। থাকে প্রেইরিতে। এজন্যই বোধহয় নাম হয়েছে প্রেইরি ডগ। মানুষ দেখলেই দুপায়ের উপর ভর দিয়ে দাড়িয়ে যায়। মানুষকে তেমন ভয় পায়না এরা। আমার সামনে দিয়েই দুইটা কুকুর রাস্তা পার হয়ে গেল। আমি ব্রেকে চাপ দিয়ে থেমে ক্যামেরা হাতে নিতে নিতেই রাস্তার ওপারে। গাড়ির ভিতর থেকে ছবি তুলে আরাম নাই।

ফেরার পথে কায়োটি (Coyote) যাকে বলে আমেরিকান শিয়াল–তার দেখা মিলেছিল। ছবিও তুলেছিলাম কিন্তু ক্যামেরায় ছিলো ওয়াইড লেন্স। পরে ছবি প্রসেস করার সময় পন্ডিত মশাইকে খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছিলনা। বনে ঘুরতে আসলে দুইটা ক্যামেরা থাকা দরকার–একটাতে ওয়াইড লেন্স, আরেকটাতে টেলিফটো। একটা ক্যামেরা থাকলে এরকম অভয়ারণ্যের জন্য সবচেয়ে ভালো হবে ক্যাননের ৭০-২০০মিমি জুম।

Categories

+ There are no comments

Add yours

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.