পাখি শিকার (১)


পাখি শিকারের নেশা আমার দীর্ঘ দিনের। সময়টা ১৯৯৩-১৯৯৪ হবে। সবে মাত্র ফটোগ্রাফির টেকনিকাল বিষয়ে তালিম নিয়েছি। সদ্য প্রয়াত শেখর ভাই, রনি ভাই, শরীফ ভাই আর সাজেদ ভাইয়ের কাছে তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষায় পাশ করে কোন সাবজেক্ট দেখলেই মনে মনে এক্সপোজার ঠিক করি। এখনকার ফটুরেরা হয়তো অনেকেই বুঝবেনা আমি কী বলছি। সে কথা থাক।

তখন ডিজিটাল ক্যামেরার নামও শুনিনি। ক্যামেরা যে ডিজিটাল হতে পারে সেরকম ভাবনা স্বপ্নেও ভাবিনি। ২০ টাকা দিয়ে রিভার ব্রাণ্ডের সাদাকালো রিল কিনতে পাওয়া যেতো। সেটা দিয়েই অন্যের এসএলআর ক্যামেরা ধার করে হাত পাকানোর চেষ্টা করা হতো। যারা একটু পয়সা কড়ি জমাতে পারে অথবা বাবার ক্যাশ থেকে সরাতে পারে তারা হয়তো ফুজির ৬০টাকা দামের সাদাকালো রিল, আর একটু সাহসী হলে ১১০ টাকা দিয়ে কালার রিল কিনে ছবি তুলতে পারে। কালারে ছবি তোলার সাহস যে যুগে হয়নি। কারণটা মূলত অর্থনৈতিক। ফটো তোলার ট্রেনিং নিতে গিয়ে প্রথমেই শুনেছিলাম এটি হল রাজাদের হাতি পালার মতো শখ। যা হারে হারে টের পেয়েছি এবং আজ ২০১৩ সনে এসেও একই দৈন্যের মুখোমুখি হচ্ছি। সেকথা নাহয় পরে হবে। আজ শিকারের কথা বলি।

পাখি শিকার দুই ধরনের। একটি হল পাখিকে প্রচলিত অর্থে শিকার বা বধ করা। দ্বিতীয়টি হল পাখিকে সেলুলয়েডে বা ডিজিটাল যুগে মেমরিতে বেঁধে ফেলা। বধ এবং বাঁধা দুটো একই রকমের শব্দ হলেও আমার পছন্দ দ্বিতীয়টিতে।

সেই আদিম কাল থেকেই আমার এরকম শিকারের শখ। কিন্তু সেটি তো হবার নয়। পাখি শিকার করতে লাগে লম্বা লম্বা লেন্স। যার ক্যামেরাই নাই তার লম্বা লেন্স থাকার তো প্রশ্নই আসেনা। তাই শুধু স্বপ্নেই পাখি শিকার করতাম। ১৯৯৬ এর জানুয়ারির ৬ তারিখে ছবি তোলার আগ্রহ দেখে আম্মা রাশান জেনিথ ক্যামেরা কেনার রসদ এবং অনুমতি দুটোই দিলেন। গিয়ে নিউ মার্কেটের তৎকালিন ট্রেড কর্পোরেশন নামক দোকান (যা পরবর্তীতে খাবারের দোকানে রুপান্তরিত হয়েছিল) থেকে জেনিথ ক্যামেরা কেনা হল। তারো বছর খানেক পরে ছোটভাইয়ের সহায়তায় স্টেডিয়াম মার্কেট থেকে একটা পুরনো ২০০মিমি টেলিফটো লেন্স কেনা হয়। শখের দাম আসলেই লাখ টাকা। সেসময় আড়াই হাজার টাকার ক্যামেরা আর দেড় হাজার টাকার লেন্স কিভাবে যোগাড় হয়েছিল সেটা ভাবতে বেশ অবাক লাগে। কিন্তু সেই লেন্স দিয়ে ছবি তোলার সাধ মেটানোর আগেই ক্লাবের এক ছোটভাই সেটি ধার নেয় এবং তার কাছে থাকাকালিন সময়ে কোন এক দুর্ঘটনায় লেন্সটি পঙ্গুত্ব বরণ করে। অনেক দৌড় ঝাঁপ করার পরেও ওটাকে আর ঠিক করা যায়নি। শিকারের আশা পুরণ না হলেও নেশাটা ঠিকই রয়ে যায়।

বহুদিন পরে পুরনো শখটাকে আবার জাগানোর চেষ্টা করছি। আর তার ফলাফল হিসেবে কয়েকটা তেমন-ভালো-নয় ছবি সচলায়তেনের পাঠকের সাথে শেয়ার করছি। পুরো গ্রীষ্ম জুড়েই হয়তো এরকম পোস্ট আরো কয়েকটা দিতে পারবো।

[b]১) কানাডা গুজ (Canada Goose) বা কানাডা রাজহাঁস[/b]। এটি খুবই কমন একটা পাখি। আমার কর্মস্থলের খুব কাছেই বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য। সেখানে ছোট্ট একটি লেগুন আছে। সেই লেগুনে নানা ধরনের হাঁস, পেলিক্যান, আর এই কানাডা গুজ-এর আনাগোনা। শীতের সময় লেগুনটু বরফ হয়ে যায়। আর গরমের সময় পাখির কলকাকলিতে থাকে মুখরিত। মানুষ আসে, হাঁসদের খাওয়ায়। হাঁসেরাও মানুষ দেখলেই কাছে চলে আসে।

O Canada (Goose)

উড়ন্ত পাখির ছবি তোলা একটু চর্চার ব্যাপার। তেমন কঠিন নয়। কিন্তু প্রথম প্রচেষ্টাতে সফল হওয়া একটু কঠিন। আস্তে আস্তে ব্যাপারটা রপ্ত করতে হয়। আমি শেখার চেষ্টা করছি। এই হাঁসটি অনেক দূরে ছিল। আমি দেখছিলাম ওটা পানির উপর থেকে উড়ি উড়ি করবে করবে এমন করছে। সাথে সাথে সেদিকে ক্যামেরা তাক করে ওর গতিপথের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ক্যামেরা প্যান করতে হবে এরকম প্রস্ততি রেখেছিলাম। ভাগ্য ভালো বলে ওটা আমার দিকেই আসছিল, যে কারণে তোলা অনেক সহজ হয়েছে। এক্সপোজার: ক্যানন ৪০ডি, ১/১৬০০, এফ৪, আইএসও ৪০০, লেন্স ৩০০ মিমি টেলিফটো।

[b]২) (ক, খ) রিং-ঠোঁট গাংচিল (Ring-billed Gull)[/b] ছবি দুটোতে দেখা যাচ্ছে অপরিণত রিং-ঠোঁট গাংচিল (Ring-billed Gull) পানি থেকে গমের দানা সংগ্রহ করছে। একই পাখির ছবি, কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে তোলা। কন্টিনিউয়াস মোডে ১/১০০০, ১৬০০, এফ ৪, আইএসও ৪০০ দিয়ে তোলা। প্রথম ছবিতে গাংচিলটির ঠোঁটের মাঝে গমের দানাটি দেখা যাচ্ছে। দ্বিতীয় ছবিতে দানাটিকে প্রায় গলাধকরণ করে ফেলেছে। গমের দানাগুলো দর্শনার্থীরা হাঁসের উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে দেয়, কিন্তু এই পাখিগুলো খুবই চতুরতা আর দ্রুততার সাথে ডুবন্ত দানাকে টুপ করে ধরে ফেলে।

_MG_0955
[b]২(ক)[/b] _MG_0956
[b]২(খ)[/b] [b]৩) আমেরিকান সাদা পেলিক্যান (American White Pelican)[/b]। পাখিটির এখন প্রজননের সময়। আর সে কারণেই লম্বা ঠোঁটের উপর একটি বর্ধিত অংশ দেখা যাচ্ছে। আকারে বিশাল এই পাখি অনেকটা রাজার মতো ওড়ে এবং পানিতে বিচরণ করে। এই লেগুনে দুইটি বা তার অধিক পেলিক্যান আছে। কিন্তু আমি একসাথে কখনোই পানিতে দেখিনি। একসাথে উড়তে দেখেছি একবার। ছবিও তুলেছি, কিন্তু ব্যাকগ্রাউন্ডে পাতাহীন গাছ থাকায় তেমন ভালো আসেনি। এক্সপোজার ১/৪০০০, এফ ৪, আইএসও ৪০০, লেন্স ৩০০ মিমি।

American White Pelican (Breeding)

[b]৪) কাস্পিয়ান টার্ন (Caspian Tern)[/b] এটি River Tern এর মতোই আরেকটি প্রজাতি। টার্নদের মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে আকারে বড়। ছবি তোলার সময় জানতাম না যে এটি কাস্পিয়ান টার্ন। পরে গাইডের সাথে মিলিয়ে জেনেছি। কাস্পিয়ান টার্ন চিহ্নিত করার সহজ উপায় হল এর আকার অন্যদের চেয়ে একটু বড়, আর ঠোঁট রক্তিম লাল এবং পা দুটি কালো। লাল ঠোঁট আর কালো পা (সম্ভবত) কাস্পিয়ান টার্নদের হয়। আমি ছবি দেখে যতটা জেনেছি। শতভাগ নিশ্চিত নই। এসব পাখি সঠিকভাবে চিহ্নিত করা একটু কঠিন।

Caspian Tern

এই ছবিটি শেয়ার করলাম শুধু ইন্টারেস্টিং ভঙ্গির জন্য। পাখিটি খুবই দ্রুত তার গতিপথ বদলাতে পারে, এবং চট করে নেমে পানির একদম কাছাকাছি চলে আসতে পারে। ছবি তোলা তুলনামূলকভাবে কঠিন কেননা গতিপথ আন্দাজ করা যায় না। প্রায়ই ক্যামেরার ফ্রেম থেকে উধাও হয়ে যায়। বার বার ঘাই মেরে পানির কাছে চলে আসলেও পানিতে নামতে দেখলাম না একবারও। ছবিতে টার্নটি প্রায় উল্লম্বভাবে উড়ছে কিন্তু তাকিয়ে আছে প্রায় নম্বই ডিগ্রি কোণে। আমার কাছে খুবই ইন্টারেস্টিং লেগেছে। এক্সোপোজার ১/২০০০ এফ ৫.৬, আইএসও ২০০, লেন্স ৩০০ মিমি।

পুনশ্চ: এই লেখাটি অকালপ্রয়াত শেখর রায়-এর জন্য নিবেদিত। শেখর ভাই আমার ফটোগ্রাফি, পাখি দেখা, ও ফিল্ডওয়ার্কের গুরু।

+ There are no comments

Add yours

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.