প্রকৃতির পাঠশালায়


কানাডিয়ান ফেডারেশন অফ স্টুডেন্টস (CFS) আয়োজিত দুই দিনের এক সিম্পোজিয়ামে গিয়েছিলাম ইউনিভার্সিটি অফ টরন্টো’র মিসিসাগা ক্যাম্পাসে। সিম্পোজিয়ামে গিয়ে দেখে এলাম একটি ছাত্র সংগঠন কিভাবে আগামীর লিডার তৈরী করে। সিম্পোজিয়ামের সেশনের পাশাপাশি চলেছে আমার প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ।

[b]জুন ১২, ২০০৯, শুক্রবার। বিকাল ৫টা।[/b] গ্রাজুয়েট স্টুডেন্ট সোসাইটির আমরা তিন কাউন্সিল-সদস্য পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক গাড়ি ভাড়া করে শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৫টায় টরন্টোর উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। মিশরীয় আহমেদ গাড়ি চালাবে। আমি আর সাজ্জাদ ভাই সময়মত এসেক্স বিল্ডিং এর সামেন হাজির হলাম। যাত্রা শুরু হলো। ঠিক ঠিক চার ঘন্টা পরে ইউনিভার্সিটি অফ টরন্টোর মিসিসাগা ক্যাম্পাসে পৌঁছুলাম। তখন সূর্য ডুবে গেছে, কিন্তু আলো আঁধারিটা কাটেনি। ইউনিভার্সিটির চারপাশ দিয়ে রিং রোড, তার মাঝখানে বিশাল এলাকাজুড়ে ক্যাম্পাস। রাস্তার দুপাশে ঘন ঝোপ আর তার পেছনে লম্বা লম্বা গাছের সারি। আহমেদ আস্তে আস্তে চালাচ্ছে গাড়ি। আমাদের ঠিক সামনেই ক্যাম্পাস পুলিশের প্যাট্রল এসইউভি। হঠাৎ কোন কারণ ছাড়াই পুলিশের গাড়িটা আস্তে আস্তে থেমে গেল। আমরা কিছু বুঝে উঠার আগেই দেখি [b]পুলিশের গাড়ির সামনে দিয়ে একটা হরিণ পার হচ্ছে[/b]। সাদা লেজ দেখেই চিনতে দেরি হলোনা, সাদা-লেজ হরিণ (White tailed deer)। হরিণ দেখে আমার হৃৎপিন্ড লাফিয়ে উঠল। ঠিক করলাম কাল খুব ভোরে ক্যাম্পাস দেখতে বের হবো। সকালের নাশতা দেবে সাড়ে আটটায়, এর আগেই যা দেখার দেখে ফেলতে হবে। এরকম জায়গায় এসে হরিণ দেখার আশা কখনোই করিনি। কিন্তু তখনো কি জানতাম টরন্টোর মত শহরে একটা ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে হরিণ এত সহজলভ্য হবে আর তার পিছনেই কেটে যাবে শ্বাসরুদ্ধকর একটা সকাল।

রাতে রুমে ফিরে হাতমুখ ধুয়ে শোয়ার আয়োজন করি। শোয়ার আগে জানালার স্ক্রীন সরাতেই পেছনের বিল্ডিংএর অপরূপ রূপ চোখে পড়লো। সেটাকে ক্যামেরায় ধারণ করলাম।
_MG_2633
ছবি: অসকার পিটারসন হল থেকে রয় আইভর হল রাতের বেলায় যেমন দেখায়। ৩০-সেকেন্ড এক্সপোজার দিয়ে রাত ১২টায় তোলা হয়েছে (আইএসও ১০০)।

পরদিন ভোরে ৪টয় ঘুম ভাঙলেও উঠতে ইচ্ছে করছিলনা। তাই একটু দেরি করে উঠলাম। সকালের ঘুমটা সবচেয়ে আরামের ঘুম। মোড়ামুড়ি করতে করতে দেরী করেই উঠলাম। দেখি ৭টা বেজে গেছে। তাড়াতাড়ি ক্যামেরা নিয়ে কিছুক্ষণের জন্য বের হলাম।

_MG_2634
ছবি: ডেমস্ রকেট ফুল (Dame’s Rocket)

_MG_2653
ছবি: সাউথ বিল্ডিং এর সামনে ফুল। এরা বলে অক্স-আই ডেইজি। (Ox-Eye Daisy)

দুপুরের খাবারের পরে আবার সেশন শুরু হলো। এবারের সেশনে আমাদের ভিন্ন ভিন্ন গ্রুপে ভাগ করে দিয়ে একটা এ্যাসাইনমেন্ট ধরিয়ে দিল। কী এ্যাসাইনমেন্ট সেটাতে যাচ্ছি না। আমরা বাইরে এসে একসাথে বসলাম আলোচনা করার জন্য। আলোচনা শেষে একজনকে দায়িত্ব নিতে হবে সবার সামনে সেটা উপস্থাপন করার।

হঠাৎ পাশের ঝোপ থেকে বেরিয়ে এলো একটা হরিণের বাচ্চা। আমার তো শ্বাস বন্ধ হওয়ার অবস্থা। দ্রুত গতিতে ক্যামেরা তাক করতেই ওটা ততোধিক দ্রুতগতিতে আড়ালে হারিয়ে গেল। জীবনের প্রথম ওয়াইল্ড লাইফ ছবি তোলার উত্তেজনায় গ্রুপের কথা ভুলে গেলাম। উঠে ছুটলাম হরিণের পিছনে। হরিণ খুবই সংবেদনশীল প্রাণি, সামান্য শব্দেও ওরা দৌড়ে পালায়। কিন্তু এখানকার হরিণের সংবেদনশীলতা বেশ কম। [b]আস্তে আস্তে এগিয়ে গিয়েই দেখি বাচ্চা সহ ঘাস খাচ্ছে।[/b] এত সুন্দর দৃশ্য আমি জীবনেও দেখিনি। কিন্তু সামনে ঝোপঝাড় থাকার কারণে ফোকাস করতে অসুবিধা হচ্ছিল। কারণ ক্যামেরা ছিল অটোফোকাস মোডে। (ঝোপের মধ্যে লুকানো ওয়াইল্ড লাইফের ছবি তুলতে জীবনেও কেউ এই ভুল করবেন না)। উত্তেজনায় আমার হাঁটু কাঁপা শুরু হয়ে গেল। ভুলেই গেলাম ফোকাস মোড ম্যানুয়ালে নিতে। যাহোক, হরিণটা এবার আমাকে দেখে ফেলল। চট চট করে কয়েকটা ছবি তুলে নিতেই দৌড়ে পালিয়ে গেল। বাচ্চা হরিণটা মায়ের পিছু পিছু দৌড়। পুরা ব্যাপারটা ঘটে গেল এক মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে।
_MG_2710
ছবি: সাদা-লেজ হরিণ ৫০-৬০ মিটার দূরত্বে। বাচ্চাটা ওর পেছনেই আছে, নীচু হওয়ার কারণে দেখা যাচ্ছেনা।

_MG_2712
ছবি: সাদা-লেজ হরিণ রাডারের মত কান তাক করে আছে আমার দিকে।

উল্লেখ্য যে, সাদা-লেজ হরিণের গায়ের রং বাদামী। এদের লেজের ডগায় সাদা রং থাকে বলে এমন নামে ডাকা হয়। গায়ে কোন তিল বা স্পট নেই। কিন্তু বাচ্চা হরিণের গায়ে স্পট থাকে। নিচের ছবিতে তাদের পালিয়ে যাওয়াটা ধরতে পেরেছি। কিন্তু কপাল খারাপ; বাচ্চাটার মাথার জায়গা একটা শুকনা ফুলের আড়ালে পড়ায় দেখা যাচ্ছেনা। তবে ভালো করে লক্ষ্য করলে বাচ্চা হরিণের গায়ের স্পট দেখা যায়।
_MG_2714
ছবি: বাচ্চা সহ মা হরিণের পালিয়ে যাওয়া।

[b]জুন ১৪, ২০০৯। রবিবার। ভোর ৫টা।[/b] গতকালই ঠিক করেছিলাম খুব সকালে উঠে ক্যাম্পাস ঘুরে দেখবো। ভাগ্য ভালো হলে বাচ্চা সহ হরিণের দেখাও মিলতে পারে। ঘুম ভাঙলেও উঠতে ইচ্ছে করছিল না। বাইরে তখনো অন্ধকার কাটেনি। জানালা দিয়ে রয় আইভর হলের সামনে তাকাই– কেমন একটা ছমছমে ভাব। তারপর আবার একটুখানি ঘুমিয়ে পড়ি। পৌনে ছয়টার দিকে উঠে ফজরের নামাজ পরে তাড়াতাড়ি ক্যামেরাটা হাতে নিয়েই বেরিয়ে পড়লাম। অসকার পিটারসন হলের পেছনের গেট দিয়ে বের হয়ে একটু জংলা মতো আঁকাবাঁকা রাস্তা পার হয়ে পিচঢালা রিংরোডে উঠতেই দেখি বড়সর একটা ড়্যাকুন ডান দিকের জঙ্গল থেকে বেরিয়ে রাস্তা পার হয়ে বাম দিকের জঙ্গলে যাচ্ছে।
_MG_2728
ছবি: ড়্যাকুনের রাস্তা পার হওয়া।

ড়্যাকুন ততটা ভয়ঙ্কর প্রাণি না হলেও বিপদে পড়লে [url=http://wiki.answers.com/Q/Will_raccoons_attack_humans]মানুষকেও আক্রমন করে বসে[/url]। দূর থেকে ছবি তুলে ওর পিছু নিলাম। ওটা জঙ্গলে ঢুকে গেলে, দ্রুত রাস্তাটা পেরিয়ে ওর পিছু পিছু আমিও ঢুকে পড়লাম। একটু ভয় ভয় লাগছিল, আবার আক্রমন না করে বসে। তখন প্রায় ৬টা বাজলেও ছবি তোলার মত যথেষ্ট আলো নেই। এত অল্প আলোতে ছবি তোলার মত ফাস্ট লেন্স আমার নেই তবুও কয়েকটা ছবি তুলাম। কম সাটার স্পীডে তোলার কারণে ছবি কেঁপে গিয়েছে।
_MG_2733
ছবি: ড়্যাকুন, আমাকে পেছনে আসতে দেখে ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

জঙ্গলের বেশী গভীরে ঢোকার সাহস করলাম না। আবার রিং রোডে উঠে হাঁটতে থাকি। হেঁটে আরেকটু এগিয়ে যেতেই রাস্তার পাশে জঙ্গলে একটু খসখস শব্দ। তাকিয়ে দেখি গাছের গায়ের সাথে কোয়ালার মতো কি যেন একটা লেপ্টে আছে। সাবধানে কাছে যেতেই দেখি ড়্যাকুন। মনে হয় কম বয়সী, তাই আমাকে দেখেই আড়ালে যেতে চাইছে। এত লাজুক যে তাকায়ই না। প্রায় ১৫ মিনিট ক্যামেরা তাক করে ঘাপটি মেরে বসে থাকলাম, তবুও তাকালনা।
_MG_2739
ছবি: ড়্যাকুনের বাচ্চা (অথবা অপূর্ণবয়স্ক)।

_MG_2753
ছবি: Little-ringed Plover.

_MG_2747
ছবি: Little-ringed Plover বেশ কয়েকটা একসাথে নাচানাচি করছে। সম্ভবত এদের প্রজনন কাল। পুরুষটা নানা অঙ্গভঙ্গি করে স্ত্রী পাখিটাকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে।

_MG_2756
ছবি: একসময় উপরে তাকিয়ে দেখি বেলা বেশ হয়েছে।

আর তখনই রাস্তার ওপারে ডান পাশে কিসের যেন নড়াচড়া। আমি ভাবছি [b]হয়তো গরু বা ছাগল গাছের পাতা খাচ্ছে। কিন্তু কিসের গরু, এটা তো সাদা-লেজ হরিণ! [/b]

_MG_2759
ছবি: সাদা-লেজ হরিণ (White-tailed Deer)।

_MG_2766
ছবি: শিং না থাকায় ভেবেছিলাম এটা স্ত্রী হরিণ, তবে কনফার্ম হলাম।

তারপর সন্তর্পনে অনুসরণ আর আড়াল থেকে ছবি তোলা। এভাবেই হরিণের পেছনে কেটে গেল ১ ঘন্টা।
_MG_2780
ছবি: উল্লেখযোগ্য সাদা লেজ– যেকারণে এদের নাম সাদা-লেজ হরিণ।

_MG_2783
ছবি: মেইন রোড মাত্র ২৫০-৩০০ মিটার দূরে, হয়তো কোন শব্দ শুনেই এভাবে তাকিয়েছে।

_MG_2791
ছবি: রাস্তার পার হয়ে যাচ্ছে।

ওপাশে বেশ জংলা। এর পর ওটাকে আর ফলো করতে পারিনি।
_MG_2796
ছবি: ইউনিভার্সিটি অব টরন্টো, মিসিসাগা ক্যাম্পাসের প্রবেশ পথ।

_MG_2797
ছবি: প্রবেশ পথের উল্টো পাশেই আরো বিরাট বন।

_MG_2802
ছবি: সেই বনের ভিতরে লম্বা লম্বা গাছপালা।

_MG_2800
ছবি: গাছের ডালে আমেরিকান রবিন।

_MG_2816
ছবি: ফিলাডেলফিয়া ফ্লিবেন (Philadelphia Fleabane)।

_MG_2814
ছবি: বুনো সরিষা।

_MG_2817
ছবি: বেলা বেশ বেড়েছে। এবার ফেরার পালা।

Categories

+ There are no comments

Add yours

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.