বোকে/বোকেহ (Bokeh)


আলোকচিত্রের পরিভাষায় বোকে (Bokeh) বলতে সাধারণতঃ সেই ছবিকে বোঝায় যেখানে ছবির মূল বিষয়কে ফুটিয়ে তুলতে আশেপাশের বিষয়গুলোকে অস্পষ্ট বা ঘোলা (Blur) করে দেয়া হয়। এটি করা হয় ছবির মূল বিষয়বস্তুকে ফোকাস এবং চারপাশের বিষয়বস্তুগুলোকে আউট-অব-ফোকাস রেখে। আলোকচিত্রে বোকে শব্দটি একেবারেই নতুন; ২০০০ সনের আগে আলোকচিত্রে এর উল্লেখ পাওয়া যায়না [১]।

জাপানি শব্দ boke থেকে বোকে’র উৎপত্তি। জাপানী ভাষায় boke অর্থ ঘোলা (Blur) বা অস্পষ্ট (hazy)। পরবর্তীতে ইংরেজী ভাষাভাষীদের উচ্চারণের সুবিধার জন্য boke এর সাথে h যোগ করে bokeh করা হয়েছে [২]। যেহেতু মূল শব্দটি ভিন্ন একটি ভাষা থেকে এসেছে তাই উচ্চারণে বিভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। “বোকে”, “বোকেহ”, “বুকে”, “বোক-এই”, কিংবা “বোক-আ” [৩] প্রভৃতিভাবে একে উচ্চারণ করা যেতে পারে।

কৌশলগত বিষয়

বোকে করার মূল কৌশলটি হলো অনুল্লেখযোগ্য বিষয়বস্তুকে আউট অব ফোকাস করা; যেটা সরাসরি করা যায় স্পষ্ট স্থানের স্বল্প গভীরতা (Shallow depth of field) নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে (চিত্র ১ দ্রষ্টব্য)। অর্থাৎ মূল বিষয়কে ফোকাসে রেখে লেন্সের এ্যাপারচার যতটা সম্ভব বড় করে (f নাম্বার ছোট করে) ছবি তুললে চারপাশের সবকিছু ঘোলা হয়ে যায়। কিন্তু কতটা ঘোলা হবে সেটা নির্ভর করে দুটি বিষয়ের উপর: (১) লেন্সের এ্যাপারচার, (২) লেন্সের ফোকাস দূরত্ব।
shallow_depth_of_field
চিত্র ১: স্পষ্ট স্থানের স্বল্প গভীরতা (Shallow depth of field)

প্রথমতঃ এ্যাপারচার যত বড় অর্থাৎ f নাম্বার যত ছোট, তত বেশী আলো লেন্সে প্রবেশ করতে পারে। যেমন f=১.৮ লেন্স দিয়ে যত বেশি ঘোলা করা যাবে f=৫.৬ দিয়ে ততটা ঘোলা করা সম্ভব হবেনা। এ্যাপারচার বড় করলে ছবি কেন ঘোলা হয়ে যায় সেট বুঝতে হলে কিছুটা পদার্থবিজ্ঞান বুঝতে হবে। সংক্ষেপে বলা যায়– ছবির ভ্রান্তি-বৃত্তের (Circle of confusion) বৈশিষ্টের কারণে এমনটা হয়ে থাকে।

দ্বিতীয়তঃ টেলিফটো লেন্স দিয়ে যতটা ঘোলা করা যাবে সাধারণ লেন্স দিয়ে ততটা ঘোলা করা সম্ভব হবেনা। অর্থাৎ কোন বিষয়বস্তুকে যদি ২০০মিমি ফোকাস দূরত্বে ফোকাস করা হয় তাহলে যতটা বোকে এফেক্ট পাওয়া যাবে, ৩৫মিমি এ ফোকাস করলে ততটা বোকে হবেনা। আবার ২০০মিমি-এ ফোকাস করে এ্যাপারচার ১.৮এ যতটা বোকে হবে, ৫.৬এ ততটা বোকে হবেনা।

বোকের মান (Bokeh quality)

ক্যামেরার লেন্স যখন কোন বস্তুকে ফোকাস করে তখন এর উল্টো প্রতিবিম্ব ফিল্মের উপর (হালের ডিজিটাল ক্যামেরার ক্ষেত্রে সেন্সর-এর উপর) পড়ে। ফোকাস যতটা ভালো হয়, ততটা শার্প ছবি পাওয়া যায়। ফোকাস যদি ঠিক না হয়, তাহলে বস্তুর ঘোলা ইমেজ সেন্সর-এর উপর পড়ে। সাধারণত অস্পষ্ট স্থানগুলো থেকে নির্গত আলো তখন সুক্ষ্ণভাবে না পড়ে কিছুটা বৃত্তাকারে ছড়িয়ে পড়ে। এই ছড়িয়ে পড়াটা নির্ভর করে ক্যামেরার মান, এবং লেন্সে কয়টি ব্লেড দিয়ে এ্যাপারচার নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে, তার উপর। কৌশলগতভাবে বলতে গেলে কোন লেন্সের নির্মাণকৌশলও বোকের মানকে প্রভাবিত করে। যে লেন্সের গোলাকার বিচ্যুতি (Spherical aberration) যত কম তার সেই লেন্সে ছবির মান ভালো হবে, বোকে হবে ষড়ভুজাকার। গোলাকার বিচ্যুতি বেশি হলে (সাধারণ মানের লেন্স) আলোর ছটা বৃত্তাকারে ছড়িয়ে পড়বে। সাধারণ মানের লেন্স দিয়ে অস্পষ্ট আলোরশ্নি বৃত্তাকারে ছড়িয়ে পড়ে (চিত্র ২(b) দ্রষ্টব্য), আর উন্নতমানের লেন্সে আলোর ছটা পুরোপুরি বৃত্তাকার না হয়ে ষড়ভুজাকৃতির হয় (চিত্র ২(a) দ্রষ্টব্য)। সাধারণমানের লেন্সে তোলা ছবি খুব উন্নতমানের না হলেও বোকে করার জন্য এসব লেন্স খুবই সুবিধাজনক।

Bokeh_Quality_Comparison
চিত্র ২: বোকে কোয়ালিটি, (a) উন্নতমানের লেন্সের ষড়ভুজাকার আলোকবৃত্ত (ছবির সূত্র: উইকিপিডিয়া) (b) সাধারণ লেন্সের বৃত্তাকার আলোকবৃত্ত।

আভিধানিকভাবে বোকে যদিও ঘোলাটে ব্যাকগ্রাউন্ডের সাথে সম্পর্কিত, অধিকাংশ বোকে ছবিতেই ব্যাকগ্রাউন্ডের আলোকবৃত্তের পরিষ্ফুটন মূল বিষয়বস্তুর মতই উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠে।

বোকের উদাহরণ ও আলোচনা

_MG_2143
চিত্র ৩: অজানা গাছের নতুন পাতা। অজিবওয়ে ন্যাচার পার্ক, মে ২০০৯।

উপরের ছবিটি আজ বিকেলে ন্যাচার পার্কে তোলা। বোকের মূল বিষয় হলো ছবির ব্যাকগ্রাউন্ডে আলো থাকতে হবে। যদিও আলোকচিত্রের ক্ষেত্রে ব্যাকগ্রাউন্ড-আলো একটা অসুবিধাজনক দিক, বোকের জন্য সেটা আবার ততটাই সুবিধাজনক। কারণ, শুধু চারপাশের বিষয়বস্তুকে আউট-অব-ফোকাস করলে ততটা সুন্দর লাগতোনা, যতটা ভালো লাগছে এই আলোর বৃত্তগুলো থাকার কারণে। ছবিটি তোলার জন্য ক্যামেরাকে বিষয়ের একদম কাছে নিয়ে তারউপর বেশ খানিকটা জুম করে ম্যানুয়ালি ফোকাস করা হয়েছে। ১০৯ মিমি ফোকাস, এক্সপোজার ছিল ৫.৬/৪০০।

_MG_2145
চিত্র ৪: আরেকটি অজানা গাছের নতুন পাতা। অজিবওয়ে ন্যাচার পার্ক, মে ২০০৯।

এখানে বোকে এফেক্ট খুবই সুন্দর এসেছে। বিশেষতঃ আলোর ছটাগুলো বৃত্তাকার হওয়ায় সুন্দর লাগছে। এখানে জুমের পরিমান খুব কমও না, বেশিও না। ৭৫মিমি, ৫.৬/২৫০, এপারচার প্রায়োরিটি মোডে, ম্যানুয়ালি ফোকাস করা।

_MG_2153
চিত্র ৫: অজানা ফুলঝুরি। অজিবওয়ে ন্যাচার পার্ক, মে ২০০৯।

এই ছবিটা একটু বেশি জুম করা হয়েছে। ১৩৫মিমি, এক্সপোজার ৫.৬/২০০, এপারচার প্রায়োরিটি মোডে, ম্যানুয়ালি ফোকাস করা। বেশি জুমের কারণে আলোকবৃত্তগুলো একটার সাথে আরেকটা প্রায় মিশে গিয়েছে। ব্যাকগ্রাউন্ডে বেশি আলো থাকায় মূল ছবি যেন অনুজ্জ্বল না হয়ে পড়ে সেজন্য ফ্ল্যাশ ব্যবহার করা হয়েছে।

ছবিগুলোতে কোয়ালিটির চেয়ে “উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার” প্রাধান্য পেয়েছে।

সূত্র:

[১] Christopher Nisperos, Roger Hicks (2000). Hollywood Portraits: Classic Shots and how to Take Them. Amphoto Books. ISBN 0817440208.

[২] ইংরেজী উইকিপিডিয়া

[৩] Merklinger, Harold (1996) .Understanding Boke.


+ There are no comments

Add yours

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.