কমোডো ড্রাগনের বিস্ময়কর প্রজনন


যৌন প্রজনন ছাড়া বংশবিস্তারের ঘটনা প্রকৃতিতে বিরল নয়। সাধারণত নিন্ম শ্রেণীর প্রাণিতে এ ধরনের প্রজনন দেখা গেলেও কমোডো ড্রাগনের (Komodo Dragon) মত সরিসৃপ প্রাণি পুরুষ সঙ্গী ছাড়াই এবার ডিম দিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সম্প্রতি বিজ্ঞান বিষয়ক জার্নাল ন্যাচার (Nature)-এ প্রকাশিত এক গবষণাপত্রে বলা হয় লন্ডনের চেস্টার চিড়িয়াখানার ফ্লোরা নামের এই স্ত্রী ড্রাগনটি বছরের মে মাসে মোট এগারটি ডিম দিয়েছে পুরুষ কোন সঙ্গী ছাড়াই।

এভাবে প্রজননকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় পার্থনোজেনেসিস যা এক ধরনের অঙ্গজ প্রজনন। তিনটি ডিম নষ্ট হলেও চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ আশা করছে বাকি আটটি ডিম থেকে কৃসমাস নাগাদ বাচ্চা ফুটে বের হবে। নষ্ট ডিমগুলির জেনেটিক পরীক্ষা (DNA test) করে এব্যাপারে তারা নিশ্চিত হয়েছে যে বাচ্চাগুলো পুরোপুরি তাদের মায়ের মত হবে না তবে তাদের জেনেটিক গঠন কেবলমাত্র মায়ের কাছ থেকেই এসেছে। এ থেকে গবেষকরা সিদ্ধান্ত পৌঁছেছেন যে এটি অযৌন প্রজনন।

অস্বাভাবিক তবে নতুন নয়
এর আগে আরো একটি কমোডো ড্রাগন বাচ্চা দিয়েছিল একই ভাবে। সাংগাই নামের সেই স্ত্রী ড্রাগনটি তার পুরুষ সঙ্গীর সাথে থাকার প্রায় দুই বছর পরে বাচ্চা দিয়েছিল এবং সে ড্রাগন ছানাগুলো এখন সুস্থ ও স্বাভাবিক ভাবেই বড় হচ্ছে। গবেষকগণ সেই বাচ্চাগুলোর জেনেটিক পরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়েছেন যে সেগুলোও পার্থেনোজেনেসিস প্রকৃয়ায় জন্ম নিয়েছে। তবে এটা ভাবার কোন কারণ নেই যে কমোডো ড্রাগন এভাবেই তার বংশ বিস্তার করে। সাংগাই ড্রাগনটি পরবর্তীকালে তার পুরুষ সঙ্গী রাজার সাথেও স্বাভাবিক প্রকৃয়ায় যৌন প্রজননের মাধ্যমে আরো বাচ্চা দিয়েছিল।

লন্ডন জুয়োলজিক্যাল সোসাইটির কিউরেটর রিচার্ড গিবসন এর মতে “প্রায় ৭০ প্রজাতির মেরুদন্ডি প্রাণির মধ্যে পার্থেনোজেনেসিস প্রকৃয়ায় বংশবিস্তার করার ব্যাপারটি আবিস্কৃত হয়েছে যা সবসময়ই অস্বাভাবিক (unusual) তবে অসাধারণ (abnormal) হিসেবেই গন্য হয়েছে।” তিনি আরো বলেন, কিছু প্রজাতির সাপ, মাছ এবং নিম্ন প্রজাতির (minor) টিকটিকি জাতীয় প্রাণির মধ্যে দেখা এধরনের প্রজনন দেখা গিয়েছে। তাঁর মতে “যেহেতু একই ঘটনা দুটি আলাদা আলাদা অথচ একই জাতীয় প্রাণির মধ্যে পাওয়া গেল সেহেতু এধরণের ঘটনা প্রকৃতিতে হয়তো আরো ঘটে কিন্তু মানুষের অজানা।”

এ ধরনের ঘটনা কেন ঘটে?
বলা যায় প্রকৃতিক প্রয়োজনেই এধরনের পদ্ধতিতে বংশবিস্তার করেছে কমোডো ড্রাগন। গিবসনের মতে বিশেষ করে দীর্ঘ দিন পুরুষ ড্রাগনের সংস্পর্শে না থাকার কারণেই হয়তো পার্থেনোজেনেসিস প্রকৃয়ায় এই বংশবিস্তার। উদাহরণস্বরুপ তিনি মন করেন, প্রাকৃতিক কোন বিপর্যয়ের কারণে হয়তো কোন এলাকার একমাত্র পুরুষ ড্রাগনটি মারা গেলে অথবা সমুদ্রে ভেষে গেলে স্ত্রী ড্রাগনেরা অযৌন পদ্ধতিতে বংশরক্ষা করে থাকে। আর এটাই হয়তো প্রকৃতির নিয়ম। তিনি আরো বলেন এভাবে বংশবিস্তারের ক্ষমতা সম্ভবত তারা তাদের পূর্বপুরুষ থেকেই পেয়েছে।

অযৌন প্রজননের খারাপ দিক
সাধারণভাবে মনে হতে পারে পুরুষ ছাড়াই যখন বাচ্চা দিতে পারে তাহলে তো ব্যাপারটা ভালই। হ্যাঁ, তবে তা সাময়িক। এধরনের প্রজননের মাধ্যমে জন্মানো ড্রাগনের মধ্যে বংশগত বৈচিত্র থাকেনা। অর্থাৎ এরা কেবলমাত্র স্ত্রী ড্রাগনের জেনেটিক বৈশিষ্ট নিয়েই জন্মায়। যার ফলে জন্মানো সব ড্রাগনই জেনেটিকভাবে একই হয়। বলা যেতে পারে এক ধরনের ক্লোন। পরিবর্তিত পরিবেশের সাথে এরা সাধারণত সহজে খাপ খাওয়াতে পারে না। ফলে কোন প্রাকৃতিক দূর্যোগে যেমন খাদ্যাভাব বা রোগবালাই কিংবা নতুন কোন শিকারী প্রাণির হাত থেকে এরা নিজেদের সহজে রক্ষা করতে নাও পারতে পারে যা প্রজাতির বিলুপ্তির কারণ হতে পারে।

কয়টি ড্রাগন রয়েছে?
এ পর্যন্ত প্রকৃতিতে মোট ৪০০০ (চার হাজার) এরও কম সংখ্যক কমোডো ড্রাগন বেঁচে আছে বলে জানা যায়। ইন্দোনেশিয়ার তিনটি দ্বীপ– কমোডো, ফ্লোরেস এবং রিনকা তে কমোডো ড্রাগন পাওয়া যায়। একটি পূর্ণবয়স্ক কমোডো ড্রাগন লম্বায় প্রায় ১০ ফুট এবং ওজন হয় ৯০কেজি পর্যন্ত। এরাই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় লিজার্ড। এরা মাংশাশি এবং এদের খাদ্য তালিকায় ছোট প্রাণি থেকে শুরু করে মানুষ পর্যন্ত রয়েছে।

-বিবিসি অবলম্বনে
http://news.bbc.co.uk/2/hi/science/nature/6196225.stm?ls

+ There are no comments

Add yours

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.