ইকো ও নার্গিস ফুলের গল্প


এক ছিল পরী। নাম ছিল তার ইকো। সে সারাদিন বন-জঙ্গল, পাহাড়-পর্বত, খালবিল আর নদীর পাড় দিয়ে লাফিয়ে আর নেচে বেড়াতো। তার চেহারা এতো চমৎকার ছিল যে সবাই শুধু তার দিকে তাকিয়েই থাকতো। কিন্তু সে এতো বেশি কথা বলতো যে কারো সাথে কথা বলা শুরু করলে আর থামতেই চাইতো না। ঘন্টার পর ঘন্টা সে এতো বেশি বকবক করে চলতো যে তার সঙ্গীরা শেষ পর্যন্ত ভীষণ বিরক্ত হয়ে উঠতো। ইকোর বেশি অনবরত কথা বলায় একবার দেবতা জুনো এতো বেশি বিরক্ত হলেন যে তিনি তার কথা বলার ক্ষমতা বন্ধ করে দিলেন। তারপর থেকে ইকো লোকজনের কথার মাত্র দু’তিনটে শব্দ অনুকরণ করতে আবার বলতে পারতো। মাঝে মাঝে সে পশুপাখির ডাকও নকল করতে পারতো।

হুতোম পেঁচার ডাক শুনে সে বলে উঠতো – “হুতোম”।

ব্যাঙের ডাক শুনে সে বলে উঠতো – “ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ”।

রাজহাঁসের ডাক শুনে সে বলতো – “হংক্ হংক্”।

ইকোর জীবনটা কথা বলতে না পেরে খুবই একঘেয়ে হয়ে গেল। কিন্তু একদিন ইকোর স্বাভাবিক জীবনে ঘটে গেল অস্বাভাবিক এক ঘটনা।

সেদিন সে অন্যান্য দিনের মতোই আপন মনে বনের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। এমন সে এমন সুন্দর একটি ছেলেকে দেখল যাকে সে সারাজীবনেও দেখেনি। সুদর্শন ছেলেটি ছিল নার্সিসাস নামের একজন শিকারী। তাকে দেখে ইকো মনে মনে ভাবলো – ছেলেটা কি সুন্দর ! আমি স্বপ্ন দেখছি না তো ? সে দু’হাতের আঙুলগুলো মুঠো করে চোখ রগড়ালো। তারপর চোখ খুলে আবারও ছেলেটিকে দেখতে পেল।

ইস ! ছেলেটা যদি কোন কথা বলতো আর আমি সেগুলো নকল করতে পারতাম ! – ইকো ভাবলো।

ইকো কিন্তু জানতো না যে সুদর্শন ছেলেটা নিজেকে নিয়ে এতোই মগ্ন ছিল যে অন্য কোনদিকে তার কোন খেয়ালই ছিলনা। নার্সিসাস এগিয়ে চললো। ইকোও তার পেছন পেছন গাছের আড়ালে আড়ালে এগিয়ে চললো। নার্সিসাস ইকোর পায়ের শব্দে ঘুরে দাঁড়িয়ে বললো- এই মেয়ে।

ইকোও শুরু করলো – এই মেয়ে।

তুমি কে ?

তুমি কে ?

তুমি কি কাছেই থাকো ?

তুমি কি কাছেই থাকো ?

তুমি কি পাগল ?

তুমি কি পাগল ?

চুপ কর।

চুপ কর।

মহাবিরক্ত হয়ে নার্সিসাস বললো – ধেত্তেরি ছাই ! বলেই কালবিলম্ব না করে লম্বা লম্বা পা ফেলে এগিয়ে চললো। এতে ইকো মনে বড় দু:খ পেল। মনের দু:খে পাহাড়ের ওপরে চলে গেল আর শোকে পাথর হয়ে গেল। সেই থেকে আজও পাহাড়ে জোরে কোন শব্দ করলে ইকো বা প্রতিধ্বনি শোনা যায়।

ইতিমধ্যে নার্সিসাস করলো কি আপন মনে নিজের কথা ভাবতে ভাবতে এগিয়ে চললো। স্বর্গের দেবদূতরা ইকোর পরিণতি আর নার্সিসাসের কাজকর্ম সবই দেখছিল। তারা ঠিক করলো যে নার্সিসাসকেও শাস্তি দিতে হবে।

একদিন শিকারের খোঁজে এসে নার্সিসাস জঙ্গলের ধারে একটা পুকুর দেখতে পেল। তার তখন বেশ তৃষ্ণা পেয়েছে। আশ মিটিয়ে জলপান করতে গিয়ে সে জলে নিজের ছায়া দেখতে পেল। সে হাসলো। জলের মধ্যে থাকা ছায়াটাও হেসে উঠলো। দেবদূতেরা তাকে তার ছায়ার সাথে নজরবন্দী করে ফেললো। ছায়াটা তাকে এমন মায়ার জালে আচ্ছন্ন করে ফেললো যে চুপচাপ একদৃষ্টিতে সেখানেই পড়ে রইলো। কোনরকম নড়াচড়াও করতে পারলো না। দিনের পর দিন সে নিজের ছায়ার দিকে তাকিয়ে আপন মনে হাসতো। এমনকি ক্ষুধা-তৃষ্ণাও ভুলে গিয়েছিল সে। এভাবে জলে নিজের ছায়া দেখতে দেখতেই একদিন সে মারা গেল। যেখানকার মাটিতে সে মারা গিয়েছিল সেখানেই একদিন জন্ম নিল সুন্দর নার্সিসাস বা নার্গিস ফুল।

অনুবাদ : শেখর রায়

+ There are no comments

Add yours

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.